দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় আগাম জাতের আলু চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা ছবি: খবরের কাগজ
দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলায় আগাম জাতের আলু চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতে নতুন আলু বাজারে তুলে ভালো দাম পাওয়ার আশায় বীজ রোপণ ও খেত পরিচর্যায় নেমেছেন তারা। ইতোমধ্যে জেলায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলুর বীজ রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এ জাতের আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার আশা করছে কৃষি বিভাগ।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে এই জেলায় ৪৮ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ১২ হাজার ২৫০ হেক্টর। ইতোমধ্যে জেলার ১৩টি উপজেলায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলুর বীজ রোপণ করেছেন কৃষকরা।
উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, ভালো দাম পাওয়ার আশায় কৃষকরা আশ্বিন মাসের শেষ দিকে স্বল্পমেয়াদি আগাম আমন ধান কেটে জমি প্রস্তুত করে আলু রোপণ শুরু করেছেন। এবার আগাম জাতের আলু চাষে কৃষকদের মধ্যে বেশ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। অনেক কৃষকের আলুর বীজ রোপণের ১০ থেকে ১২ দিন পার হয়েছে। এসব জমিতে আলুর গাছও উঠতে শুরু করেছে। গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিয়ে পরিচর্যা করছেন চাষিরা। তাদের আশা, অগ্রহায়ণের শুরুতেই নতুন আলু ঘরে তুলে নবান্ন উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করবেন।
আরও পড়ুন
তবে আগাম আলু চাষে খরচ বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা দুশ্চিন্তায়ও রয়েছেন কৃষকরা। দিনাজপুর সদর উপজেলার মহব্বতপুর গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, আলুর বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি–সবকিছুর দাম বেড়েছে। ফলে এবার চাষাবাদে আগের তুলনায় বেশি খরচ হচ্ছে। তার পরও আগাম আলু চাষ করে ভালো লাভের আশা করছেন তারা।
তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদি আগাম আমন ধান কাটার পর জমি ফেলে না রেখে আলু চাষের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। জমি চাষ, সার প্রয়োগ, হিমাগার থেকে বীজ সংগ্রহ, রোপণসহ বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত সময় কাটছে কৃষকদের।
বীরগঞ্জ উপজেলার মাহানপুর গ্রামের কৃষক মো. আব্দুর রহিম বলেন, তিনি ও এলাকার অন্য কৃষকরা প্রস্তুত করা জমিতে আলুর বীজ রোপণ করছেন। এবার তারা অ্যাস্টেরিক ও কার্ডিনাল জাতের আলু চাষ করছেন।
ফুলবাড়ী উপজেলার কৃষক মো. মাহামুদ আলীও আগাম আলু চাষে জমির পরিমাণ বাড়িয়েছেন। গত বছর সাড়ে আট বিঘা জমিতে আলু চাষ করলেও এবার করছেন ১২ বিঘা জমিতে। তিনি বলেন, এবার উৎপাদিত আলুর ভালো দাম পাওয়ার আশা করছেন। তবে বীজের দাম ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে।
জেলার একাধিক কৃষক জানান, প্রতিবছর বাড়তি মুনাফার আশায় অনেকেই আগাম জাতের আলু চাষ করেন। এবার বীজের দাম তুলনামূলক বেশি হলেও লাভের আশায় হিমাগার থেকে বীজ কিনে জমিতে রোপণ করছেন তারা।
সদর উপজেলার সদরপুর গ্রামের আলুচাষি মো. শহিদুর রহমানের ১০ বিঘা জমিতে অ্যাস্টেরিক জাতের আলু রোপণ করেছেন শ্রমিকরা। তাদের একজন জানান, এক বেলা খাবারসহ প্রতিদিন ৫০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন তারা। এ আয় দিয়েই সংসার চালাতে হয়।
কৃষি বিভাগ জানায়, সদর, বীরগঞ্জ, খানসামা, বিরল, চিরিরবন্দরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আলুর চাষ ও উৎপাদন বেশি হয়। আগাম জাতের আলু তুলে একই জমিতে রবি মৌসুমের বিভিন্ন শাকসবজি চাষের সুযোগ থাকায় কৃষকরা জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারছেন। কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীদের পরামর্শে আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করে উঁচু জমিতে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদন করছেন অনেকে। এতে কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে আরও জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি লাল পাকরি জাতের আলুর বীজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা এবং কার্ডিনাল জাতের বীজ ২৮ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিরল উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি কর্মকর্তা রুম্মান আক্তার বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকার উঁচু জমিতে আগাম জাতের আলু চাষ শুরু হয়েছে। অ্যাস্টেরিক, কার্ডিনাল, লাল পাকরি, রোমানা ও ডায়মন্ড জাতের আলু রোপণের ৫৫ থেকে ৬৫ দিনের মধ্যে বিক্রির উপযোগী হয়। সঠিক নিয়মে জমির পরিচর্যা করতে পারলে এসব জাতের আলু থেকে ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তুলনামূলক কম সময়ে ফসল ঘরে তোলা যায় বলে আগাম আলু চাষ কৃষকদের জন্য লাভজনক হতে পারে।
দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ আলু উৎপাদিত হয়। এ অঞ্চলের উৎপাদিত আলুর অর্ধেকেরও বেশি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার চাহিদা পূরণে সরবরাহ করা হয়। চলতি বছরও এ উৎপাদনধারা অব্যাহত রাখতে কৃষকদের আলু চাষে উৎসাহিত করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
