আঙ্কারা,২৫ অক্টোবর- তুরস্কে সাংবাদিকদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ, গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া এবং সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে রাজধানী আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলে বিক্ষোভ করেছেন হাজারো মানুষ। শনিবার (২৪ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত এসব কর্মসূচিতে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
ইস্তাম্বুলের এশীয় অংশে বিক্ষোভকারীরা কারাবন্দি সাংবাদিকদের ছবি হাতে নিয়ে মিছিল করেন। এ সময় তাঁরা ‘আমাদের কণ্ঠরোধ করা যাবে না, অনেক হয়েছে’ এবং ‘চাপের কাছে আমরা মাথা নত করব না’—এমন নানা স্লোগান দেন।
২০১৬ সালে তুরস্কে একটি ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান হয়। এরপর থেকেই দেশটিতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্রমেই সংকুচিত হতে থাকে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে মামলা করা হয়। পাশাপাশি অনলাইনে তথ্য ও মতপ্রকাশের ওপরও সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ আরও বেড়েছে। তুরস্কের সাংবাদিক ইউনিয়ন জানিয়েছে, গত দুই মাসে ১১ জন সাংবাদিককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ইস্তাম্বুলের বিক্ষোভে অন্তত তিন হাজার মানুষ অংশ নেন। আঙ্কারাতেও অন্তত তিন হাজার বিক্ষোভকারী জড়ো হন।
দুই মাসে ১১ সাংবাদিক কারাগারে:
তুরস্কের সাংবাদিক ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে দেশটিতে ১১ জন সাংবাদিককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম।
চলতি মাসের শুরুতে তুরস্কের সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় সংবাদ চ্যানেল ‘হাল্ক টিভি’তে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় চ্যানেলটির সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সেখানে সরকার নিযুক্ত প্রশাসক বসানো হয়। অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও তাঁর সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে নেওয়া ধারাবাহিক পদক্ষেপের সর্বশেষ ঘটনা এটি।
এর আগে দেশটির জনপ্রিয় ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ‘টি২৪’-এর ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ এর কারণ হিসেবে ‘এলজিবিটি প্রচারণার’ কথা উল্লেখ করে।
‘সমাজকে ভয় দেখাতে চায় সরকার’
ইস্তাম্বুলের বিক্ষোভ শেষে প্রবীণ সাংবাদিক জাফের আরাপকারলি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, এই সমাবেশ শুধু সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নয়। সাংবাদিক ও স্বাধীন গণমাধ্যমের মাধ্যমে তথ্য ও সংবাদ পাওয়ার যে অধিকার সমাজের রয়েছে, সেটি রক্ষার আন্দোলনও এটি।
দৈনিক ‘বিরগুন’-এর এই কলাম লেখক নিজেও কয়েকটি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁর মতে, গণমাধ্যমের ওপর চাপ যত বাড়বে, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও দৃঢ়তাও তত বাড়াতে হবে।
আরাপকারলি বলেন, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, সংবাদ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে শাসকগোষ্ঠী সমাজকে ভয় দেখাতে, নীরব করতে ও আতঙ্কিত করতে চায়। তিনি বলেন, এমনটা হতে দেওয়া হবে না। এত দিনও তাঁরা এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। এখন আরও বড় পরিসরে সেই দৃঢ়তা দেখানোর সময় এসেছে বলে তিনি মনে করেন।
তুরস্কের সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি গোকহান দুরমুশ বলেন, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক বিধিনিষেধ, প্রবেশাধিকারে বাধা এবং প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি দর্শকপ্রিয় টেলিভিশন, সংবাদ চ্যানেল ও গণমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যেখানে সবকিছু একরকম হয়ে যাবে—একটি কণ্ঠস্বর, সংবাদের একটি উৎস এবং কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত একটি ব্যবস্থা।
‘আমাদের কাজ করতে দিন’
আঙ্কারার বিক্ষোভকারীরা সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে এবং কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তির দাবিতে স্লোগান দেন।
বন্ধ করে দেওয়া সংবাদমাধ্যম টি২৪-এর সাংবাদিক গোকচের তাহিনচিওগলু এএফপিকে বলেন, সাংবাদিকদের একত্র হয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার পাশাপাশি নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার অধিকার রক্ষার জন্যও এই বিক্ষোভ গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, সাংবাদিকেরা একটি বার্তা দিতে চান—তাঁরা সাংবাদিকতা করতে চান এবং স্বাধীনভাবে সেই কাজ করার সুযোগ চান।
তুরস্কের সরকার বারবার দাবি করেছে, সাংবাদিকতার কাজ করার কারণে কোনো সাংবাদিককে গ্রেপ্তার বা কারাবন্দি করা হয় না।
আঙ্কারার সমাবেশে কারাবন্দি দৈনিক ‘বিরগুন’-এর সাংবাদিক ইসমাইল আরির লেখা একটি চিঠি পড়ে শোনানো হয়। আঙ্কারার উপকণ্ঠে সিনকান কারাগার থেকে পাঠানো চিঠিতে তিনি লেখেন, সাংবাদিক হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করা ছাড়া অন্য কোনো কারণে তাঁকে কারাগারে রাখা হয়নি। এতে তাঁর জীবনের মূল্যবান দিনগুলো কেড়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
চিঠিতে আরি বলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁরা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রক্ষা করবেন। কর্তৃপক্ষকে সাংবাদিকদের কাজে হস্তক্ষেপ বন্ধ করে সংবিধান মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
চলতি মাসে আরিকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাত মাসের মধ্যে এটি ছিল তাঁর দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তারের ঘটনা। সরকারি কর্মকর্তাকে অপমান এবং জনসমক্ষে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তুরস্কের সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান এবুবেকির শাহিনের করা অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এস এম/ ২৫ অক্টোবর ২০২৬
