নিজস্ব কৃষিজমি নেই। তবু কৃষিকে ঘিরে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন গৃহবধূ শারমিন খাতুন। সেই স্বপ্ন পূরণে অন্যের জমি লিজ নিয়ে শুরু করেন মাল্টা চাষ। শুরুতে সামাজিক বাধা ও নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়লেও এখন তার বাগানজুড়ে মাল্টার ফলন। নিজের উদ্যোগে আয়ের পাশাপাশি এলাকার অন্যদেরও বাণিজ্যিকভাবে ফল চাষে উৎসাহিত করছেন তিনি। স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন ‘মাল্টা ভাবি’ নামে।
২০২৩ সালের শেষ দিকে দুই বিঘা জমি পাঁচ বছরের জন্য লিজ নিয়ে মাল্টা চাষ শুরু করেন শারমিন। বাগানে লাগান ভিয়েতনামি ও বারি-১ জাতের মাল্টার চারা। প্রথম দিকে ফলন কম হলেও সময়ের সঙ্গে গাছগুলো বড় হতে থাকে। এখন বাগানের গাছে গাছে ঝুলছে মাল্টা। ফলের আকার, স্বাদ ও মান নিয়েও সন্তুষ্ট তিনি। শারমিনের ভাষ্য, জমি লিজ, পরিচর্যা ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে গত বছর দুই লাখ টাকার বেশি লাভ হয়েছে। চলতি মৌসুমে সব খরচ মিটিয়ে প্রায় চার লাখ টাকা মুনাফার আশা করছেন তিনি।
শারমিনের মাল্টাবাগানটি রেললাইনের পাশে তুলনামূলক দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকলেও তার উদ্যোগের কথা ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের এলাকায়। প্রতিদিনই বিভিন্ন বয়সী মানুষ বাগান দেখতে, মাল্টা কিনতে এবং চাষের পদ্ধতি জানতে আসছেন। কেউ জানতে চাইছেন চারা লাগানো ও পরিচর্যার নিয়ম, আবার কেউ হিসাব করছেন মাল্টা চাষে লাভের সম্ভাবনা।
পাবনার চাটমোহর উপজেলার ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দা উদ্যোক্তা শারমিন খাতুন বলেন, তাদের এলাকায় সাধারণত ধান, সরিষা ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের চাষ হয়। সেখানে মাল্টা চাষ শুরু করায় প্রথম দিকে অনেকের বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয়েছে তাকে। তবে সেসব কথায় কান না দিয়ে নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চালিয়ে গেছেন। এখন বাগানের ফলন ও আয়ের সম্ভাবনা দেখে অনেকেই তার উদ্যোগের প্রশংসা করছেন।
শারমিন বলেন, স্থানীয় বাজারে সবুজ মাল্টার দাম ও চাহিদা নিয়ে কিছুটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সম্ভাবনা বাড়াতে নতুন করে এক বিঘা জমিতে অস্ট্রেলীয় হলুদ জাতের মাল্টা চাষ শুরু করেছেন তিনি। তার আশা, নতুন জাতের মাল্টা বাজারে ভালো সাড়া ফেলবে এবং ব্যবসার পরিধি আরও বাড়বে।
চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া থেকে বাগান দেখতে আসা আনিসুল হক ও রায়হান আলী বলেন, শারমিনের মাল্টা চাষের কথা শুনে তারা বাগানে এসেছেন। গাছের ফলন ও চাষের পরিবেশ দেখে তারা উৎসাহিত হয়েছেন। তাদের মতে, এলাকার অনাবাদি বা পতিত জমিতে লাভজনক ফল চাষের সুযোগ থাকলে ভবিষ্যতে তারাও মাল্টা চাষ শুরু করতে পারেন।
কামালপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, মাল্টা চাষ শুরুর পর থেকেই শারমিনকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি প্রযুক্তি ও গাছের পরিচর্যা সম্পর্কে তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাইদুর রহমান সাঈদ বলেন, ভিয়েতনামি জাতের মাল্টা সুস্বাদু ও রসালো হওয়ায় এ জাতের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। উপযুক্ত পরিচর্যা এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে চললে এ ধরনের ফল চাষে ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ কুন্তলা বলেন, শারমিন খাতুনের মতো আগ্রহী ও পরিশ্রমী উদ্যোক্তাদের কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় ফল মেলায় শারমিনের বাগানের মাল্টা প্রদর্শনের পর এলাকার আরও অনেক কৃষক এ ফল চাষে আগ্রহ দেখিয়েছেন। ভবিষ্যতে চাটমোহরে মাল্টার আবাদ বাড়বে বলে আশা করা যাচ্ছে।
