চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিম চাম্বলের সাগরপাড়ের প্রত্যন্ত জেলেপল্লি। দরিদ্র জেলে সম্প্রদায়ের বসবাস। এই এলাকার বাংলাবাজার সর্বজনীন বুড়া কালী মন্দিরে ১৯৮৪ সাল থেকে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়ে আসছে। আয়োজকদের দাবি, দীর্ঘ ৪২ বছরে কোনো জেলা প্রশাসক এই মন্দিরে আসেননি। এবার মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় সেই জেলেপল্লির পূজামণ্ডপে হাজির হলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
রোববার (১৮ অক্টোবর) তাকে কাছে পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
শুধু আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন নয়, জেলা প্রশাসক ঘুরে দেখেন পূজামণ্ডপ, কথা বলেন আয়োজক ও স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে। তাদের উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করেন। নারীদের হাতে তুলে দেন শাড়ি। নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা উদযাপনে প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তার আশ্বাস দেন।
মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি গুরুধন দাশ বলেন, দরিদ্রপীড়িত এই জেলেপল্লিতে ডিসি স্যারকে পেয়ে আমরা অনেক আনন্দিত। তিনি নির্বিঘ্নে দুর্গোৎসব পালনে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এতে আমরা আশ্বস্ত হয়েছি।
কমিটির সাধারণ সম্পাদক রতন দাশ বলেন, এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে জেলা প্রশাসক আমাদের দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানাতে আসবেন, এটা কল্পনাও করিনি। ১৯৮৪ সালে মন্দিরে দুর্গাপূজা শুরুর পর গত ৪২ বছরে এই প্রথম কোনো জেলা প্রশাসক এখানে এসেছেন।
জেলেপল্লির মানুষের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটিই প্রথম দুর্গাপূজা। তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষসহ সব সম্প্রদায় যাতে সমানভাবে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে পারে, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা প্রমাণ করতে চাই, এই দেশে সব জাতি, সব সম্প্রদায়, সে যত ছোটই হোক, সরকার তাদের পাশে আছে। তারা তাদের উৎসবগুলো আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করবে। আমাদের জেলে ভাইয়েরাও যাতে এই উৎসব নির্বিঘ্নে, আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করতে পারেন, সে জন্য আজ আমরা এই জেলেপল্লিতে এসেছি।
মন্দিরের আয়োজনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, জায়গা কোনো বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে, সবাই এসে আনন্দ উদযাপন করতে পারলেন কি না, তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতি ও রীতিনীতি পালন করতে পারলেন কি না।
পশ্চিম চাম্বলের এই এলাকায় অতীতে পূজামণ্ডপে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। বাংলাবাজার জলদাসপাড়ার পূজামণ্ডপে হামলার পাশাপাশি বাঁশখালীর ১৫টি মন্দিরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। এর মধ্যে একটি মন্দিরে প্রতিমা এবং ১৪টি মন্দিরের তোরণ ভাঙচুর করা হয়। সংঘর্ষে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ৩০ থেকে ৩৫ জন আহত হন।
ওই ঘটনায় পুলিশ তিনটি মামলা করে। মামলাগুলোতে এজাহারনামীয় ৬২ জনসহ বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় ২১ জনকে।
এমন প্রেক্ষাপটে এবার দুর্গাপূজায় যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে বলে জানান জেলা প্রশাসক। উৎসবের আনন্দ যাতে কেউ বিঘ্নিত করতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা-ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে প্রায় পাঁচ হাজার পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি, আনসার ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
মহাসপ্তমীতে বাঁশখালীর চারটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক। এগুলো হলো পশ্চিম চাম্বল বাংলাবাজার সর্বজনীন বুড়া কালী মন্দির, শ্রীশ্রী অদ্বৈতানন্দ ঋষিমঠ ও মিশন সর্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপ, সাধনপুর পল্লীমঙ্গল সমিতি মণ্ডপ এবং বাণীগ্রাম জগন্নাথধাম সর্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপ।
পরিদর্শনকালে তিনি মণ্ডপগুলোর সাজসজ্জা ও আয়োজনের প্রশংসা করেন। নারী পুণ্যার্থীদের মধ্যে শাড়ি বিতরণের পাশাপাশি দুটি মণ্ডপে বিশেষ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক জানান, এবার চট্টগ্রামে প্রায় ৪০০টি পূজামণ্ডপ বেড়েছে। জেলায় প্রায় ২ হাজার ৫৯৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তা ও জিআর চালের বরাদ্দও বাড়ানো হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপের খোঁজখবর রাখতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
জেলা আনসার ও ভিডিপি কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন জানান, মণ্ডপের সংখ্যা বাড়ায় আনসার ও ভিডিপি সদস্যের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। প্রান্তিক এলাকার মণ্ডপগুলোতে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন তারা। উৎসব শেষ হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বহাল থাকবে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হিসেবে তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, আমাদের হয়তো অনেক সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের এই যে বন্ধন, এটি অনেক দৃঢ়, অনেক শক্তিশালী।
প্রধানমন্ত্রীর ‘রেইনবো নেশন’ ধারণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় রীতিনীতি রয়েছে। এসব স্বকীয়তা বজায় রেখেই সবাইকে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী দুর্গাপূজার আনন্দ ভাগাভাগি করতে চট্টগ্রাম সফরে আসবেন বলেও জানান তিনি।
পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) পাঠান মো. সাইদুজ্জামান, জেলা আনসার ও ভিডিপি কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন, বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তামজীদুর রহমান তন্ময় এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা।
জেআই
