প্রবাদে আছে ‘আশ্বিনে চালকুমড়োর বাণ, কার্তিকে মাষকলাইয়ের গান।’ যশোরে ঘরের চালে, গাছে কিংবা মাঠের মাচায় ঝুলছে পরিপক্ব চালকুমড়ো। এগুলোর গায়ে জমেছে সাদা পাউডারের মতো আস্তরণ- অর্থাৎ, পরিপক্ক হয়ে ব্যবহারের উপযোগী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, গ্রামের মেঠোপথ, পুকুরপাড়, জমির আইল কিংবা পতিত জমিতে বাতাসে দুলছে মাষকলাইয়ের সবুজ পাতা ও ফুল। আর কদিন পর মাষকলাইও উঠবে। তখন শুরু হবে চালকুমড়ো আর মাষকলাইয়ের সংমিশ্রণে কুমড়োর বড়ি দেওয়ার ধুম। চালকুমড়ো আর মাষকলাই ডালের এই যুগলবন্দি শীতকালীন তরকারির স্বাদকে করে তোলে অনন্য ও মুখরোচক।
এদিকে, ঐতিহ্যবাহী ‘কুমড়োর বড়ি’র বাণিজ্যিক চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। জেলার অনেক নারী উদ্যোক্তা এখন বাণিজ্যিকভাবে এই বড়ি তৈরি করে ই-কমার্সের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে সরবরাহ করছেন।
চালকুমড়োর বীজ সাধারণত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ (মে-জুন) মাসে উঁচু দোআঁশ মাটিতে বোনা হয়। কার্তিক-অগ্রহায়ণের (অক্টোবর-নভেম্বর) দিকে এটি পরিপক্ব হয়ে সাদা রূপ নেয় এবং বড়ি দেওয়ার উপযোগী হয়। ভাদ্র-আশ্বিন (আগস্ট-সেপ্টেম্বর) মাসে নরম পলিযুক্ত চর, রাস্তার ধার, পুকুরপাড় বা পতিত জমিতে মাষকলাইয়ের বীজ ছিটানো হয়। অগ্রহায়ণ ও পৌষ (নভেম্বর-ডিসেম্বর) মাসে এই কলাই পেকে ঘরে তোলার উপযোগী হয়। তখন মাষকলাই আর কুমড়ো পিষে তৈরি হয় এক সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণের ভরপুর খাবার, যার স্থানীয় নাম ‘কুমড়োর বড়ি’। কুমড়োর বড়ি অত্যন্ত পুষ্টিকর। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, মাষকলাইয়ের ডাল উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের এক বিশাল উৎস, যা শরীরের ক্ষয়পূরণ ও পেশি গঠনে সাহায্য করে। তা ছাড়া চালকুমড়োয় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি, সি, ক্যালসিয়াম ও পটাসিয়াম। এটি হজমশক্তি বাড়াতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে দারুণ কার্যকরী।
যশোরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় মাষকলাইয়ের আবাদ হয়েছে সাড়ে ৭শ হেক্টর জমিতে। জেলার সদর, চৌগাছা, মণিরামপুর, কেশবপুর এবং শার্শা উপজেলার কপোতাক্ষ ও ভৈরব নদের অববাহিকায়, বিভিন্ন এলাকার রাস্তার পাশে, পুকুরপাড় এবং চরাঞ্চলে এই ডাল চাষ বেশি হয়েছে। তবে তাদের পরিসংখ্যান বলছে, এক দশকের তুলনায় যশোরে মাষকলাই চাষ অন্তত ৩০ ভাগ কমে গেছে।
তথ্যানুসন্ধানে মাষকলাই চাষ কমে যাওয়ার প্রধান তিনটি কারণ হলো- কৃষকরা এখন মাষকলাইয়ের চেয়ে বেশি লাভজনক শীতকালীন আগাম সবজি, সরিষা এবং পেঁয়াজ-রসুন চাষে বেশি আগ্রহী। তা ছাড়া বাজারে এখন ভাঙানো মাষকলাইয়ের ডাল সহজেই কিনতে পাওয়া যায়। ফলে, গৃহিণীরা কষ্ট করে চাষ ও মাড়াই করার চেয়ে বাজার থেকে ডাল কিনে বড়ি দেওয়াকেই সহজ মনে করছেন। একই সঙ্গে গ্রামীণ মেঠোপথ পাকা হওয়া এবং পতিত জমির পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণেও এই ডাল ছিটানোর চারণভূমি কমে গেছে। কৃষি বিভাগ বলছে, স্থানীয় ঘাটতি মেটাতে যশোরের ব্যবসায়ীদের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া এবং চরাঞ্চল জেলা থেকে বিপুল পরিমাণ মাষকলাই ডাল আমদানি করতে হয়। তারা বলছে, যশোরের উঁচু পলি ও দোআঁশ মাটি চালকুমড়ো চাষের জন্য দারুণ উপযোগী। এ বছর ফল পাকার সময় অর্থাৎ আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যাপ্ত সূর্যালোক এবং বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় এর বাম্পার ফলন হয়েছে।
