সারা দেশে গত মাসে (সেপ্টেম্বর) সংঘটিত মোট সড়ক দুর্ঘটনার ১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। গত মাসে দেশে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন প্রাণ হারান। মোট প্রাণহানির ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ, অর্থাৎ ৭৫ জন মারা গেছেন চট্টগ্রাম বিভাগে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনাগুলোতে। একইসঙ্গে পুরো দেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অতিঝুঁকিপূর্ণ ২১টি এলাকার তিনটিই চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে পড়েছে। এসব তথ্য ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’–এর। আবার সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে অন্য একটি সংস্থার পরিচালিত জরিপে উঠে এসেছে, চট্টগ্রাম শহরে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর প্রাণ হারায় ৮২ জন।
পৃথক পৃথক তথ্যগুলো বিশ্লেষণে স্পষ্ট, চট্টগ্রাম শহর ও জেলার সড়কগুলো দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনাজনিত প্রাণহানির ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ এখানকার সড়কগুলো নিরাপদ নয়। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে আজ বৃহস্পতিবার পালিত হবে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’। জনসচেতনতা সৃষ্টি ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে দেশে সরকারিভাবে প্রথম ২০১৭ সালে পালন করা হয়।
গতিই আসল কারণ : রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। এই গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ দরকার। যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ ফাউন্ডেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠানও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করে। তারা সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে ৬টি পর্যবেক্ষণ দেয়। এতে বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানোকেও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
গত বছরের (২০২৫) নভেম্বর মাসে চট্টগ্রাম শহরে সড়ক ব্যবহারে আচরণগত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণে পরিচালিত এক জরিপে বলা হয়, গতিসীমা লক্সঘন করায় নগরে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি। ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেইফটি (বিআইজিআরএস) কর্মসূচির আওতায় জেএইচ–আইআইআরইউ ও সিআইপিআরবি চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাদের ২০২১–২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বৈশ্বিক মানদণ্ড বিবেচনায় শহরের ৩৪ শতাংশ যানবাহনই নির্ধারিত গতিসীমা লক্সঘন করেছে। লোকাল ও কালেকটর রোডে ৪৫ শতাংশ যানবাহন নির্ধারিত গতিসীমা অমান্য করেছে। নগরে চলাচলকারী ৭০ শতাংশ মোটরসাইকেল চালক গতিসীমা অমান্য করেছে। এছাড়া নগরের সড়কগুলোতে চলাচল করা ৪৪ শতাংশ যানবাহনই বিআরটিএ নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলে না। সপ্তাহের কর্ম দিবসের তুলনায় ছুটির দিনে গতিসীমা লক্সঘনের হার বেশি। কর্ম দিবসে গতিসীমা লক্সঘনের হার ৪২ শতাংশ হলেও ছুটির দিনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭ শতাংশে।
শহরে প্রতিবছর প্রাণ হারায় ৮২ জন : ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল আট বছরে নগরে মোট ৬১৬টি মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৬২ জন মানুষ। অর্থাৎ প্রতিবছর মারা গেছেন ৮২ জন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে এসে নগরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ২৯ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ২৭ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়কে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর শিকার হচ্ছেন সাধারণ পথচারীরা। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোট নিহতের ৫৯ শতাংশই (১৪৬ জন) পথচারী। ২০১৭ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে পথচারী মৃত্যুর হার বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পথচারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশু (১ থেকে ১০ বছর বয়সী)।
বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত গতি, পথচারীদের জন্য নিরাপদ ফুটপাত ও পারাপারের অভাব এবং দূরপাল্লার ভারী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচলেই চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। অনতিবিলম্বে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও করিডোরগুলোতে কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে প্রাণহানি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৩ বছরে লক্ষাধিক প্রাণহানি : বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১৩ বছরে সারা দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ৩ হাজার ২৮৮ সড়ক দুর্ঘটনায় ৩ হাজার ২০৭ জন মারা গেছেন।
নিরাপদ নয় শিশুরাও : গতকাল প্রকাশিত রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু প্রাণ হারায়। এর মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া–আসার সময় নিহত হয়েছে ২ হাজার ৫১৩ জন শিশু এবং বসত বাড়ির আশেপাশের সড়কে খেলার সময় নিহত হয়েছে ৯৬২ জন শিশু।
সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যুর হার বৃদ্ধির কারণ হিসেবে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ৬টি কারণ তুলে ধরে। সেগুলো হচ্ছে– দেশের সড়ক ও সড়ক পরিবহন শিশুবান্ধব না হওয়া, নিরাপদে সড়ক ব্যবহার সম্পর্কে শিশুদের মধ্যে সচেতনতার অভাব। পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপদে সড়ক ব্যবহার সম্পর্কে শিশুদের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ না দেয়া। অদক্ষ ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালক কর্তৃক যানবাহন চালানো। দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের উপযুক্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকট এবং আহত শিশুদের চিকিৎসায় পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা।
ঝুঁকিতে চট্টগ্রামের তিন উপজেলা : রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ২০২০–২০২৪ পাঁচ বছরে সারা দেশে সংঘটিত মোট ৩৭ হাজার সড়ক দুর্ঘটনার উপর ভিত্তি করে একটি গবেষণা চালায়। এতে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অতিঝুঁকিপূর্ণ ২১টি এলাকা উঠে আসে। যার তিনটিই চট্টগ্রামে। এগুলো হচ্ছে– মীরসরাই, সীতাকুণ্ড ও পটিয়া উপজেলা। এই তিন উপজেলায় ২০২০–২০২৪ সালে ৭৫৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৬৫৩ জন। এর মধ্যে মীরসরাইয়ে ২৯০ দুর্ঘটনায় ৩০৭ জন, সীতাকুণ্ডে ২৭৭ দুর্ঘটনায় ১৯৫ জন এবং পটিয়ায় ১৮৯ দুর্ঘটনায় ১৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একইসময়ে চট্টগ্রাম শহরে ১৮৮ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৪২ জন।
এছাড়া পাঁচ বছরে সংঘটিত ৩৭ হাজার দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেশে ১৭৫টি দুর্ঘটনাপ্রবণ এবং ১৩৯টি অতি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম শহর ছাড়াও পটিয়া, হাটহাজারী, লোহাগাড়া, মীরসরাই, রাঙ্গুনিয়া ও রাউজান রয়েছে।
