নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময় পর্দায় তাঁর অভিনয় দেখে দর্শক হেসেছেন, কেঁদেছেন, মুগ্ধ হয়েছেন। কখনো হয়েছেন পরিবারের পরিচিত মানুষ, কখনো গল্পের অবিচ্ছেদ্য চরিত্র। আলো-ঝলমলে মঞ্চ কিংবা ক্যামেরার সামনে তাঁর ছিল সাবলীল উপস্থিতি। অথচ আজ সেই অভিনেতার জীবনেই যেন এক বিষাদময় গল্পের অবতারণা। চারপাশে নেই ক্যামেরার আলো, নেই পরিচালকের ‘অ্যাকশন’ নির্দেশ। আছে একাকিত্ব, অসুস্থতা আর অনিশ্চিত পথচলা। তিনি অভিনেতা সমু চৌধুরী।
তিন দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে পাঁচ শতাধিক নাটক ও ডজনখানেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এই শিল্পীর বর্তমান জীবন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবি ও ভিডিওতে উঠে আসছে। কখনো মাজারে, কখনো বাজারে, কখনো আবার পথে-প্রান্তরে তাঁকে দেখা যাচ্ছে। এসব ভিডিও দেখে অনেকে ব্যথিত হচ্ছেন। কিন্তু কিছু মানুষের কাছে তাঁর এই অসহায় মুহূর্ত যেন রিল তৈরির উপকরণ। একজন মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষকে ঘিরে ধরে ভিডিও করা, প্রশ্ন করে উত্তেজিত করা কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্ত জনসমক্ষে ছড়িয়ে দেওয়া—তাঁর কষ্টকে আরও বাড়িয়ে তুলছে বলে মনে করছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষেরা।
যে মানুষটি একসময় অভিনয় দিয়ে হাজারো মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন, আজ তাঁর প্রয়োজন সেই মানুষেরই একটু ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও নিরাপদ আশ্রয়। তাঁকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন যশোরের সাংস্কৃতিক কর্মীরা।
বাবা-বোনের মৃত্যু বদলে দেয় জীবন :
১৯৬৪ সালের ৮ জুন যশোরে জন্ম সমু চৌধুরীর। আশির দশকে যশোর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর পথচলা শুরু। প্রায় ১০ বছর পথনাটক, মঞ্চনাটক ও গণসংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ঢাকায় গিয়ে যুক্ত হন সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি), ঢাকা উদীচী, ঢাকা থিয়েটার ও নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের সঙ্গে।
১৯৯০ সালের ২২ মার্চ আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় ‘সমৃদ্ধ অসীম’ নাটকের মাধ্যমে বাংলাদেশ টেলিভিশনে অভিষেক হয় তাঁর। প্রথম নাটকের সম্মানী ছিল মাত্র ৭০০ টাকা। সেই শুরু। এরপর ‘জন্মভূমি’, ‘বিবর্ণ প্রজাপতি’, ‘কালো জোছনা’, ‘রঙের মানুষ’, ‘নিশিকুটুম্ব’ ও ‘উঠোন’সহ অসংখ্য নাটকে অভিনয় করে পরিচিতি পান।
১৯৯৫ সালে আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘আদরের সন্তান’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক। এরপর ‘মায়ের অধিকার’, ‘দেশ দরদী’, ‘সুন্দরী বধূ’, ‘নদীর নাম মধুমতী’, ‘গলুই’ ও ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। সাম্প্রতিক সময়ে ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’ (২০২৪) ও ‘নয়া নোট’ (২০২৫)-এর মতো ওটিটি কাজেও দেখা গেছে তাঁকে।
কিন্তু অভিনয়ের সাফল্যের আড়ালে তাঁর ব্যক্তিজীবনে জমেছিল অনেক না-বলা কষ্ট। ১৯৯৩ সালের ২৬ জুলাই জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাতটি পান তিনি। ছোট বোন রোজিনা চৌধুরী রুবিকে নিয়ে ফেরার পথে ঝিকরগাছা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তাঁর বাবা পুলিশ কর্মকর্তা আবুল কাশেম চৌধুরী ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী বোন রুবি।
এক দুর্ঘটনায় বাবা ও বোনকে হারানোর শোক কতটা গভীর হতে পারে, তা হয়তো অনুভব করা সম্ভব কেবল তাঁরই। এরপর ২০১৮ সালে ছোট ভাই সনু চৌধুরীকেও হারান তিনি। একে একে পরিবারের আপনজনেরা চলে গেছেন। থেকে গেছেন তিনি আর তাঁর বৃদ্ধা মা।
পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে মায়ের দেখাশোনার জন্য বিয়েও করেননি সমু চৌধুরী। এক সাক্ষাৎকারে নিজেই জানিয়েছিলেন সেই সিদ্ধান্তের কথা। মাকে ঘিরেই ছিল তাঁর ব্যক্তিজীবনের বড় অংশ। আজ সেই মায়ের বয়স হয়েছে। আর ছেলেকে ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
তার কষ্ট যেন কারও বিনোদন না হয় :
