যৌথ সামরিক মহড়া, অস্ত্র উৎপাদন ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে সহযোগিতা।
সৌদি আরবে থাকবে সচিবালয়, প্রথম মহাসচিব হবেন পাকিস্তানের নাগরিক।
চুক্তিতে নতুন দেশ যুক্ত করার নিয়ম তিন দেশ ঐকমত্যে ঠিক করবে।
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মেয়াদ অনির্দিষ্টকাল। তবে কার্যকর হওয়ার প্রথম ১০ বছর কোনো দেশ এ চুক্তি থেকে সরে যেতে পারবে না। ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর কোনো দেশ বের হতে চাইলে তিন মাস আগে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে হবে।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় ১৬ ধারার চুক্তিটি সই হয়। চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ বিবরণী যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের হাতে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার অনুমোদনের জন্য চুক্তিটি তুরস্কের পার্লামেন্টে জমা দেওয়া হয়েছে।
চুক্তির বিবরণীতে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলকে হুমকি বলা হয়নি। বরং তিন দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ড ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত রক্ষায় পারস্পরিক সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।
হামলা হলে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা
দ্বিতীয় ধারায় বলা হয়েছে, ‘যেকোনো পক্ষের ওপর বাইরে থেকে সশস্ত্র হামলা হলে তা সব পক্ষের ওপর হামলা বলে বিবেচিত হবে।’ কোনো দেশ এক বা একাধিক দেশের সামরিক আগ্রাসনের শিকার হলে অন্যরা অবিলম্বে সহায়তা করবে। প্রয়োজন যাচাই করে নিজেদের সক্ষমতার মধ্যে সামরিক উপায়ও ব্যবহার করতে পারবে। জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকারের ভিত্তিতে এই সহযোগিতা হবে।
প্রথম ধারায় বলা হয়েছে, কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ড বা স্বীকৃত সীমান্ত হুমকিতে পড়লে তা দূর করতে সব প্রয়োজনীয় উপায় ব্যবহার করবে অন্যরা।
অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য
নিরাপত্তা বিষয়ে তিন দেশ নিয়মিত পরামর্শ করবে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে। শান্তিকাল ও যুদ্ধকালে সামরিক সদস্য বিনিময়, যৌথ প্রশিক্ষণ, মহড়া এবং প্রয়োজনীয় সেনা মোতায়েনের ব্যবস্থা থাকবে।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ গবেষণা, অস্ত্র ও সরঞ্জাম উৎপাদন এবং বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণে সহযোগিতা করা হবে। প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি, যন্ত্রাংশসহ রসদ দেওয়া হবে। নিরাপত্তাব্যবস্থায় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ও হবে।
কমিটি, গোপনীয়তা ও শর্ত
তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক বাহিনীর প্রধানদের নিয়ে যৌথ কমিটি গঠিত হবে। বছরে দুবার পালাক্রমে তিন দেশে বৈঠক করবে কমিটি। প্রয়োজনে তিন দেশের নেতারা বছরে একবার মিলিত হবেন। সৌদি আরবে থাকবে সচিবালয়। তিন দেশের মধ্য থেকে পালাক্রমে তিন বছর মেয়াদে মহাসচিব নিয়োগ হবে। প্রথম মহাসচিব হবেন পাকিস্তান থেকে।
চুক্তিতে নতুন দেশ যুক্ত করার নিয়ম তিন দেশ ঐকমত্যে ঠিক করবে। গোপন নথি বাইরের কোনো দেশ, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছে দেওয়া যাবে না। কেবল প্রয়োজন এবং যথাযথ নিরাপত্তা অনুমোদন থাকলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এসব তথ্য দেখতে পারবেন।
এই পূর্ণাঙ্গ বিবরণীকে তিন দেশ চুক্তি বাস্তবায়নে আইনি ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত আইনি ব্যবস্থার প্রস্তাব দেওয়া হবে। আগে করা আন্তর্জাতিক চুক্তির অধিকার ও দায় অক্ষুণ্ন থাকবে। মতবিরোধ আলোচনার মাধ্যমে মেটাতে হবে। চুক্তি বদলাতে তিন দেশের সম্মতি লাগবে।
সব দেশ চুক্তিটি অনুমোদনের পর সর্বশেষ অনুমোদনপত্র মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সচিবালয়ে জমা দিলে এটি কার্যকর হবে। কার্যকর হওয়ার ১০ বছর পর কোনো দেশ চাইলে চুক্তি থেকে সরে যেতে পারবে। এ জন্য অন্তত তিন মাস আগে অন্য দেশগুলোকে লিখিত নোটিশ দিতে হবে।
তবে চুক্তি থেকে সরে গেলেও আগে সম্মত হওয়া চলমান কার্যক্রম ও প্রকল্পের ওপর এর প্রভাব পড়বে না। গোপন নথি সুরক্ষিত রাখার বাধ্যবাধকতাও বহাল থাকবে। তুর্কি, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় চুক্তিটি সই হয়েছে। এই তিন ভাষার পাঠের ব্যাখ্যায় মতভেদ দেখা দিলে ইংরেজি পাঠ প্রাধান্য পাবে।
সৌদিতে সেনা পাঠাতে চায় তুরস্ক
গতকাল বুধবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, চুক্তি অনুমোদনের পর সৌদিতে সেনাসদস্য পাঠানোর অনুমতি চাইবে তুরস্ক সরকার। ক্ষমতাসীন এ কে পার্টির এক আইনপ্রণেতার ভাষ্যমতে, প্রথমে আকাশ প্রতিরক্ষা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রযুক্তির বিশেষজ্ঞরা যাবেন। তবে তাঁরা আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেবেন না। হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়ে লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের নিরাপত্তায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিতেও রাজি হয়েছে তুরস্ক।
গতকাল কাতারের রাজধানী দোহায় তুরস্ক, কাতার, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া পৃথক একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে। এতে সামরিক উৎপাদন, যৌথ প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং গবেষণা ও উন্নয়নে সহযোগিতার কথা রয়েছে।
