অপসারণ দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন --বিরোধীদল
ভারতের দিল্লীতে বিরোধী দলগুলোর পদযাত্রা সুপ্রিম কোর্টের সামনে আটকে দেয় পুলিশ। গতকাল সোমবার বিকেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে সর্বোচ্চ আদালত অভিমুখে পদযাত্রাটি শুরু হয়।
- কলকাতার রাজপথে মমতা
- দিল্লীতে পদযাত্রা
ভারতের দিল্লীতে বিরোধী দলগুলোর পদযাত্রা সুপ্রিম কোর্টের সামনে আটকে দেয় পুলিশ। গতকাল সোমবার বিকেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে সর্বোচ্চ আদালত অভিমুখে পদযাত্রাটি শুরু হয়। নেতৃত্ব দেন কংগ্রেস ও লোকসভায় বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পদযাত্রার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাহুল। তিনি বলেন, ‘এখানে আলাদা কোনো আন্দোলন হচ্ছে না। সিইসির অপসারণ দাবিতে এটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। এরপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পালা। আমাদের থামানো যাবে না।’রাহুলের অভিযোগ, নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের চাপে পড়ে সিইসি ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় অনিয়ম করেছেন। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এনে সুপ্রিম কোর্টে সিইসির বিরুদ্ধে পিটিশনও দায়ের করেছেন বিরোধীরা। এতে স্বাক্ষর করেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) সৌগত রায়, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব ও রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী প্রসাদ যাদব। রাহুল, অখিলেশ যাদবের পাশাপাশি পদযাত্রায় কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরা উপস্থিত ছিলেন। এটি প্রায় ২ কিলোমিটার অগ্রসর হওয়ার পর ভগবান দাস রোডে আটকে দেয় পুলিশ। এলাকাটি সুপ্রিম কোর্ট থেকে মাত্র ৬০০ মিটার দূরে। হিন্দুস্থান টাইমস ও আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের বাধা পাওয়ার পর বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ সামনে এগিয়ে যায়। ইন্ডিয়া টুডের সরাসরি সম্প্রচারে এলাকাটিতে হাজারো মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে। এ সময় একটি ট্রাকের ওপর রাহুল গান্ধীসহ অন্য নেতারা দাঁড়িয়ে ছিলেন।সিইসির পদত্যাগ দাবিতে গত শনিবার বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নেতাকর্মীদের যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়ার কর্মসূচি ছিল। সেদিন দিল্লীজুড়ে কয়েক হাজার মানুষকে আটক করে পুলিশ। এর একদিন পর কংগ্রেসের নেতৃত্বে পদযাত্রার আয়োজন করা হলো। তরুণদের প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টিও (সিজেপি) শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশের জন্য পুলিশের কাছে তারিখ চেয়ে আবেদন করেছে। এ সময় দিল্লী পুলিশ যন্ত্রর মন্তরের পরিবর্তে তিনটি স্থান নির্ধারণ করে দেয়। সেগুলো হলো- রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান ও পূর্ব দিল্লীর সিবিডি ময়দান। এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, আল জাজিরা, এএফপি।
আটক অবস্থা থেকে মুক্তির পর রোববার দিল্লীতে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন সিজেপির নেতারা। দিল্লীতে নজিরবিহীন কড়াকড়ি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করেন তারা। নেতারা বলেন, পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধাবস্থার’ দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের লজ্জা হওয়া উচিত।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় সিজেপি।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুরো রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল সোমবার দিল্লীর প্রাণকেন্দ্রে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী জমায়েত হন। বিরোধীদের জোট ‘ইন্ডিয়া’-র ব্যানারে আয়োজিত ‘চলো দিল্লী-মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি’ শীর্ষক এই কর্মসূচিতে বিরোধী নেতারা ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে এক প্রতিবাদ পদযাত্রায় অংশ নেন।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুরো রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কনট প্লেস ও মান্ডি হাউসের মধ্যবর্তী সড়কে সাধারণ মানুষ ও প্রতিবাদকারীদের ঢল নামে। বিরোধীরা জানিয়েছেন, তারা ইতিমধ্যে ভারতের প্রধান বিচারপতির (সিজেআই) সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং সোমবার সুপ্রিম কোর্টে একটি আনুষ্ঠানিক পিটিশন জমা দেন।
