বাংলা ভাষার ইতিহাস কেবল একটি ভাষার বিবর্তনের ইতিহাস নয়; এটি একটি জাতির চিন্তা-চেতনা, সংস্কৃতি ও অনুভূতির দীর্ঘ অভিযাত্রার এক চিরায়ত দলিল।
এই অভিযাত্রায় সাধু ভাষা একসময় ছিল বাংলা গদ্য ও সাহিত্যের প্রধান বাহন। বাংলা সাহিত্য, বিশেষত ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের প্রথমার্ধে সাধু ভাষা তার নিজস্ব সৌকর্য ও গাম্ভীর্য নিয়েই বিকশিত হয়েছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস, বঙ্কিম রচনাবলি কিংবা রবীন্দ্রনাথের গদ্যের এক বৃহৎ অংশ সাধু ভাষাতেই রচিত হয়েছিল, যা আজও পাঠকের কাছে নান্দনিক, সুখপাঠ্য ও অনন্য মর্যাদাসম্পন্ন বলে বিবেচিত হয়ে আসছে।
একসময় সংবাদপত্রের ভাষাও ছিল সাধু ভাষানির্ভর। বিশেষ করে দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই খবর ও সম্পাদকীয় উভয় ক্ষেত্রেই সাধু ভাষার সুসংহত ব্যবহার করে আসছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্রে ব্যবহৃত ভাষা বদলে গিয়ে তা আজ সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষারীতির কাছাকাছি চলে এসেছে। ইত্তেফাকও বদল করেছে তার ভাষার ব্যবহাররীতি। তবে ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে আজও এই ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় কলামে সাধু ভাষার অনুপম ও দৃঢ় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ইত্তেফাক পত্রিকার এই প্রয়াস কেবল ভাষা ব্যবহারের একটি রীতি নয়; বরং এটি একটি ঐতিহাসিক ধারার সচেতন সংরক্ষণ করাও বোঝায়। অবশ্য আরও দুয়েকটি পত্রিকার সম্পাদকীয়তেও সাধু ভাষার গতিময় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
বাংলাদেশের অফিস-আদালতেও একসময় সাধু ভাষার ব্যাপক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার লক্ষ্য করা যেত। এ দেশে এমন একটা সময় ছিল যখন আদালতের নথিপত্র, অভিযোগপত্র, মামলা-মোকদ্দমার রায়, জমির দলিল ও অন্যান্য আইনানুগ লেখালেখির যেসব ক্ষেত্রে বাংলা ব্যবহার করা হতো, সেসব ক্ষেত্রে সাধু ভাষাই ছিল প্রধান ও প্রমিত মাধ্যম। যদিও তখন ইংরেজি ভাষার ব্যবহার হতো ব্যাপক। তখনকার সময় সাহিত্য রচনা, চিঠিপত্র তৈরি, অফিস-আদালত, পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞপ্তি, সব ক্ষেত্রেই সাধু ভাষা ছিল শিক্ষিত সমাজের স্বীকৃত ভাষারূপ। যদিও এখনো বহু বিজ্ঞপ্তিতে, বহু আবেদনপত্রে সাধু ভাষার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
একসময় আমাদের ভাষার ব্যবহারনীতি ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় পরিবর্তন আসে। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত হয় ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইন। এই আইনের ফলে সরকারি কাজে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও বাস্তবে দেখা যায় যে, বহু নথিতে সাধু ও চলিত ভাষার এক ধরনের মিশ্রণ গড়ে ওঠে। এতে একদিকে ঐতিহ্যগত রীতির ছাপ রয়ে যায়; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের মিশ্রিত ভাষা বিভ্রান্তিকর ও দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে, যা নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনাও রয়েছে ব্যাপক। বর্তমানে সরকারি দপ্তরে চলিত ভাষাই প্রধানত ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সাধু ভাষা কার্যত প্রান্তিক অবস্থানে চলে গেছে। তবে পুরোনো নথিপত্রে, কোর্ট-কাছারির নোটিসে, কিছু আইনি পরিভাষায় এবং নির্দিষ্ট কাঠামোগত বাক্যে আজও সাধু ভাষার চিহ্ন পাওয়া যায়। এ বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, সাধু ভাষা হঠাৎ বিলুপ্ত হয়নি; বরং সময়ের চাপে ধীরে ধীরে তার ব্যবহারিক ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে মাত্র।
