গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হলগুলোর অস্তিত্ব ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। এবার বন্ধ হওয়ার পথে জেলার পরিচিত প্রেক্ষাগৃহ ‘উল্কা’। নিয়মিত লোকসান, দর্শকসংকট ও বাড়তি পরিচালনা ব্যয়ের চাপে আগামী নভেম্বর থেকে হলটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে গাজীপুরের সাধারণ দর্শকদের জন্য বড় পর্দায় সিনেমা দেখার সুযোগ আরও কমে আসবে।
উল্কা সিনেমা হলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিক উদ্দিন গণমাধ্যমে জানান, বর্তমানে হল চালিয়ে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। দর্শক উপস্থিতি কম থাকায় প্রতিটি শোতেই লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে হলটি চালু রাখা আর সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
রফিক উদ্দিন বলেন, 'ভালো গল্পের সিনেমা এবং পরিচিত নায়ক-নায়িকা থাকলে দর্শক হলে আসেন। সর্বশেষ শাকিব খানের সিনেমা এবং আরিফিন শুভ ও মিম অভিনীত ‘মালিক’ প্রদর্শন করে ভালো ব্যবসা হয়েছিল। কিন্তু এরপর থেকে আর আশানুরূপ আয় হচ্ছে না। তাঁর ভাষ্য, শুধু দুই ঈদে সিনেমা চালিয়ে একটি হলের পরিচালনা ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়।'
তিনি আরও জানান, একদিকে নিয়মিত লোকসান, অন্যদিকে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এভাবে আর কত দিন লোকসান দিয়ে হল চালানো সম্ভব, সেই প্রশ্ন থেকেই আগামী নভেম্বর থেকে প্রেক্ষাগৃহটি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হল কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে দর্শকসংখ্যা এতটাই কম যে অল্প কয়েকজন দর্শক নিয়ে শো চালাতে হচ্ছে। অথচ কর্মীদের বেতন, দৈনন্দিন পরিচালনা ব্যয় ও মাসিক বিদ্যুৎ বিল নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়। মুক্তি পাওয়া অধিকাংশ সিনেমা দর্শক টানতে ব্যর্থ হওয়ায় আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ফলে আর্থিকভাবে হলটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে উল্কা সিনেমা হলে প্রদর্শিত হচ্ছে কামরুজ্জামান পরিচালিত ‘স্নেহের বন্ধন’। গত শুক্রবার ১৪টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে জয় চৌধুরী ও মৌ খান অভিনীত সিনেমাটি। মুক্তির আগে ছাদখোলা বাসে রাজধানীজুড়ে প্রচারণা চালানো হলেও সেই আয়োজন দর্শক উপস্থিতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। সিঙ্গেল স্ক্রিনের পাশাপাশি মাল্টিপ্লেক্সেও সিনেমাটির প্রদর্শনীতে দর্শক উপস্থিতি আশানুরূপ নয়। উল্কা সিনেমা হলেও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
একসময় শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের শ্রমজীবী মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল সিনেমা হল। স্বল্প খরচে বড় পর্দায় সিনেমা দেখার জন্য এসব প্রেক্ষাগৃহে ভিড় করতেন দর্শক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে বিনোদনের মাধ্যম, বেড়েছে প্রযুক্তিনির্ভর বিকল্প। পাশাপাশি মানসম্মত সিনেমার অভাব ও দর্শকসংকটের কারণে একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে জেলার প্রেক্ষাগৃহ।
দেড় বছর আগেও গাজীপুরে প্রায় চারটি সিনেমা হল চালু ছিল। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল উল্কা। এর আগে কাপাসিয়ার একমাত্র প্রেক্ষাগৃহ ‘মনোরম’ বন্ধ হয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে রেস্তোরাঁ। এবার উল্কাও বন্ধ হয়ে গেলে জেলায় চালু থাকবে মাত্র দুটি সিনেমা হল—‘বর্ষা’ ও ‘ঝুমুর’। এতে গাজীপুরের দর্শকদের জন্য নিয়মিত সিনেমা দেখার সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহগুলো টিকিয়ে রাখার সংকটও নতুন করে সামনে আসবে।
