টেসলার ‘উড়ন্ত’ গাড়ি
-
আইটি - আপডেট সময় ০৭:৪৮:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
গাড়ি যদি রাস্তা ছেড়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য বাতাসে উঠে যায়, মাঝআকাশে ঘুরে আবার মাটিতে নেমে আসে, তা হলে কেমন হবে? বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলার নতুন প্রজন্মের রোডস্টারকে ঘিরে এখন এমনই আলোচনা। ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে একটি প্রদর্শনীতে গাড়িটিকে বিশেষ থ্রাস্টার প্রযুক্তির সাহায্যে বাতাসে উঠে কসরত করতে দেখা যায়।
গাড়িটির প্রযুক্তি তৈরিতে যুক্ত হয়েছে ইলন মাস্কের আরেক সংস্থা স্পেসএক্সের প্রযুক্তিগত দক্ষতা। তবে এটি এখনো সাধারণ অর্থে উড়ন্ত গাড়ি নয়। বরং বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কারের সঙ্গে রকেটের প্রযুক্তি যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে এক অভিনব পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা।
রোডস্টারে কী এমন বিশেষত্ব?
টেসলার রোডস্টার মূলত উচ্চগতির বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কার। এর নতুন প্রজন্মের মডেলটি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। নতুন সংস্করণে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে স্পেসএক্সের তৈরি প্রযুক্তির ব্যবহার। প্রদর্শনীতে গাড়িটিকে বাঁকানো র্যাম্পের ওপর উল্টো অবস্থায় চলতে, বাতাসে ঘুরতে এবং একাধিক গাড়ি টপকে লাফিয়ে নামতে দেখা যায়।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার গাড়িটি আকাশে উড়তে ডানা বা হেলিকপ্টারের মতো রোটর ব্যবহার করে না। এর পরিবর্তে রয়েছে উচ্চচাপে সংরক্ষিত গ্যাস থেকে শক্তি তৈরি করা বিশেষ থ্রাস্টার ব্যবস্থা। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে গাড়িকে অল্প সময়ের জন্য মাটি থেকে ওপরে তোলা এবং বাতাসে তার গতিপথে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
কীভাবে বাতাসে ওঠে গাড়িটি?
গাড়িটির ‘রকেট’ সংস্করণে রয়েছে কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টার। সহজভাবে বললে, উচ্চচাপে জমিয়ে রাখা গ্যাস বিশেষ নোজল দিয়ে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসে। গ্যাস একদিকে বেরিয়ে গেলে বিপরীত দিকে ধাক্কা তৈরি হয়। এই ধাক্কাই গাড়িটিকে ওপরে ওঠা বা নির্দিষ্ট দিকে ঘোরার মতো কসরত করতে সাহায্য করে।
প্রদর্শনীতে ব্যবহৃত গাড়িতে একাধিক থ্রাস্টার ও উচ্চচাপের গ্যাস সংরক্ষণের ব্যবস্থা দেখানো হয়েছে। তবে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং বাস্তবে কতটা সময় গাড়িটি বাতাসে থাকতে পারবে, তা নিয়ে আরও পরীক্ষা ও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন। তাই প্রদর্শনীতে কয়েক মুহূর্তের জন্য উড়ে ওঠাকে দীর্ঘক্ষণ আকাশে চলাচলের সমান ভাবা ঠিক হবে না।
উল্টো হয়ে চলার পেছনে রয়েছে আরেক প্রযুক্তি
রোডস্টারের আরেকটি অভিনব বৈশিষ্ট্য হল সাকশন বা শোষণভিত্তিক ব্যবস্থা। গাড়ির নিচে থাকা ফ্যান ও বিশেষ কাঠামোর সাহায্যে নিচের বাতাস টেনে নেওয়া হয়। এর ফলে গাড়ির শরীরকে রাস্তা বা নির্দিষ্ট পৃষ্ঠের দিকে চেপে রাখার মতো বল তৈরি হতে পারে।
সাধারণ গাড়িতে উচ্চগতিতে চলার সময় বায়ুগতিবিদ্যার সাহায্যে নিচের দিকে চাপ তৈরি করা হয়, যাতে টায়ারের সঙ্গে রাস্তার সংযোগ ভালো থাকে। রোডস্টারের এই ব্যবস্থা কম গতিতেও বাড়তি গ্রিপ তৈরির উদ্দেশ্যে তৈরি। প্রদর্শনীতে এই প্রযুক্তির সাহায্যে গাড়িটিকে বাঁকানো র্যাম্পে উল্টো অবস্থায় থাকতে দেখা যায়। তবে এমন বিশেষ প্রদর্শনীকে সাধারণ রাস্তায় নিরাপদে ব্যবহারের প্রমাণ হিসেবে ধরা যাবে না।
এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে ঘণ্টায় ৯৭ কিলোমিটার?