কংগ্রেস সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী স্পষ্ট জানান, নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন, সংবিধান সুরক্ষা এবং নির্বাচনি ব্যবস্থার সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, পদত্যাগ করুন, অপরাধ স্বীকার করে অ্যাপ্রুভার (রাজসাক্ষী) হন; আপনি ভুল করেছেন, তবে এই ভুলের পেছনের মূল মগজ আপনি নন।
তিনি আরও দাবি করেন যে, এসব অভিযোগের কারণে জ্ঞানেশ কুমার চরম চাপের মধ্যে রয়েছেন। রাহুল গান্ধী বলেন, আমরা জানি জ্ঞানেশ কুমার রাতে ঘুমাতে পারছেন না; আমি তাকে সরাসরি বলছি, আপনি সিইসি হিসেবে টিকে থাকতে পারবেন না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় রাহুল বলেন, এটি কোনও রাজনৈতিক দলের স্বার্থের লড়াই নয়, বরং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই। তিনি উল্লেখ করেন, আমরা প্রধান বিচারপতিকে চিঠি লিখেছিলাম। তিনি আমাদের পিটিশন দায়ের করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন ‘ভোট চুরি’র বিরুদ্ধে ইন্ডিয়া জোটের নেতারা সুপ্রিম কোর্টে পদযাত্রা করবেন এবং পিটিশন জমা দেবেন।
দিল্লীর পর কলকাতার রাজপথে মমতা
দিল্লীর পর এবার কলকাতার রাজপথে কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামছে তৃণমূল কংগ্রেস। গত মঙ্গলবার দেবীপক্ষের তৃতীয়ায় দুপুর ২টায় রাজাবাজার থেকে পার্ক সার্কাস পর্যন্ত প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দিয়েছে দলটি।
এতে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অংশ নিতে পারেন বলে জানিয়েছেন দলের এক নেতা। তবে মিছিলের অনুমতি ও মমতার উপস্থিতি—কোনোটিই এখনো চূড়ান্ত নয়।
তৃণমূলের প্রকাশিত প্রচারপত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ ও গ্রেপ্তারের দাবি এবং দিল্লীতে বিরোধী নেতাদের আটকের প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। বিরোধীদের রাজনৈতিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিসর রক্ষার লক্ষ্যেই এই কর্মসূচি বলে দাবি দলটির।
সম্প্রতি দিল্লীতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলোর প্রতিবাদ জোরালো হয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করেন আন্দোলনকারীরা। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্য স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এর আগে ওই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার কথাও বলেছিলেন তিনি। দিল্লীতে বিরোধী নেতাদের আটকের পর কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তৃণমূলের প্রতিবাদ আরও জোরালো হয়েছে।
তবে মঙ্গলবারের কলকাতার কর্মসূচিতে মমতা থাকবেন কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। দিল্লীর কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর তার কলকাতায় ফেরার সময়সূচি ও পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর বিষয়টি নির্ভর করছে।
তৃণমূলের সাবেক রাজ্যসভার সদস্য শুভাশিস চক্রবর্তী জানিয়েছেন, পুলিশ মিছিলের অনুমতি দেবে কি না, তা তারা জানেন না। তবে প্রতিবাদ মিছিল হবেই এবং দলনেত্রী তাতে অংশ নেবেন বলে দাবি করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, তৃণমূলের কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ উত্তর কলকাতা জেলা বিজেপির সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষ। তার বক্তব্য, তৃণমূল এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। দলটির কর্মসূচি নিয়ে সাধারণ মানুষেরও আগ্রহ নেই।
দুর্গাপূজার আগে কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় মানুষের ভিড় বাড়ছে। রাজাবাজার, সিআইটি রোড ও পার্ক সার্কাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মিছিল হলে যান চলাচলে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় পুলিশ অনুমতি দিলে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
দিল্লীতে নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলনের পর কলকাতার এই কর্মসূচি তৃণমূলের রাজনৈতিক অবস্থানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত মিছিল কতটা জমায়েত করতে পারে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাতে যোগ দেন কি না এবং পুলিশ কী সিদ্ধান্ত নেয়—এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
