চুল পড়ার কারণে হোক কিংবা নিজের পছন্দে- টাকমাথার স্টাইল এখন অনেকের কাছেই আকর্ষণীয়। সহজে পরিচর্যা করা যায় এবং ব্যক্তিত্বে আলাদা মাত্রা যোগ করে বলে অনেকে এই স্টাইল বেছে নেন। তবে মাথায় চুল না থাকলেও ত্বকের যত্নের প্রয়োজন কমে না। বরং নিয়মিত শেভ করা, ত্বকে আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে মাথার ত্বক সুরক্ষিত রাখা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখের ত্বকের মতো মাথার ত্বকেরও নিয়মিত যত্ন নেওয়া উচিত। সঠিক পদ্ধতিতে শেভ করা থেকে শুরু করে ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন ব্যবহার- কিছু অভ্যাস টাকমাথার ত্বক সুস্থ রাখতে পারে।
টাকমাথাকে স্বাভাবিকভাবে নিন
কারও কারও কাছে মাথা ন্যাড়া রাখা একান্তই ব্যক্তিগত পছন্দ। আবার অনেকে চুল পড়ার বিষয়টি মেনে নিয়ে টাকমাথার স্টাইল বেছে নেন। ৩৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই দুই-তৃতীয়াংশের বেশি পুরুষ কোনো না কোনো মাত্রায় চুল পড়ার সমস্যায় ভোগেন।
নিউইয়র্কের বোর্ড-সার্টিফায়েড চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ মারিসা গারশিক বলেন, পুরুষদের বংশগত টাক পড়ার পেছনে ডাইহাইড্রো টেস্টোস্টেরনসহ নির্দিষ্ট কিছু হরমোনের ভূমিকা রয়েছে। এসব হরমোনের প্রভাবে চুলের ফলিকল ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায়। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় মিনিয়েচারাইজেশন।
নিউইয়র্কের চর্মরোগ ও কসমেটিক ডার্মাটোলজি বিশেষজ্ঞ র্যাচেল নাজারিয়ানের মতে, ‘কিছু ওষুধ, বাইরের আঘাত বা ক্ষতি এবং কিছু অটোইমিউন রোগের কারণেও টাক পড়তে পারে। তবে এগুলো তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়।’
চুল পড়া কমাতে কিংবা নতুন চুল গজাতে অনেকে বিশেষ শ্যাম্পু, মিনোক্সিডিল লোশন ও মুখে খাওয়ার ওষুধ ব্যবহার করেন। তবে কেউ কেউ সম্পূর্ণ টাকমাথার স্টাইলকেই পছন্দ করেন। যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, মাথার ত্বকের যত্নে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
চুলের ধরন ও ত্বকের সংবেদনশীলতা বুঝুন
টাকমাথার স্টাইল বেছে নেওয়ার আগে নিয়মিত পরিচর্যার বিষয়টি মাথায় রাখা প্রয়োজন। বার্বার ও পুরুষদের গ্রুমিং বিশেষজ্ঞ জেসন বিগস বলেন, ‘মাথা কামিয়ে পরিষ্কার ও পরিপাটি লুক পাওয়া যায়। তবে এই লুক ধরে রাখতে নিয়মিত যত্ন নিতে হয়।’ এ ক্ষেত্রে ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন ব্যবহার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
চুলের ধরনও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। বিগস বলেন, ‘বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের মধ্যে ত্বকের কাছাকাছি চুল কাটার কারণে ত্বকের ভেতরে চুল গজানোর সমস্যা দেখা দিতে পারে। কোঁকড়ানো বা মোটা চুল আবার গজানোর সময় কখনো কখনো ত্বকের ভেতরের দিকে ঢুকে যায়। এতে ত্বকে ছোট ছোট ফোলা দানা, জ্বালাপোড়া ও সংক্রমণ হতে পারে।’
এ ধরনের সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকলে মাথা কামানোর আগে বার্বারের সঙ্গে পরামর্শ করা ভালো। শেভ করার সময়ও ত্বকে জ্বালাপোড়া, প্রদাহ ও ত্বকের ভেতরে চুল গজানোর ঝুঁকি থাকে। তাই এসব সমস্যা কমাতে কোমল শেভিং ক্রিম, ভালো মানের রেজর ও ধারালো ব্লেড বেছে নেওয়া প্রয়োজন।
