খেলার মাঠে প্রতিভা খোঁজার আয়োজন নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস এবার যেন নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। বয়সভিত্তিক এই প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচির দ্বিতীয় আসরে অনলাইন নিবন্ধন ছাড়িয়েছে ১৬ লাখ। এর মধ্যে ছয় লাখের বেশি কিশোরী। সংখ্যার এই চিত্রকে শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজনের সাফল্য হিসেবে দেখছেন না যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তার চোখে, দেশের ক্রীড়াঙ্গনে মেয়েদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে আরও অনেক পরিবারকে খেলাধুলায় সন্তানদের যুক্ত করতে উৎসাহিত করবে।
বুধবার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে মতবিনিময় সভায় নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের নিবন্ধনের সর্বশেষ চিত্র তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, অনলাইনে ইতিমধ্যে ১৬ লাখ ২৩ হাজার খেলোয়াড় নিবন্ধন করেছেন। তাদের মধ্যে কিশোরের সংখ্যা ৯ লাখের বেশি এবং কিশোরী ছয় লাখের বেশি। মোট অংশগ্রহণকারীর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ কিশোর এবং ৪২ শতাংশ কিশোরী।
মেয়েদের এমন অংশগ্রহণকে ভবিষ্যৎ ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন আমিনুল, ‘আমাদের এরই মধ্যে অনলাইনে ১৬ লাখ ২৩ হাজার নিবন্ধন করেছে। সেখানে ৯ লাখের বেশি কিশোর। কিশোরী ৬ লাখের বেশি। শতকরা হিসেব করে দেখেছি ৫০ শতাংশ আমাদের কিশোর। আর অংশগ্রহণ করছে ৪২ শতাংশ মেয়ে। বাংলাদেশের আগামী ক্রীড়াঙ্গনে মেয়েদের যে অংশগ্রহণ, তা দেখে আরও অনেকে উৎসাহিত হবেন। তাদের ঘরের মেয়েরাও যে পারে, তাদেরও হাত ধরে যে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে, সেই আশার আলো সেসব পরিবার দেখতে পায়।’
শুধু নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়ানো নয়, দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করাই এবার বড় লক্ষ্য। সেই পরিকল্পনায় যুক্ত হচ্ছে দেশের ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়ন। প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে দল গঠনের জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ১৪ লাখ ক্রীড়াবিদ। ফুটবল, ক্রিকেটসহ মোট ১০টি ইভেন্টে খেলোয়াড় বাছাইয়ের প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের দ্বিতীয় আসরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে আগামী ৫ নভেম্বর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খুলনার জেলা স্টেডিয়াম থেকে একযোগে দেশের ৫০৩টি উপজেলায় প্রজেক্টরের মাধ্যমে এই আয়োজনের উদ্বোধন করবেন। এ উপলক্ষে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা ও যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তুতি সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
প্রথম আসরের তুলনায় এবার আয়োজনের পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। গতবার আটটি ইভেন্টে অংশ নিয়েছিলেন ১ লাখ ৬৮ হাজার খেলোয়াড়। এবার যুক্ত হয়েছে টেবিল টেনিস ও ভলিবল। ফলে অ্যাথলেটিকস, সাঁতার, ফুটবল, ক্রিকেট, মার্শাল আর্ট, দাবা, ব্যাডমিন্টন ও কাবাডির পাশাপাশি এই দুটি ইভেন্টেও প্রতিভা খোঁজা হবে।
তবে নতুন কুঁড়ির এবারের আয়োজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার উদ্যোগ। সাধারণত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ভালো করা খেলোয়াড়দের পরবর্তী সময়ে নিয়মিত পরিচর্যা ও প্রশিক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। সেই প্রচলিত বাস্তবতা বদলাতে চায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।
এ প্রসঙ্গে আমিনুল বলেন, ‘অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় গতানুগতিক ধারায় কোন টুর্নামেন্ট শেষ হলো, এরপর আর সেই খেলোয়াড়দের খুঁজে পাওয়া যায়না। এটাই ক্রীড়াঙ্গনের বাস্তব চিত্র ছিল।’
এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রথম আসরে পাওয়া প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের নিয়ে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ৪০ দিনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু হয়েছে। প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে উঠে আসা খেলোয়াড়দের মধ্য থেকে প্রথমে ৩০৬ জনকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁদের মধ্য থেকে বিশেষ প্রতিভাবানদের বাছাই করে বিকেএসপিতে ভর্তির সুযোগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে খেলাধুলার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হবে তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য।
এবারের আসরের সময়সূচি নির্ধারণেও রাখা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কথা। রোজা, ঈদ ও স্কুলের পরীক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা, বিভাগ হয়ে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিযোগিতা পরিচালিত হবে। সেই অনুযায়ী সাজানো হয়েছে পুরো ক্যালেন্ডার। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা আগামী বছরের এপ্রিলের শেষ অথবা মে মাসের শুরুতে আয়োজনের পরিকল্পনা করছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।
নতুন কুঁড়ির দ্বিতীয় আসরের সামনে তাই দুটি বড় লক্ষ্য। একদিকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করা, অন্যদিকে তাঁদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করে দীর্ঘমেয়াদি ক্রীড়াবিদ হিসেবে গড়ে তোলা। ১৬ লাখের বেশি নিবন্ধন সেই যাত্রার বড় সূচনা হলেও শেষ পর্যন্ত এই আয়োজন কতজন প্রতিভাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারে, সেটিই হবে নতুন কুঁড়ির সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।
