থাইল্যান্ডের গায়িকা ও র্যাপার লিসার প্রামাণ্যচিত্র ‘অলওয়েজ লালিসা’

প্রভাত বিনোদন : লিসার আসল নাম লালিসা মানোবান। থাইল্যান্ডের এই গায়িকা ও র্যাপারের জীবনের নানা গল্প উঠে এসেছে নতুন প্রামাণ্যচিত্র ‘অলওয়েজ লালিসা’তে। টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়। ১২ অক্টোবর থেকে সীমিত সময়ের জন্য প্রেক্ষাগৃহে দেখানো হচ্ছে ছবিটি। পরে এটি ইউটিউব প্রিমিয়ামে মুক্তি পাবে।
পরিচালক সু কিম লিসার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর তুলে ধরেছেন এই ছবিতে। ২০২৫ সালে নিজের প্রথম একক অ্যালবাম ‘অল্টার ইগো’ প্রকাশ করেন লিসা। গড়ে তোলেন নিজের ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান। পারফর্ম করেন কোচেলা সংগীত উৎসবে। অস্কারের মঞ্চেও গান করেন। একই বছর অভিনয়ে অভিষেক হয় এইচবিওর সিরিজ ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’ দিয়ে।
দীর্ঘদিন দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদন প্রতিষ্ঠান ওয়াইজি এন্টারটেইনমেন্টের অধীনে ছিলেন লিসা। তখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও ছিল নানা বিধিনিষেধ। প্রেম করা, মদ্যপান ও গাড়ি চালানোর অনুমতি ছিল না।
প্রামাণ্যচিত্রে দেখা যায়, সেই গণ্ডি পেরিয়ে নিজের মতো করে এগিয়ে চলছেন লিসা। নিজের সিদ্ধান্তে কাজ করার স্বাধীনতা উপভোগ করছেন।

ব্যাগে ঝুলছে অদ্ভুত দেখতে এক পুতুল। মুখভরা ধারালো দাঁত, দুষ্টুমিভরা হাসি। দেখতে অনেকটা ছোট্ট দানবের মতো। পুতুলটির নাম লাবুবু। ২০২৪ সালের বসন্তে এই পুতুল ঝুলিয়েই ছবি তুলেছিলেন কে-পপ তারকা লিসা। ব্ল্যাকপিংকের এই সদস্যের সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর লাবুবু পুতুল নিয়ে শুরু হয় বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা। লিসা নিজেও পুতুলটির ভক্ত। কেন এত পছন্দ, তা জানতে চাইলে হেসে তিনি বলেন, ‘আমি দুঃখিত! কিন্তু কিছু করার নেই। এটা সত্যিই খুব কিউট। আমরাও তো বাচ্চা!’

এখন লিসার বয়স ২৯ বছর। একক সংগীতজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি নিজে অনেক কিছু শিখেছি। এমন অনেক কিছু চেষ্টা করেছি, যা আগে করার সুযোগ পাইনি। কাজগুলো কঠিন ছিল। তবে নিজের জন্য আমি গর্বিত।’
লিসা আরও বলেন, ‘নিজেকে খুঁজে পাওয়া, আত্মবিশ্বাস অর্জন করা—এসবই গুরুত্বপূর্ণ। ১০ বছর ধরে ব্ল্যাকপিংকের সঙ্গে আছি। এরপর একক কাজ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আত্মবিশ্বাস ছিল না। কোথা থেকে শুরু করব, তা-ও জানতাম না।’ নিজের শৈশবের দৃশ্য দেখে কিছুটা লজ্জাও পেয়েছেন লিসা। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় আমার নাচের দৃশ্যগুলো দেখলে লজ্জা লাগে।’
কে-পপের জগৎ সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে পরিচালক সু কিমের। তিনি অ্যাপল টিভির সিরিজ ‘কে-পপ আইডলস’-এর প্রযোজক ছিলেন। সিরিজটিতে কে-পপ তারকা হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণার্থীদের কঠোর পরিশ্রমের চিত্র উঠে এসেছিল। তবে কে-পপ তারকাদের ব্যক্তিগত জীবনে এত বিধিনিষেধ দেখে অবাক হন সু কিম। তিনি বলেন, ‘কোনো শিল্পী প্রেম করছেন বা গাড়ি চালাচ্ছেন বলে তাঁর ওপর রাগ করা আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য। তাঁরা কি নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন না?’
লিসার গল্পকে সু কিম দেখেছেন দেরিতে শুরু হওয়া বড় হয়ে ওঠার গল্প হিসেবে। তাঁর মতে, লিসা নিজেকে নতুন করে চিনছেন। বুঝতে চেষ্টা করছেন, জীবন ও সংগীতজীবনকে কোন পথে এগিয়ে নিতে চান।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে ওয়াইজি এন্টারটেইনমেন্টে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে যোগ দেন লিসা। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম অ-কোরীয় প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন তিনি। হাজারো প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে এই সুযোগ পান। এরপর পাঁচ বছর চলে তাঁর প্রশিক্ষণ। গান ও নাচের পাশাপাশি শিখেছেন কোরীয় ভাষা। মেনে চলতে হয়েছে নানা নিয়মও।