অভিনয় থেকে একসময় প্রায় তিন বছর দূরে ছিলেন সমু চৌধুরী। ঢাকার ব্যস্ততা ছেড়ে ফিরে গিয়েছিলেন যশোরের গ্রামের বাড়িতে। পরে শিল্পী ঐক্য জোটের মাধ্যমে আবার অভিনয়ে ফেরেন। কিন্তু জীবনের সাম্প্রতিক বাস্তবতা তাঁকে আবারও আলো-ঝলমলে জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার মুখী শাহ মিসকিন মাজারে গামছা পরা অবস্থায় তাঁর একটি ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনি জানান, ওরস উপলক্ষে সেখানে গিয়েছিলেন। কাপড় শুকানোর সময় গামছা পরে গাছের নিচে বিশ্রাম নেওয়ার মুহূর্তটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে স্বজন ও অভিনয়শিল্পী সংঘের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাঁকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেন। এরপর তিনি যশোরে মায়ের কাছে ফিরে আসেন।
সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর যশোর শহরের বেজপাড়া নলডাঙ্গা সড়কের নতুন বাজার এলাকায় নিজের বাড়ির সামনে হামলার শিকার হন তিনি। সম্প্রতি লালন শাহের মাজারে তাঁর কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
প্রতিটি ভিডিওর পেছনে যেন একজন মানুষের অসহায়ত্বের গল্প। অথচ সেই গল্পের প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার বদলে কেউ কেউ ব্যস্ত তাঁকে ক্যামেরাবন্দী করতে। তাঁর সঙ্গে কথা বলার নামে বিরক্ত করা হচ্ছে, রিল তৈরির জন্য ঘিরে ধরা হচ্ছে। মানসিকভাবে অসুস্থ একজন মানুষের জন্য এমন আচরণ কতটা ক্ষতিকর হতে পারে, তা কি একবারও ভাবছেন তাঁরা?
পাশে দাঁড়াতে চান সাংস্কৃতিক কর্মীরা :
সমু চৌধুরীর বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যথিত সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু। তিনি বলেন, জনপ্রিয় এই নাট্যাভিনেতার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা তাঁদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। বিশেষ করে ইউটিউবারদের একটি অংশ তাঁকে যেখানে পাচ্ছে, সেখানে রিল তৈরির জন্য ঘিরে ধরছে। তাঁকে উত্ত্যক্ত ও উত্তেজিত করছে। এতে তাঁর অসুস্থতা আরও জটিল হতে পারে।
দুলু বলেন, ‘সমু চৌধুরী আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের গর্ব। একসময় তাঁর অভিনয়ে মানুষ মুগ্ধ হয়েছে। আজ তিনি অসুস্থ। এই অবস্থায় তাঁকে ঘিরে ধরে ভিডিও তৈরি করা কোনোভাবেই মানবিক আচরণ নয়। আমরা ইউটিউবারদের অনুরোধ করছি, তাঁকে বিরক্ত করবেন না। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি সম্মান দেখান।’
তিনি জানান, বৃদ্ধা মা ছাড়া সমু চৌধুরীর পরিবারে আর কেউ নেই। তাই পরিবারের অন্য স্বজন, স্থানীয় সুহৃদ ও তাঁর দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচীকে সঙ্গে নিয়ে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁকে একটু স্বস্তির জীবন ফিরিয়ে দেওয়াই তাঁদের লক্ষ্য।
উদীচী যশোরের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব বলেন, সমু চৌধুরীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে তাঁরা অত্যন্ত চিন্তিত ও ব্যথিত। তাঁকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আওতায় আনার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দ্রুত আলোচনা করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ জন্য সবার সহযোগিতাও কামনা করেন তিনি।
শেষ দৃশ্যটা যেন এমন না হয় :
একজন অভিনেতার জীবনে কত শত চরিত্র আসে। কখনো তিনি বাবা, কখনো ভাই, কখনো বন্ধু, কখনো আবার নির্মম কোনো চরিত্রের প্রতিচ্ছবি। দর্শক প্রতিটি চরিত্রে তাঁকে গ্রহণ করেন, ভালোবাসেন। কিন্তু বাস্তব জীবনের এই মানুষটিরও যে একটি মন আছে, দুঃখ আছে, হারানোর বেদনা আছে—সেটি হয়তো আমরা অনেক সময় ভুলে যাই।
সমু চৌধুরীও একসময় কারও সন্তান ছিলেন, কারও ভাই ছিলেন। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নিজের অনেক ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়েছেন। বাবা, বোন ও ভাইকে হারিয়ে জীবনের অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছেন একা। আজ তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে প্রয়োজন মানুষের পাশে থাকা।
তাঁর অসহায় মুহূর্তের ভিডিও ভাইরাল করে নয়, তাঁকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে, ভালোবাসা দিয়ে পাশে দাঁড়ানোই হোক আমাদের দায়িত্ব।