একসময় কেবল সাহিত্য বা সংবাদপত্রেই নয়, সরকারি অফিসের পত্রযোগাযোগেও সাধু ভাষার ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যেত। সরকারি প্রজ্ঞাপন, আদেশ, নোটিস, দাপ্তরিক চিঠি এমনকি আদালত-সংশ্লিষ্ট নথিতেও সাধু ভাষার প্রমিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রয়োগ ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। এই ভাষার কাঠামোগত দৃঢ়তা ও আনুষ্ঠানিক ভঙ্গি রাষ্ট্রীয় যোগাযোগে এক ধরনের গাম্ভীর্য ও কর্তৃত্ববোধ সৃষ্টি করত। পরবর্তীকালে প্রশাসনিক সংস্কার, সময়ের দাবি এবং সাধারণ নাগরিকদের বোধগম্যতার কথা বিবেচনায় এনে দাপ্তরিক ভাষা ক্রমান্বয়ে চলিত রীতির দিকে সরে আসে। ফলে সরকারি ব্যবস্থাপনা থেকেও সাধু ভাষা প্রায় সম্পূর্ণরূপে অপসৃত হয়েছে, যা এর ব্যবহারিক ক্ষেত্র আরও সংকুচিত করেছে। তাই প্রাসঙ্গিকভাবেই প্রশ্ন থেকে যায়, এই সাধু ভাষা কি আজ বিলুপ্তির পথে?
বাস্তবতা হলো, দৈনন্দিন ব্যবহার, শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল যোগাযোগে সাধু ভাষার প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। আজকাল পাঠ্যপুস্তক, সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ প্রায় সবখানেই চলিত ভাষা আধিপত্য বিস্তার করেছে। সহজবোধ্যতা ও দ্রুত যোগাযোগের প্রয়োজন ভাষাকে করেছে সংক্ষিপ্ত, সরল ও কথ্যধর্মী। এর ফলে সাধু ভাষা ক্রমশ পাঠক ও ব্যবহারকারীর বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
কিন্তু এর অর্থ কি এই যে, সাধু ভাষার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে? মোটেই তা নয়। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি রুচি, শৈলী ও বোধেরও প্রকাশ। সাধু ভাষার একটি স্বতন্ত্র সৌন্দর্য, শালীনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক গাম্ভীর্যতা রয়েছে, যা চলিত ভাষা সব সময় বহন করতে পারে না। বিশেষত প্রবন্ধ, সম্পাদকীয়, দার্শনভিত্তিক আলোচনা কিংবা সাহিত্যধর্মী রচনায় সাধু ভাষা আজও তার উপযোগিতা প্রমাণ করতে সক্ষম।
সমস্যা মূলত ভাষার কার্যকর ব্যবহারের অভাব ও প্রজন্মগত বিচ্ছিন্নতা। নতুন প্রজন্মের বেশিরভাগ সাধু ভাষায় অভ্যস্ত নন, ফলে তারা একে কঠিন বা অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে করতে পারেন। অথচ পরিকল্পিতভাবে সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও উচ্চশিক্ষায় সীমিত পরিসরে হলেও সাধু ভাষার চর্চা অব্যাহত রাখা গেলে এটি কেবল টিকে থাকবে না, বরং ভাষার ঐতিহ্যগত বৈচিত্র্যও রক্ষা পাবে।
এ দিক থেকে বলা যায়, সাধু ভাষা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হওয়ার পথে নয়; তবে তা সংকুচিত পরিসরে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন সচেতন প্রয়াস, প্রকাশনা, শিক্ষাব্যবস্থা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহার। ভাষার ইতিহাসে সাধু ভাষা একটি অধ্যায় মাত্র নয়; এটি বাংলা ভাষার আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
লেখক: বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের সাবেক অধ্যক্ষ।
The post অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্যের সাধু ভাষা appeared first on Dhaka Protidin.
