আসন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনকে (কপ-৩১) সামনে রেখে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে চরম ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবিতে সাতক্ষীরায় এক বর্ণাঢ্য জলবায়ু পদযাত্রা ও গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বারসিক’ (BARCIK) এবং ‘শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্য রক্ষা টিম’-এর যৌথ উদ্যোগে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
সকালে সাতক্ষীরা শহরের ঐতিহাসিক পোস্ট অফিস মোড় থেকে এক বর্ণাঢ্য জলবায়ু পদযাত্রা শুরু হয়। ব্যানার, ফেস্টুন ও নানা সচেতনতামূলক স্লোগানসহ পদযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় পোস্ট অফিস মোড়ে এসে এক সংক্ষিপ্ত গণসমাবেশে মিলিত হয়। পদযাত্রায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পরিবেশকর্মী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংস্থার নেতৃবৃন্দসহ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সর্বস্তরের উপকূলীয় বাসিন্দারা অংশ নেন।
জলবায়ু পরিবর্তন মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে গ্রীন কোয়ালিশনের সভাপতি ও বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবু আফফান রোজ বাবু বলেন,বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু বিপর্যয়ে যাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, তাদের অনিয়ন্ত্রিত কার্বন নিঃসরণের কারণেই আজ আমাদের উপকূলের প্রান্তিক মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। এটি কেবল কোনো পরিবেশগত সমস্যা নয়—এটি সরাসরি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান শিকার হিসেবে বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি জোরালোভাবে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে হবে।
সমাবেশে বক্তারা চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাবে প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় তীব্র সংকট তৈরি করেছে। বছরের পর বছর ধরে এখানকার মানুষকে রিমাল, সিডর, আইলা, আম্পানের মতো ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, তীব্র নদীভাঙন এবং আশঙ্কাজনক মাত্রায় লবণাক্ততা বৃদ্ধির সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হচ্ছে।
তারা আরও উল্লেখ করেন, মিষ্টি পানির উৎসে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে কেবল বসতভিটা ও কৃষিজমি ধ্বংস হচ্ছে না; বরং গোটা অঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র হাহাকার তৈরি হয়েছে। সুপেয় পানির অভাব ও কৃষিকাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য শহরে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হচ্ছেন। জীবিকার চরম সংকটে পড়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয়রা, যা পুরো অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বক্তারা জোর দাবি জানিয়ে বলেন, আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনে বৈশ্বিক 'জলবায়ু ন্যায্যতা' (Climate Justice) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রধানত দায়ী উন্নত ও ধনী দেশগুলোকে তাদের ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন (Climate Finance) সহজলভ্য করতে হবে। এছাড়া ‘লসের অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ (ক্ষয়ক্ষতি তহবিল) থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে সরাসরি সাহায্য পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা আবশ্যক।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, অধ্যক্ষ আশেক-ই-এলাহী, সাধারণ সম্পাদক, সাতক্ষীরা জলবায়ু পরিষদ, মাধব চন্দ্র দত্ত, উপদেষ্টা, গ্রীন কোয়ালিশন ও মানবাধিকারকর্মী, শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন, সদস্যসচিব, জেলা ক্লাইমেট জাস্টিস ফোরাম ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, শেখ সিদ্দিকুর রহমান, সভাপতি, জেলা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, মো. মফিজুর রহমান, সভাপতি, সদর উপজেলা পানি কমিটিআব্দুস সামাদ, স্থানীয় ভূমিহীন নেতা গাজী মাহিদা মিজান, প্রোগ্রাম অফিসার, বারসিক জাহাঙ্গীর আলম, যুব সংগঠক জ্যোতি সরকার, সদস্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্য রক্ষা টিম।
সমাবেশ শেষে বক্তারা বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, উপকূলীয় অঞ্চলে অনতিবিলম্বে স্থায়ী ও টেকসই টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, লবণাক্ততামুক্ত সুপেয় পানির সুব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিকল্প জীবিকার সংস্থান করতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো আহ্বান জানান।
