The Sangbad · সাধারণ
মব কালচার, মব অ্যাটাক
১৬/১০/২০২৬

‘মব’ শব্দটির সঙ্গে বাংলাদেশের গণমানুষের পরিচয় বেশি দিনের নয়। শব্দটি ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায় মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। এটা একটা ইংরেজি শব্দ, যার বাংলা অর্থ উচ্ছৃঙ্খল জনতা। এরা দৃশ্যপটে আসে মূলত চব্বিশের গণআন্দোলনের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরে। আর যারা ঘটনার আকস্মিকতায় ক্ষমতার মসনদ পেয়ে যায়, তারাই মবের স্রষ্টা, মব সংস্কৃতি ও মবের লালন-পালনের দায়িত্ব মাথায় তুলে নেয়। একই সঙ্গে তারা মবের ধারক-বাহক, তোষণ-পোষণের দায়িত্বও কাঁধে নিয়ে নেয়।এই মবরা একই শ্রেণির, একই বয়সের, প্রায় একই পোশাক-পরিচ্ছদে চলাফেরা করে। এদের চেহারায়ও অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে। তখন এরা রাষ্ট্রীয় অর্থে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বেষ্টনীতে বাস করত। অবস্থা এমন ছিল যে, এরা দেশের রিজার্ভ আর্ম ব্যাটালিয়নের ন্যায় রাজধানীর উত্তর-পশ্চিমাংশের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাস করত। প্রয়োজন পড়লেই ডাক পেত, আর এক ঘণ্টার ব্যবধানে শাহবাগ চত্বরে, রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বা শহীদ মিনারে দুর্বার গতিতে এসে হাজির হতো।এদের চলাফেরার গতি ও নিশানা এক। কঠোরভাবে চেইন অব কমান্ড বা নেতৃত্ব অনুসরণকারী। কোথায় যাবে, কী কাজে যাবে, তা এদের সবার জানার বিষয় নয়। দু-চারজন নেতার কমান্ডে তারা কমান্ডো ফোর্সের মতো যেকোনো অপারেশনে ঝাঁপিয়ে পড়তে কুণ্ঠিত হয় না, কোনো দ্বিধায় ভোগে না। এদের কাজ হলো কমান্ড মানা, ন্যায়-অন্যায় দেখবেন নেপথ্যের কারিগরগণ। এভাবেই বছর দেড়েকের একটা উদ্ভট, ভৌতিক ও অনভিজ্ঞ ইউটোপিয়ান সরকারের অস্তিত্ব গোটা জাতি দেখেছিল।২.সেকালে মবদের হাইকমান্ডের সঙ্গে নিয়মিত সভা, নীতিনির্ধারণী আলোচনা, গ্রামে-গঞ্জে অ্যাটাকের কলাকৌশল, আর্থিক সহায়তা, নিরাপত্তা প্রভৃতি বিষয়ে নিয়মিত ব্রিফিং দেওয়ারও ব্যবস্থা ছিল। সে সময় শাহবাগের মোড়ে মব বাহিনী অবস্থান করলে প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে অসংখ্য জনহিতৈষী ব্যক্তি এসে খাবার, পানীয়—সবই সরবরাহ করতেন। তাদের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রেখে সরকারি নীতিমালা বাস্তবায়নের কঠোর সিদ্ধান্ত নিতেন। একসময় মবরা খণ্ড খণ্ড দলে বিভক্ত হয়ে একক পর্যায়ে রাজপথ ত্যাগ করত এবং অদৃশ্য হয়ে মিলিয়ে যেত।দেখা গেছে, দ্রুততম সময়ে যোগ দিতে মেট্রোরেল ব্যবহার করে শাহবাগ চত্বরে নেমে পড়ত। প্রধান উপদেষ্টা মহোদয় মবদের সার্বক্ষণিক খবরাখবর নিতেন, এদের নিরাপত্তার যথাযথ তদারকি করতেন। তা ছাড়া, মব আন্দোলনের নির্ধারিত স্থানগুলো থেকে প্রধান উপদেষ্টা মহোদয়ের সরকারি বাসভবন ছিল খুবই কাছাকাছি দূরত্বের মধ্যে। এদের দেখভালের জন্য তিনি একাধিক ব্যক্তিগত কর্মকর্তাকেও দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন। এমনকি প্রধান উপদেষ্টা স্বয়ং মবের সেক্টর কমান্ডারদের সঙ্গে পৃথক পৃথক সভা করে এদের রণনীতি, রণকৌশল সম্পর্কে খুব ধীরস্থির, ঠান্ডা মাথায় তার অশীতিপর অভিজ্ঞতার নির্যাস ঢেলে দিতেন। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ করে ভেসে আসত।মানুষের স্মৃতি দুর্বল না হলে বা স্মৃতি বেইমানি না করলে ২০২৫ সালের কথা এত তাড়াতাড়ি ভোলার নয়। মজার বিষয় ছিল, তিনি রাস্তায় মব নামিয়ে গণদাবির মহড়া প্রদর্শন করাতেন। বলতেন, এটা আজই গেজেটে প্রকাশ করুন, জনগণ রাস্তায় অনশন করছে, পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন হচ্ছে। আরও অনেক বিচিত্র নাটকীয়তা একটা জাতি দেখেছিল।৩.সেকালের মবরা এখনো ঢাকা শহরে বসবাস করছে। তারা বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে ঢাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, হল, কলেজের হোস্টেল, মাদ্রাসা, লাইব্রেরি, বইবিতানসহ নানা স্থানে বিচরণ করছে। সংকেত পেলেই নাশকতার মতো কাজে নেমে আসবে। তারা দেশের জেলা শহরগুলোতে থেকেও হাইকমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে, কখনো সরবে, কখনো নিভৃতে দায়িত্ব পালন করে চলেছে। ওপরের নির্দেশ পেলেই এরা কাজে নামে। রাজধানীকে তারা কেন্দ্রস্থল ধরে এবং জেলা শহরকে প্রান্ত বিবেচনা করছে। কেন্দ্রের নির্দেশনা পালন করেই তারা চলে। এতে কেন্দ্র-প্রান্ত সম্পর্কে কোনো ভাটা পড়ছে না।