- আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ
- বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষ বেড়েছে ৮০ লাখ
- প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে
- গত অর্থবছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে যুক্ত হয়েছে
দারিদ্র্য বিমোচন মানে শুধু অর্থনৈতিক মুক্তি নয়, বরং মানুষের মর্যাদা, আত্মনির্ভরতা ও সম্ভাবনার বিকাশ। ড্যারন অ্যাসেমোগলু ও জেমস রবিনসন তাঁদের ‘হোয়াই ন্যাশনস ফেইল’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, যে রাষ্ট্রে ক্ষমতা কোনো জবাবদিহির আওতায় থাকে না, সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো মুষ্টিমেয় মানুষের স্বার্থে কাজ করে এবং উন্নয়নের সুফল জনগণের কাছে না পৌঁছে ওপরের স্তরে জমা হয়। বাংলাদেশে সেই তত্ত্বই নির্মমভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদন বলছে, গত চার বছরে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষ বেড়েছে ৮০ লাখ। দেশে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর দারিদ্র্য ও সমতা পরিস্থিতি বিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক শ্লথগতি, দুর্বল শ্রমবাজার ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের পরিবারগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়েছে। সংস্থাটির প্রাক্কলন বলছে, গত অর্থবছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে যুক্ত হয়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অক্সফোর্ড পোভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের প্রকাশিত বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ বহুমাত্রিক দরিদ্র। আরো ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ এ ধরনের দারিদ্র্যে পতিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ আয়ভিত্তিক দারিদ্র্যের হিসাবের বাইরেও বড় একটি জনগোষ্ঠীর জীবনমান অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
আজ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘ দিবসটি ঘোষণা করে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য নিরাপদ আবাসন’। মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের ভিত্তি হিসেবে পর্যাপ্ত আবাসনের গুরুত্ব তুলে ধরেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ২৮০ কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অপর্যাপ্ত আবাসন সংকটে রয়েছে। এ সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হচ্ছে আগে থেকেই দারিদ্র্য ও সামাজিক বঞ্চনার শিকার মানুষদের।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে দারিদ্র্য বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে। কভিড-পরবর্তী সময়ে নতুন করে ৮০ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। এর মধ্যে গত এক বছরেই দরিদ্র হয়েছে ২১ লাখ মানুষ।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি সিলেটে। জেলাভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ হার বান্দরবানে, ৬৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে কক্সবাজারে ৪৭ দশমিক ৭০, সুনামগঞ্জে ৪৭ দশমিক ৩৬, রাঙ্গামাটিতে ৪৫ দশমিক ৮৯ ও ভোলায় ৪৫ দশমিক ১২ শতাংশ। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, দেশের সব অঞ্চলে দারিদ্র্যের চাপ সমান নয়। বিশেষত পাহাড়ি, চরাঞ্চল ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষ বহুমাত্রিক বঞ্চনার শিকার হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
অমর্ত্য সেন তাঁর ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহি দারিদ্র্যবিরোধী লড়াইয়ের অপরিহার্য শর্ত। কারণ, যে সরকারকে জনগণের ভোটের কাছে জবাব দিতে হয় না, তার কানে ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ পৌঁছায় না। যে শাসক নিজের সন্তানদের বুকে গুলি চালাতে দ্বিধা করে না, তার কাছে দারিদ্র্য বিমোচনের আশা করা বৃথা।
বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট, মজুরি না বাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসা মানুষের আবার সেই দুষ্টচক্রে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতে, কাঠামোগত সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে এ সংকট আরো গভীর হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়ার অন্যতম কারণ যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্য, জ্বালানি ও সারের সরবরাহ এবং দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের কারণে একদিকে ধ্বংস হচ্ছে অবকাঠামো, অন্যদিকে বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন লাখো মানুষ। কর্মসংস্থান হারিয়ে বহু পরিবার নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে মানবিক সহায়তার ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছানো না গেলে দারিদ্র্য বিমোচনের অগ্রগতি টেকসই হবে না।
