একদিকে পশুর নদের ভয়াবহ ভাঙন, অন্যদিকে দারিদ্র্য, জীবিকার সংকট ও সামাজিক বঞ্চনা সব মিলিয়ে অস্তিত্বের সংকটে খুলনার দাকোপ উপজেলার বানিয়াশান্তা যৌনপল্লীর প্রায় ৪২০ বাসিন্দা। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ঘরগুলোই তাদের শেষ আশ্রয়। সেই আশ্রয়টুকু হারানোর আতঙ্কের মধ্যেও এখানকার অনেক নারী স্বপ্ন দেখেন নতুন করে বাঁচার, যৌনপেশা ছেড়ে সম্মানজনক জীবনে ফেরার।
তাদের কারো জীবনে রয়েছে আপন বোনের হাতে বিক্রি হওয়ার বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা, কেউ স্বামীর প্রতারণার শিকার হয়ে হারিয়েছেন নিরাপদ জীবনের ঠিকানা। অতীতের ক্ষত, বর্তমানের অভাব আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে তাদের প্রতিদিনের লড়াই। এখন তাদের দাবি, নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ, নিরাপদ পুনর্বাসন এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ।
প্রায় ৭৫ বছরের ইতিহাস বহনকারী বানিয়াশান্তা যৌনপল্লীতে নারী-পুরুষ মিলিয়ে বসবাস করেন প্রায় ৪২০ জন। তাদের মধ্যে নারী রয়েছেন প্রায় ১২০ জন। এই নারীদের অনেকের জীবনেই রয়েছে প্রতারণা, অসহায়ত্ব ও হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের গল্প। কেউ ভালোবাসার সম্পর্কে বিশ্বাস করে প্রতারিত হয়েছেন, কেউ ভালো চাকরি ও সুন্দর জীবনের আশায় এসে পড়েছেন কঠিন বাস্তবতায়। আবার কারো জীবনে আপনজনের বিশ্বাসঘাতকতাই হয়ে উঠেছে সর্বনাশের শুরু। কেউ বোনের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছেন, কেউ স্বামীর প্রতারণার শিকার হয়ে ঠাঁই পেয়েছেন এই যৌনপল্লীতে। একসময় যাদের চোখে ছিল সুন্দর জীবনের স্বপ্ন, তাদের অনেকের জীবনই পরে আটকে গেছে দারিদ্র্য, সামাজিক অপবাদ ও অসহায়ত্বের বেড়াজালে।
তবু থেমে নেই নতুন করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা। এখানকার অনেক নারী চান যৌনপেশা ছেড়ে অন্য কোনো কাজের মাধ্যমে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। কেউ চান ছোট্ট একটি দোকান দিতে, কেউ সেলাই কিংবা অন্য কোনো কারিগরি কাজ শিখে জীবিকা নির্বাহ করতে। কেউ আবার চান সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে তাদের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে। কিন্তু বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব, আর্থিক সংকট, প্রশিক্ষণের সুযোগের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাদের অনেকের কাছেই নতুন জীবন শুরু করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আয় কমে যাওয়ার চাপ। একসময় যে উপার্জনে কোনোমতে সংসার চলত, এখন তা দিয়েও অনেকের দুবেলা খাবার জোগাড় করা কঠিন। ক্রেতা কমে যাওয়ায় আয় কমেছে, বেড়েছে অভাব। কারো দিন কাটে অনাহার-অর্ধাহারে। অনেকের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে পরিবারের যোগাযোগ। আবার কেউ অতীতের পরিচয় ও সামাজিক অবহেলার কারণে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ খুঁজে পান না। ফলে নতুন করে বাঁচার ইচ্ছা থাকলেও বাস্তবতার কঠিন দেয়াল পেরোনো তাদের জন্য সহজ নয়।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে পশুর নদের ভাঙন। নদীর পাড় ঘেঁষে থাকা ঘরগুলোই অনেকের মাথা গোঁজার শেষ ঠাঁই। প্রতিটি জোয়ারে বাড়ে ভাঙনের ভয়, প্রতিটি মুহূর্তে তাড়া করে ঘর হারানোর শঙ্কা। যাদের জীবনে একবার আশ্রয় ও নিরাপত্তা হারানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাদের কাছে আবারও ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কা যেন নতুন করে বেঁচে থাকার শক্তিটুকুও কেড়ে নিচ্ছে।
বানিয়াশান্তায় প্রায় ৩০ বছর ধরে বসবাস করা এক বাসিন্দা জানান, এত বছরেও নদীভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা দেখতে পাননি তারা। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরাও তো এ দেশের ভোটার। আমাদেরও তো নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তাঁর দাবি, দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে তাদের ছোট ছোট ঘর ও শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষা করতে হবে।
নদীভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটছে প্রবীণদেরও এক প্রবীণ নারী জানান, জীবনের ৬০ বছরের বেশি সময় স্বামীর সঙ্গে সেখানে দোকান করে কাটিয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর এখন আমড়া ও শসা বিক্রি করে কোনোমতে সংসার চালান। দীর্ঘ জীবনের স্মৃতি আর জীবিকা সবকিছুই জড়িয়ে আছে এই জায়গাটুকুর সঙ্গে। নদী যদি সেটুকুও কেড়ে নেয়, তাহলে জীবনের শেষ বয়সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন, সেই দুশ্চিন্তাই এখন তার নিত্যসঙ্গী।
শুধু বসবাসকারী মানুষ নন, নদীর পাড় ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করা অন্যরাও নানা সমস্যায় রয়েছেন। নৌকা ও বোটচালকদের অভিযোগ, যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করলেও নৌযান ভেড়ানো এবং যাত্রী ওঠানামার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাঁদের।
অন্যদিকে যৌনপল্লীর নারীদের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা বলছেন, এখানকার নারীদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা রয়েছে। তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে এই জনগোষ্ঠীর জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পরিবেশ ও মানবিক সহায়তা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যৌনপেশা ছেড়ে বিকল্প জীবিকায় ফিরতে আগ্রহী নারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সামাজিক পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ আলতাফ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং দুর্যোগের সময় আশ্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী গড়ে ওঠেনি।
বানিয়াশান্তার সংকট শুধু নদীভাঙন কিংবা দারিদ্র্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও নতুন করে জীবন শুরু করার অধিকার। প্রতারণা ও অসহায়ত্বের শিকার হয়ে যাঁরা এই পেশায় এসেছেন, তাদের অনেকেই এখন অন্য জীবনের সুযোগ চান। তাদের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং এমন সামাজিক পরিবেশ, যেখানে অতীতের পরিচয়ের কারণে ভবিষ্যতের পথ বন্ধ হয়ে যাবে না।
এ বিষয়ে দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু জানান, বানিয়াশান্তা যৌনপল্লীর বাসিন্দাদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তাদের নিয়ে কাজ চলছে। পশুর নদের ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বানিয়াশান্তার নারীরা আজও স্বপ্ন দেখেন, একদিন তাদের জীবনেও ফিরবে স্বাভাবিকতার আলো। কেউ চান নিজের উপার্জনে চলতে, কেউ চান সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে, আবার কেউ চান জীবনের বাকি দিনগুলো অন্তত একটু শান্তিতে কাটাতে। তাদের এই স্বপ্ন বিলাসিতা নয় এটি সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার।
যে নারীরা জীবনের কোনো এক পর্যায়ে আপনজনের প্রতারণা, দারিদ্র্য কিংবা অসহায়ত্বের শিকার হয়েছেন, তাদের কাছে পশুর নদের ভাঙন এখন আরেকটি নির্মম বাস্তবতা। একদিকে অতীতের ক্ষত, অন্যদিকে শেষ আশ্রয় হারানোর ভয়। তাই নদীভাঙন রোধে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর নিরাপদ পুনর্বাসন, সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যৌনপল্লীর নারীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে পশুর নদের ভাঙনে বিলীন হয়ে যেতে পারে বানিয়াশান্তার বসতি, আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে শত শত মানুষের জীবন। আর সেই ভাঙনের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে এমন অনেক নারীর শেষ আশাটুকুও, যারা আজও অতীতের অন্ধকার পেছনে ফেলে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। তাদের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন মানবিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও কার্যকর উদ্যোগ।