সরেজমিন যশোরের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বড়ি তৈরির জন্য যে ধরনের পরিপক্ব বা বুড়ো চালকুমড়োর প্রয়োজন হয়, তার ফলন এবার নজর কেড়েছে। কৃষকদের বাড়ির বানে, ক্ষেতের মাচায় বা বিভিন্ন ধরনের গাছে একেকটি কুমড়োর গড় ওজন ২ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত হয়েছে।
যশোরের বাজারে আকার ও পরিপক্বতাভেদে প্রতিটি চালকুমড়ো পাইকারিতে ৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। সারা জেলায় যে পরিমাণ চালকুমড়ো উৎপাদন হয়েছে তার বাজারমূল্য প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
স্থানীয় বিভিন্ন পাইকারি বাজার ও গ্রামীণ হাটে খোসাযুক্ত কাঁচা মাষকলাই প্রতিকেজি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়। তা ছাড়া রেগুলার বাজারের মিলিং করা বা খোসা ছাড়ানো ডাল প্রতিকেজি ১৮০ থেকে ২১০ টাকা দরে বিক্রি হয়। আবার বিভিন্ন অনলাইন শপ এবং সুপারশপগুলোতে প্রিমিয়াম ও বাছাইকৃত মাষকলাইয়ের ডাল প্রতিকেজি বিক্রি হয় ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা পর্যন্ত।
সূত্রমতে, স্থানীয় পাইকারি বা গ্রামীণ হাটে ১ কেজি কুমড়োর বড়ি বিক্রি হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি। শহুরে খুচরা বাজারে মানভেদে প্রতিকেজি ৩০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে প্রতি কেজি বড়িতে একজন নারী উদ্যোক্তা বা কৃষকের লাভ থাকে ১০০ থেকে দেড়শ টাকা। বিগত কয়েক বছর যশোরের অনেক নারী উদ্যোক্তা এখন বাণিজ্যিকভাবে এই বড়ি তৈরি করছেন। কয়েক বছর হলো অনেকে ই-কমার্সের মাধ্যমেও বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছেন।
যশোর সদর উপজেলার বাউলিয়া গ্রামের গৃহিণী ফাতেমা বেগম বলেন, কুমড়োর বড়ির বেশ চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এটি তৈরিতে ঝুঁকিও আছে। ঠিকমতো রোদ না পেলে বড়ি নষ্ট হয়ে যায়; তাই এটা ব্যবসায়িকভাবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
যশোরের ‘দেশি ফেরিওয়ালা’ নামে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের সিইও প্রিয়াঙ্কা রানী সুর বলেন, আমরা গত কয়েক বছর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে অনলাইনে গ্রাহককে কুমড়োর বড়ি সরবরাহের কাজ করেছি। এটা সংরক্ষণে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। অন্যথায় বড়ি নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু সাধারণভাবে এই তাপমাত্রা মেইনটেন্যান্স করা অত্যন্ত দুরূহ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, মাষকলাই চাষ কমলেও যশোরের ঐতিহ্যবাহী ‘কুমড়োর বড়ি’র বাণিজ্যিক চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। জেলার অনেক নারী উদ্যোক্তা এখন বাণিজ্যিকভাবে এই বড়ি তৈরি করে ই-কমার্সের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে সরবরাহ করছেন।