শেভ করার আগে ক্লিপার ব্যবহার করুন
মাথায় রেজর চালানোর আগে ক্লিপার দিয়ে চুল যতটা সম্ভব ছোট করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারকাদের হেয়ারস্টাইলিস্ট অ্যান্ড্রু ফিটজসিমন্স। এতে রেজর ত্বকের কাছাকাছি গিয়ে সমানভাবে চুল কাটতে পারে।
বিগসের পরামর্শ, শেভ করার আগে মাথায় কিছুক্ষণ গরম তোয়ালে রাখুন। এতে চুল নরম হয় এবং ত্বকের রোমকূপের মুখ কিছুটা উন্মুক্ত হয়। এরপর প্রি-শেভ অয়েল ব্যবহার করলে ত্বকে পিচ্ছিল ভাব তৈরি হয়, যা শেভ করার সময় ঘর্ষণ কমাতে সাহায্য করে। মাথার চুল গজানোর সঙ্গে সঙ্গে আবার ছেঁটে নিতে ক্লিপার হাতের কাছে রাখাও ভালো।
পরিষ্কার ও নতুন রেজর ব্যবহার করুন
রেজর বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে চুলের ধরন বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করেন বিগস। চুল যত কম কোঁকড়ানো, শেভ করার সময় তত বেশি ব্লেড ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন, সোজা চুলের ক্ষেত্রে তিন ব্লেডের সাধারণ ডিসপোজেবল রেজরই যথেষ্ট হতে পারে। তবে মোটা ও কোঁকড়ানো চুল কিংবা সংবেদনশীল ত্বকের জন্য এক ব্লেডের রেজর ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।
বিগস বলেন, ‘একটি ব্লেড ব্যবহার করলে একই জায়গায় বারবার রেজর চালানোর প্রয়োজন কমে। ফলে অতিরিক্ত জ্বালাপোড়ার ঝুঁকিও কমতে পারে।’
কেটে যাওয়া বা ত্বকে ক্ষত তৈরি হওয়া এড়াতে প্রতিবার শেভ করার সময় নতুন রেজর ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন ফিটজসিমন্স। শেভিং ক্রিম ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, ‘চুল নরম করতে এবং রেজর সহজে চালানোর উপযোগী পিচ্ছিল পৃষ্ঠ তৈরি করতে শেভিং ক্রিম প্রয়োজন। এতে কাছ থেকে পরিষ্কারভাবে শেভ করা যায়।’
প্রতিবার রেজর চালানোর পর ব্লেড ধুয়ে নিতে হবে, যাতে জমে থাকা চুল ও শেভিং ক্রিম পরিষ্কার হয়ে যায়। মাথার পেছনে বা অন্য কোনো অংশে চুল থেকে গেল কি না, তা দেখতে একাধিক আয়না ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন ফিটজসিমন্স। প্রয়োজনে হাতে ধরা যায় এমন আয়নাও ব্যবহার করা যেতে পারে।
শেভিং ক্রিম ব্যবহার করতে না চাইলে সুগন্ধিবিহীন কন্ডিশনিং ক্লিনজার বা জেল ব্যবহার করা যায় বলে পরামর্শ দিয়েছেন নাজারিয়ান। তার মতে, ‘এগুলো ত্বককে নরম ও প্রস্তুত করতে সাহায্য করে এবং রেজর চালানোর সময় পিচ্ছিলভাব তৈরি করে।’
তিনি অ্যাভিনো থেরাপিউটিক শেভ জেল ও ডাভ সেনসিটিভ স্কিন বডি ওয়াশের মতো পণ্য ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর পছন্দ দুইটির বেশি ব্লেড নেই- এমন ডিসপোজেবল রেজর, যা ত্বকে জ্বালাপোড়ার ঝুঁকি কমিয়ে ভালোভাবে শেভ করতে সাহায্য করতে পারে।
শেভ করার পর ত্বকের যত্ন নিন
মাথা কামানোর পরপরই ত্বকের যত্ন নেওয়া জরুরি। এতে ত্বকের ভেতরে চুল গজানো এবং রেজরের ঘর্ষণে সৃষ্ট জ্বালাপোড়া কমানো যায়। বিগসের পরামর্শ, শেভ করার পর মাথায় ঠান্ডা তোয়ালে ব্যবহার করে ত্বক সতেজ করে নিতে হবে। এরপর প্রশান্তিদায়ক ময়েশ্চারাইজার বা জোজোবা অয়েল লাগানো যেতে পারে। এতে সদ্য শেভ করা মাথার ত্বক আরাম পায় এবং আর্দ্রতা বজায় থাকে।