গাড়িটির গতির দাবিও কম চমকপ্রদ নয়। টেসলার কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন রোডস্টার শূন্য থেকে ঘণ্টায় ৬০ মাইল বা প্রায় ৯৭ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছাতে এক সেকেন্ডেরও কম সময় নিতে পারে। এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩৭০ কিলোমিটারের বেশি হতে পারে বলেও দাবি করা হয়েছে। একবার চার্জে ৪৮০ কিলোমিটারের বেশি চলার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে এগুলো নির্মাতার প্রকাশ করা দাবি। উৎপাদন পর্যায়ের গাড়িতে স্বাধীন পরীক্ষার মাধ্যমে এসব পারফরম্যান্স কতটা অর্জন করা সম্ভব হবে, তা এখনো দেখার বিষয়।
কবে বাজারে আসবে, দাম কত?
রোডস্টারের নতুন প্রজন্ম নিয়ে আলোচনা বহু বছর ধরে চলছে। সর্বশেষ প্রদর্শনীর পর টেসলা জানিয়েছে, গাড়িটির উৎপাদন ২০২৮ সালে শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে সাধারণ ক্রেতারা ঠিক কবে গাড়িটি হাতে পাবেন, তা নিশ্চিত নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংস্থার বুকিং ব্যবস্থায় ‘পারফরম্যান্স’ সংস্করণের জন্য ৫০ হাজার ডলার এবং ‘থ্রাস্ট’ সংস্করণের জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার জমা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ‘রকেট’ সংস্করণটি আমন্ত্রণের ভিত্তিতে পাওয়া যাবে বলে জানানো হয়েছে। এগুলো বুকিংয়ের জন্য জমার অঙ্ক; চূড়ান্ত গাড়ির দাম বা নিশ্চিত ডেলিভারির তারিখ নয়।
সত্যিই কি ভবিষ্যতের উড়ন্ত গাড়ি?
টেসলার নতুন রোডস্টার গাড়ি ও মহাকাশ প্রযুক্তির সংযোগকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। তবে পরীক্ষামূলক কসরত আর দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্য ব্যবহারযোগ্য উড়ন্ত গাড়ির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি বা শক্তির ব্যবহার, নিয়মকানুন এবং সাধারণ রাস্তায় চলাচলের অনুমোদন সব দিকই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এখন পর্যন্ত প্রদর্শনীতে দেখা প্রযুক্তি গাড়িটিকে অল্প সময়ের জন্য বাতাসে তুলতে এবং কসরত করাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু যানজটের ওপর দিয়ে নিয়মিত উড়ে যাওয়া কিংবা বিমানসদৃশ যাতায়াতের ব্যবস্থা হিসেবে এর ব্যবহারিক সম্ভাবনা এখনো প্রমাণিত নয়। ফলে রোডস্টারকে আপাতত রকেট-অনুপ্রাণিত বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কার হিসেবেই দেখা যুক্তিযুক্ত যার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা।
ট্যাগস :
