যুক্তরাজ্যে কর্মীদের মজুরি বৃদ্ধির গতিতে সামান্য ঊর্ধ্বমুখিতা এবং কর্মসংস্থান বাজারে ধীর পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শ্রমবাজারের এই মিশ্র পরিস্থিতি আগামী মাসে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের (বিওই) নীতি সুদহার বাড়ানোর সম্ভাবনাকে আরও জোরদার করেছে। প্রত্যাশার চেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারার পর প্রকাশিত এই তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কর্মী নিয়োগে দীর্ঘদিনের ভাটা হয়তো তলানিতে পৌঁছে স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। আগামী সপ্তাহে অর্থমন্ত্রী জন হিলির প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপনের আগে এ তথ্য সরকারের জন্যও কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের (ওএনএস) হিসাব অনুযায়ী, বোনাস ছাড়া কর্মীদের গড় সাপ্তাহিক আয় চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে এই হার ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে যাওয়ার পর এটি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ধারা বজায় রেখেছে। অর্থনীতিবিদদের নিয়ে রয়টার্সের জরিপে যেখানে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধির প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল, প্রকৃত ফলাফল তাকে ছাড়িয়ে গেছে। এর পাশাপাশি বেসরকারি খাতে মজুরি বৃদ্ধির গতি ২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক শূন্য শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকের পর এই প্রথম বাড়ল।
যুক্তরাজ্যের রাজস্ব ও শুল্ক বিভাগের প্রাথমিক তথ্যে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে তালিকাভুক্ত কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে ১৩ হাজার। এছাড়া আগস্ট মাসের প্রাথমিক হিসাবে ২৬ হাজার কর্মী হ্রাসের কথা বলা হলেও তা সংশোধন করে ১ হাজার বৃদ্ধির তথ্য দেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থানবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনডিড’-এর জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ জ্যাক কেনেডি বলেন, “সর্বশেষ পরিসংখ্যান শ্রমবাজারের কিছুটা সহনশীলতার ইঙ্গিত দেয়, যা সামগ্রিক অর্থনীতির প্রত্যাশার চেয়ে ভালো পারফরম্যান্সের প্রতিফলন।” তবে বাজার পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টি আসন্ন বাজেটের ওপর নির্ভর করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আজকের পরিসংখ্যান নিশ্চিত করে যে শ্রমবাজার কোনোমতে টিকে রয়েছে। প্রশ্ন হলো বাজেট নিয়োগকর্তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো কারণ জোগাতে পারে কি না।” উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস নিয়োগকর্তাদের ওপর কর বৃদ্ধি করার পর থেকেই দেশটিতে কর্মী নিয়োগের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছিল।
ওএনএস-এর জরিপ অনুযায়ী, আগস্ট পর্যন্ত তিন মাসে যুক্তরাজ্যের বেকারত্বের হার কমে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০২৫ সালের মধ্যভাগের পর সর্বনিম্ন। তবে কর্মসংস্থানের কিছু পরিসংখ্যানে এখনো দুর্বলতার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া তিন মাসে খালি পদের সংখ্যা আগের ৭০৪,০০০ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৬৯১,০০০-এ। ২০২১ সালের এপ্রিলের পর এই প্রথম শূন্য পদের সংখ্যা সাত লাখের নিচে নামল, যা মহামারি পরিস্থিতি বাদ দিলে ২০১৪ সালের পর সর্বনিম্ন। ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ইন ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসের প্রধান অর্থনীতিবিদ সুরেন থিরু বলেন, “শূন্যপদের সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়া শ্রমবাজারের জন্য একটি সতর্কবার্তা, যা ইঙ্গিত করে চলতি বছরের এআই-চালিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো নিয়োগের দুর্বল চাহিদা, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত কর্মসংস্থান ব্যয়।”
শ্রমবাজারের এই তথ্য প্রকাশের পর মার্কিন ডলারের বিপরীতে ব্রিটিশ পাউন্ডের মান বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের দামের ধাক্কা উচ্চ মজুরির দাবির মাধ্যমে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড। বিনিয়োগকারীদের ধারণা, আগামী নভেম্বরের মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের মূল সুদের হার বাড়িয়ে ৪ শতাংশে উন্নীত করতে পারে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি সম্প্রতি সতর্ক করে জানিয়েছেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য ততটাই জরুরি হয়ে পড়বে। রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে দেশটিতে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি আগের মাসের ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রাকে আরও দূরে ঠেলে দেবে।