যারা প্রথমবার মাথা কামাচ্ছেন কিংবা যাদের ত্বকে সহজেই জ্বালাপোড়া হয়, তাদের জন্য অ্যালোভেরা জেল উপকারী হতে পারে। এটি ত্বককে প্রশমিত করতে এবং রেজরের ঘর্ষণে সৃষ্ট অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে।
মাথার ত্বকের জন্যও নিয়মিত স্কিনকেয়ার
মাথায় চুল না থাকলেও সেখানে ধুলা-ময়লা, ঘাম ও তেল জমতে পারে। তাই নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ফিটজসিমন্স বলেন, ‘মাথার ত্বকও শরীরের অন্য অংশের ত্বকের মতোই। তাই মুখের ত্বকের যত্নে যে উপাদানগুলো ব্যবহার করেন, সেগুলোর কিছু মাথার ত্বকের যত্নেও যুক্ত করতে পারেন।’
তার মতে, অল্প শ্যাম্পু দিয়ে মাথার ত্বক পরিষ্কার করা এবং প্রতিদিন ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা উচিত। এতে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং শুষ্কতা কমে।
মুখে ফেসমাস্ক ব্যবহার করলে মাথার ত্বকেও উপযুক্ত পণ্য ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত মাথার ত্বকে হালকা মালিশ করা উপকারী। স্ক্যাল্প স্ক্রাব ব্যবহার করলে ত্বকের মৃত কোষ দূর করতে সাহায্য করতে পারে। তবে সংবেদনশীল ত্বকে অতিরিক্ত ঘষাঘষি এড়িয়ে চলা উচিত।
সানস্ক্রিনের ব্যবহার ভুলবেন না
টাকমাথার যত্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বককে সুরক্ষিত রাখা। চুল সাধারণত মাথার ত্বককে সূর্যের আলো থেকে কিছুটা আড়াল করে রাখে। মাথায় চুল না থাকলে অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি ত্বকে পড়ে। এতে রোদে পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের ক্ষতি, অকাল বার্ধক্য এবং ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
নাজারিয়ান বলেন, ‘চুল প্রায়ই সূর্যের আলো থেকে ত্বককে রক্ষা করার ঢাল হিসেবে কাজ করে। চুল না থাকলে মাথার ত্বক পুড়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের ক্ষতির শিকার হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। কামানো মাথায় অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি পড়ে, যা অকাল বার্ধক্য ও ত্বকের ক্যানসারের কারণ হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ত্বকের যত্নের যে রুটিন সাধারণত মুখ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে, এখন তাতে মাথার ত্বককেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টযুক্ত পণ্য, সানস্ক্রিন এবং টুপি পরার মতো সূর্য থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা।’
নাজারিয়ানের মতে, মাথার ত্বকে রোদে পোড়া নিজেই অস্বস্তিকর। এর পাশাপাশি নিয়মিত সূর্যের ইউভিএ ও ইউভিবি রশ্মির সংস্পর্শে থাকলে মুখের ত্বকের মতো মাথার ত্বকেও কালচে দাগ, জ্বালাপোড়া এবং ত্বকের দৃঢ়তা কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাই বাইরে যাওয়ার আগে মাথার ত্বকে উপযুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী টুপি পরা উচিত।
টাকমাথা কি প্রতিদিন ধোয়া উচিত?
হ্যাঁ। মাথার ত্বকে জমে থাকা ধুলা-ময়লা, ঘাম ও অতিরিক্ত তেল দূর করতে প্রতিদিন পরিষ্কার করা ভালো। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, মাথার ত্বকের যত্নও মুখের ত্বকের যত্নের মতো নিয়মিত হওয়া উচিত।
সূত্র: ডিজিটাল বিউটি, ফ্যাশন এবং লাইফস্টাইল বিষয়ক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বাইরডিতে লেখা ব্রায়ান লেভানডভস্কির আর্টিকেল থেকে নেওয়া।