কিছুদিন পূর্বে হবিগঞ্জ জেলার একজন মব স্টারের বক্তব্য সারা দেশবাসী দেখেছে। সে কত অকুতোভয় এবং আত্মবিশ্বাসী, তা তো ইলেকট্রনিক মিডিয়ার চোখের সামনেই। একজন পুলিশ অফিসারকে পুড়িয়ে মারার অকপট স্বীকারোক্তির কথা কেউ ভুলতে পারবে না। মনে হয়, মবরা এ মুহূর্তে অলস সময় কাটাচ্ছে, তারা মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় আছে। সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি লাগানো মেয়েটার কথা বলা যায়। তাকে পুলিশে ধরার পরে সে বলেছে, ‘আমি এত কিছু জানতাম না, আমাকে ওরা বলেছে, আমি করেছি।’ মবদের সাধারণ চরিত্র এমনই, এরা জানে না এরা কী করে, কার জন্য করে।৪.অথচ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরীণ কর্মে নেহাত অনভিজ্ঞ ব্যক্তিটি মনে করতেন, এ দেশে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সেনাবাহিনী/সুপ্রিম আর্মড ফোর্স—এসবের ভরসায় থাকলে ক্ষমতায় টিকে থাকা যাবে না। এগুলো থাকবে আইনি কাঠামোর বিধিবদ্ধ নিয়মের বেড়াজালে। প্রকৃত জুলাইযোদ্ধার সঙ্গে আজগুবিভাবে জন্ম নেওয়া ও তাৎক্ষণিক গজিয়ে ওঠা স্কুল-কলেজের বারান্দায় থাকা বা বিপথগামী তরুণেরাই মূল নিয়ামক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি এদের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা না ভেবে, প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার অপকর্মে এদের জড়িত করেন। যার তুল্যমূল্য খেসারত এ জাতিকে হয়তো আরও কয়েক বছর দিয়ে যেতে হবে।মবরা এখন সারা দেশে রাজনৈতিক দলের অচেনা, একেবারে পাতি নেতাদেরও ডান হাত হিসেবে কাজ করে চলেছে। তারা এদের বিশেষ কোনো অ্যাসাইনমেন্ট যেমন- বাড়ি, জমি, দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের কাজ দিলে হোন্ডার বহর নিয়ে পৌঁছে যায় এবং নিমিষে একটা সফল রিপোর্ট জমা দিতে পারে। তাদের দরকার টাকা, মোটরবাইক, জ্বালানি ও নেশার অর্থের জোগান ইত্যাদি। একটা বিরাট অংশ হয়তো জানেই না সে কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে। সমাজে এদের মা-বাবাও চরম হতাশ, নিয়ন্ত্রণহীন, উচ্ছন্নে যাওয়া সন্তান। এসব নিয়ে ভাবনার সময় চলে যাচ্ছে, দেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি প্রায় হারিয়ে গেছে।কিশোর গ্যাং এবং মব অপরাধীরা হাটে, মাঠে-ঘাটে, স্টেশনে সর্বত্র বিরাজমান। শাসন করার কোথাও কেউ নেই, উল্টো তারা থানা-পুলিশের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে জড়াচ্ছে, দালালি করার কলাকৌশল শিখে গেছে, জনপ্রতিনিধিদের কাছে অযাচিত গুরুত্ব পাচ্ছে। কেউ জানতে চাইছে না তারা পড়াশোনা করছে কি না, কোথায় পড়ে, কোথাকার ছাত্র। সবাই এদের বাহবা দিচ্ছে, ‘ওয়েল ডান’ বলে পিঠে হাত রাখছে। তারাও দ্বিগুণ উৎসাহ-উদ্দীপনায় পরবর্তী মিশনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এভাবেই জাতির ভবিষ্যৎ তরুণেরা আজ সর্বনাশের কিনারে দাঁড়িয়ে। আর এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় মুহাম্মদ ইউনূসের হাত ধরে, তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে।৫.সম্প্রতি ইউরোপ ও আমেরিকায় সাবেক প্রধান উপদেষ্টার ওপর মব অ্যাটাকের মতো ঘটনা ঘটেছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে একদল বাংলাদেশি তাকে খুনি, গণতন্ত্র হত্যাকারী, পুলিশ হত্যাকারী, শিশু হত্যাকারী, প্রতারক ইত্যাদি বলে অশোভন ভাষায় চিৎকার করে গালমন্দ করেছে। তাদের মারমুখী আচরণ করতেও দেখা গেছে। এখন মনে হয়, এগুলো তার স্রেফ নিয়তি নয়, বরং প্রাপ্য। এ পৃথিবীতে কে কার ক্ষতি করবে, কেউ জানে না। সম্মান দেওয়া-নেওয়ার মালিকও অদৃশ্য। বিশ্বব্যাপী অনবরত ঘুরে বেড়ানো এই মহান নোবেলজয়ী ও মাইক্রোক্রেডিট বিশেষজ্ঞের আগামী দিনগুলো কীভাবে কাটবে, তা কেবল সময়ই বলে দিতে পারে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গল্পকার ও প্রাবন্ধিক]
মূল প্রতিবেদনে যান ↗