লিসা বলেন, ‘সবকিছুর জন্য আমি কৃতজ্ঞ। পাঁচ বছর প্রশিক্ষণ নিয়েছি। এটা অনেকটা আবাসিক স্কুলের মতো। স্কুলে যাওয়া, একই স্বপ্ন দেখা মেয়েদের সঙ্গে হোস্টেলে থাকা—সব মিলিয়ে মজার অভিজ্ঞতা ছিল।’
২০১৬ সালে অভিষেকের পর বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায় ব্ল্যাকপিংক। দলটির অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে দুই কোটির বেশি। গানগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে শোনা হয়েছে ৪০ বিলিয়নের বেশিবার।
একক শিল্পী হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করাও সহজ ছিল না লিসার জন্য। ‘অল্টার ইগো’ অ্যালবামে নিজের নানা দিক তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি। তবে অ্যালবামটি নিয়ে সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। সংগীতবিষয়ক সাময়িকী পিচফর্ক অ্যালবামটিকে পপ তারকার গতানুগতিক উপস্থাপন বলে মন্তব্য করে।
বিশ্বজুড়ে পরিচিতির কারণে অনলাইন সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে লিসাকে। ২০২৫ সালের মেট গালায় কালো লেসের পোশাক পরেছিলেন তিনি। তখন তাঁর পোশাকের সঙ্গে থাকা আঁটসাঁট পোশাকে রোজা পার্কসের মুখ রয়েছে বলে দাবি করেন অনেকে। তবে সেই দাবি সঠিক ছিল না।
অন্যদিকে কোচেলায় লিসার পরিবেশনা প্রশংসিত হয়। গত মাসে এমটিভি ভিডিও মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসের মঞ্চেও পারফর্ম করেন তিনি।
নিজের কাজের স্বাধীনতা নিয়ে লিসা বলেন, ‘আমি কিছু করতে চাইলে করে ফেলি। অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন হয় না। কোনো ধারণা মাথায় এলে আমরা তা বাস্তবায়ন করি। নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করতে ভালো লাগে। কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।’
গান ও নাচের পাশাপাশি অভিনয়েও এগিয়ে যাচ্ছেন লিসা। এইচবিওর সিরিজ ‘দ্য হোয়াইট লোটাস’-এর তৃতীয় মৌসুমে মুক চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। থাইল্যান্ডের পটভূমিতে তৈরি এই মৌসুমে মুক একটি রিসোর্টের কর্মী। সিরিজে এক নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অভিনয়ে সুযোগ পাওয়াকে নিজের জন্য বড় ঘটনা মনে করেন লিসা। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই গান গাইছি, নাচছি। কিন্তু অভিনয় আমার কাছে নতুন। আমি যে চরিত্রটি পেয়েছি, সেটাই অবিশ্বাস্য। আমার মধ্যে কিছু একটা দেখতে পেয়েছেন বলে মাইক হোয়াইটকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। এই সিরিজের অংশ হতে পেরে আমি সৌভাগ্যবান।’
সিরিজটির নির্মাতা মাইক হোয়াইটও প্রথমে কে-পপ তারকাকে অভিনয়ে নেওয়ার বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। তবে লিসার সঙ্গে পরিচয়ের পর তাঁর ধারণা বদলে যায়।
পরিচালক সু কিমের মতে, কঠিন এক জগতে থেকেও লিসা সহজ-সরল মানুষ হিসেবে নিজেকে ধরে রেখেছেন। তাঁর মধ্যে একটা নিষ্পাপ ভাব আছে। লিসার অনেক ভক্তও তাঁকে আগলে রাখতে চান। তাঁদের এই অনুভূতি বুঝতে পারেন সু কিম।
এবার নেটফ্লিক্সের দুটি ছবিতে দেখা যাবে লিসাকে। এর একটি রোমান্টিক কমেডি। ‘নটিং হিল’ ছবির অনুপ্রেরণায় তৈরি হবে এটি। চিত্রনাট্য লিখেছেন কেটি সিলবারম্যান। অন্য ছবিটি দক্ষিণ কোরিয়ার অ্যাকশন থ্রিলার ‘টাইগো’। পরিচালনা করছেন লি সাং-ইয়ং।
নতুন কাজ নিয়ে লিসা বলেন, ‘আমি সব ধরনের কাজের জন্যই আগ্রহী।’
সিনেমার পছন্দ নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। লিসা বলেন, ‘আমি “নটিং হিল” ভালোবাসি। আমি খুব একটা বাছবিচার করি না। অ্যানিমেশন দেখতে পারি। ডিজনির সিনেমাও ভালো লাগে। তবে ভৌতিক সিনেমা খুব একটা পছন্দ করি না। কারণ, আমি তো বাচ্চা!’
এপি অবলম্বনে
More News Of This Category

