দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: অক্টোবর ২১, ২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম
কারামুক্তির পর প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অনেকটাই দূরে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। কোনো বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া, দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রকাশ্য বৈঠক কিংবা নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য কোনোটিই এখনো দেখা যায়নি তার পক্ষ থেকে। অথচ তার এই নীরবতাই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তৈরি করেছে নতুন আলোচনা। বিশেষ করে আসন্ন নাসিক নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর হিসাব-নিকাশে বারবার উঠে আসছে আইভীর নাম। এরই মধ্যে আদালতপাড়ায় একটি মামলা হাজিরা দিতে এসে জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জয় বাংলাকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। তার সেই স্লোগানের পর উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজনীতিতে। এরই মধ্যে আইভীর আইনজীবী সহ ৩ জনকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পর গত ৩ জুন দিবাগত রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান আইভী। পরে নগরীর দেওভোগ এলাকার নিজ বাসভবনে ফিরে সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় তিনি সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান এবং মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশার কথা বলেন। এরপর থেকে রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই নীরব রয়েছেন তিনি।
এই নীরবতার মধ্যেই সামনে চলে এসেছে নাসিক নির্বাচন। আইভী নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না, রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন কি না কিংবা কোনো প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেবেন কি না এখনো কোনো প্রশ্নেরই স্পষ্ট উত্তর নেই। আর এ কারণেই তাকে ঘিরে নির্বাচনী মাঠের সম্ভাব্য সমীকরণও পুরোপুরি পরিষ্কার হচ্ছে না।
নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে আইভীর অবস্থান দীর্ঘদিনের। পৌর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর টানা তিনবার মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। দীর্ঘ সময় নগর প্রশাসনের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কারণে তার একটি নিজস্ব ভোটব্যাংক ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
এ কারণে দলীয় রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা থেকে তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানকে আলাদা করে দেখছেন অনেকে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম বর্তমান সময়ে আগের অবস্থানে নেই। তবে আইভীকে ঘিরে নগরবাসী ও তার অনুসারীদের আগ্রহ এখনো রয়েছে কি না, সেটিই নাসিক নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হলে সেই প্রভাব কতটা নির্বাচনী মাঠে পড়বে, তা নিয়েই চলছে নানা আলোচনা।
সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের জন্যও আইভীর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ তিনি নিজে প্রার্থী হলে এক ধরনের নির্বাচনী সমীকরণ তৈরি হবে। আবার প্রার্থী না হয়ে কোনো পক্ষ বা প্রার্থীর প্রতি সমর্থন জানালেও পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে যেতে পারে। এমনকি তিনি যদি পুরোপুরি রাজনীতির বাইরে থাকেন, সেটিও নির্বাচনী মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে তার অবস্থানকে উপেক্ষা করে নাসিক নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, কারামুক্তির পর আইভী হয়তো আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। দীর্ঘ কারাবাসের পর সরাসরি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে না গিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন তিনি এমন ধারণাও রয়েছে অনেকের মধ্যে। তবে তার ঘনিষ্ঠদের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসেনি।
এদিকে আইভীর অনুসারীদের মধ্যেও এক ধরনের অপেক্ষা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যারা তার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, তাদের অনেকেই তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বা সাক্ষাতের সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন। ওয়ার্ড পর্যায় থেকে শুরু করে নগর রাজনীতির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে কোনো বড় ধরনের সাংগঠনিক কর্মসূচির ঘোষণা আসেনি।
অন্যদিকে নাসিক নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যেও আইভীর অবস্থান নিয়ে সতর্কতা রয়েছে। নির্বাচনী মাঠে কে কার সঙ্গে সমঝোতা করবেন, কার পক্ষে কোন রাজনৈতিক শক্তি অবস্থান নেবে কিংবা ভোটের মাঠে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কতটা প্রভাব ফেলবে এসব হিসাবের সঙ্গে আইভীর অবস্থানও জড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, তাকে ঘিরে আলোচনা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আইভীর গুরুত্ব শুধু তার সাবেক মেয়র পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ সময় ধরে নগর রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা, একাধিক নির্বাচনে জয় পাওয়া এবং সাধারণ মানুষের একটি অংশের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ তৈরি করতে পারা তাকে আলাদা অবস্থান দিয়েছে। ফলে তিনি সরাসরি নির্বাচনে না থাকলেও তার রাজনৈতিক অবস্থান নির্বাচনী পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে আইভী যদি প্রকাশ্যে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন, তাহলে অনেক হিসাবই দ্রুত বদলে যেতে পারে। তিনি প্রার্থী হলে এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হবে, আর কাউকে সমর্থন করলে অন্য ধরনের সমীকরণ সামনে আসবে। বিপরীতে তিনি নীরব থাকলে বর্তমান সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিজেদের শক্তি ও সাংগঠনিক সক্ষমতার ওপরই বেশি নির্ভর করতে হবে।
সব মিলিয়ে কারামুক্তির পর আইভীর রাজনৈতিক নীরবতা এখন আর শুধু ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখছেন না নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মহল। বরং নাসিক নির্বাচনকে সামনে রেখে তার প্রতিটি পদক্ষেপ, বক্তব্য কিংবা নীরবতাও হয়ে উঠছে আলোচনার বিষয়। তিনি নির্বাচনে ফিরবেন, কাউকে সমর্থন করবেন নাকি আপাতত রাজনীতির বাইরে থাকবেন এই সিদ্ধান্তের ওপরই অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী দিনের নির্বাচনী সমীকরণ। তাই নাসিক নির্বাচনের মাঠে এখনো প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক লড়াই শুরু না হলেও রাজনৈতিক অঙ্ক কষা শুরু হয়ে গেছে। আর সেই অঙ্কের একটি বড় অংশজুড়েই রয়েছে আইভীর অবস্থান। তিনি কথা না বললেও তাকে ঘিরেই সম্ভাব্য প্রার্থী, দলীয় নেতাকর্মী ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের হিসাব-নিকাশ চলছে।
