দেশের নাম ভিয়েতনাম: বুদ্ধ দর্শন শেষে ভাসমান নৈশভোজ
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম
অলংকরণ: মেহেদী হাসান
-->পর্ব: বারো
গাড়ি থেকে একে একে টুপটাপ করে নেমে দাঁড়াতেই রাস্তার ওপারে চোখ চলে যায় অনিন্দ্য সুন্দর স্থাপত্যের এক বিশাল বৌদ্ধমন্দিরের দিকে। কেউ কেউ তাড়াহুড়া করে রাস্তা পার হতে গেলে আমাদের ভ্যানগগ অর্থাৎ ট্যুর গাইড ভ্যান বলে ওঠেন, দেখে-শুনে ধীরে-সুস্থে ওপারে গেলেই চলবে। তা না হলে বুদ্ধমূর্তি দর্শনের আগেই স্বয়ং গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। আমি অবশ্য এমনিতেই ধীরে-সুস্থে পার হতে চেয়েছি। তার কারণ এই প্যাগোডার মূল প্রবেশদ্বার। চীনামাটি এবং সিরামিকের রঙিন টুকরো দিয়ে তৈরি মোজাইকের চমৎকার মোটিফে সাজানো কারুকার্যখচিত এই দৃষ্টিনন্দন দরজায় তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন লোকগাথার কাহিনি। এটিই মেকং ডেল্টা অঞ্চলের মি থো শহরের বিখ্যাত ভিন ত্রাং প্যাগোডা।
ভেতরে ঢুকে পড়ার পরে প্রথমেই এই বৌদ্ধ মন্দিরের যে বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে তা হলো এর স্থাপত্যের মিশ্রণ। এখানে এশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও রোমান স্থাপত্য শৈলীর এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। এর সামনের দিকে ফরাসি ধাঁচের তোরণ, ইতালীয় লোহার রেলিং এবং জাপানি সিরামিক টাইলসের ব্যবহার পূর্ব-পশ্চিম স্থাপত্য শিল্পের মিলন ঘটিয়েছে। ছাদ এবং অভ্যন্তরীণ নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ভিয়েতনামি, চীনা ও কম্বোডিয়ান কারুকার্য।
আমরা এর আগে শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন মঠে মন্দিরে, প্যাগোডায় এবং ভারতের অজন্তা ইলোরার গুহায় নানা আকার-আকৃতির ও বিভিন্ন ভঙ্গিমার অসংখ্য বুদ্ধমূর্তি দেখেছি। এখানে ভিন ত্রাং প্যাগোডায় ভগবান তথাগতের দর্শন পেতে খুব বেশি ছোটাছুটি করার দরকার পড়ে না। প্যাগোডার ১৪ হাজার বর্গমিটারজুড়ে বিস্তৃত সুন্দর ও শান্ত প্রাঙ্গণের ভেতরেই বেশ কয়েকটি বিশালাকায় এবং জাঁকজমকপূর্ণ বুদ্ধমূর্তি চোখে পড়ে। এর মধ্যে সবেচেয়ে উল্লেখযোগ্য তিনটি শায়িত বুদ্ধ, হাস্যোজ্জ্বল বুদ্ধ এবং দণ্ডায়মান বুদ্ধ। ভিন ত্রাং চত্বরে প্রবেশ করতেই যিনি স্বাগত জানান, তিনি হাস্যোজ্জ্বল বুদ্ধ। নিতান্ত রামগড়রের ছানা না হলে এই হাসি হাসি আদুরে মুখের দিকে তাকিয়ে কেউ না হেসেই পারবেন না। সমস্বরে হেসে উঠলে যদি ধর্ম অবমাননা হয়, সেই আতঙ্কে আমরা হাসি হাসি মুখ করে নীরবে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি। সাদা পাথরের বিশাল কুড়ি মিটার উঁচু হাস্যোজ্জ্বল মৈত্রেয় বুদ্ধের মূর্তি, সুখ ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
প্যাগোডা প্রাঙ্গণে হাস্যোজ্জ্বল বুদ্ধদেবের পাশেই অত্যাবশ্যকভাবে দাঁড়িয়ে আছেন চব্বিশ মিটার উঁচু অমিতাভ বুদ্ধ। লাল রঙের শান্ত সমাহিত অমিতাভকে দেখে তেমন কোনো ভাবের উদয় না হলেও আরও খানিকটা ভেতরে শায়িত বুদ্ধ যে ভাবগম্ভীর প্রশান্তি ছড়িয়ে দেন তা অতুলনীয়। রিক্লাইনিং বুদ্ধা বত্রিশ মিটার দীর্ঘ এবং দশ মিটার উঁচু শায়িত বুদ্ধের মূর্তি। ২০১৩ সালে নির্মিত আড়াই শ টন ওজনের এই বিশাল ভাস্কর্যটি বুদ্ধের মহানির্বাণ লাভ বা পরিনির্বাণের প্রতীক। মূর্তির নিচে ভিয়েতনামি ভাষার লেখাটির বাংলা রূপান্তর করলে দাঁড়ায়: ‘হে প্রভু শাক্যমুণি বুদ্ধ, আপনার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।’ একটি হাত গালের নিচে রেখে প্রশান্তির সঙ্গে গভীর নিদ্রায় মগ্ন শ্বেতশুভ্র সিদ্ধার্থ। তার পায়ের কাছে ফুটে আছে বোগেনভোলিয়ার অজস্র লাল-গোলাপি ফুল। এই শায়িত বুদ্ধের সঙ্গে ছবি তোলার ব্যাপারে সবাই বেশ আগ্রহী। আমাদের বাহরাইনি মুসলমান ভাই-ভাবিও বাদ গেলেন না।
বেলা পড়ে এসেছিল। ভিন ত্রাং প্যাগোডার প্রাঙ্গণটি বনসাই গাছ, চমৎকার পদ্মপুকুর, রঙিন ফুলের বাগান এবং প্রাচীন গাছের ছায়ায় ঘেরা। তার পরও মেকং ডেল্টা এলাকার তাপমাত্রা মাঝে-মাঝেই তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছিল। আমরা বাইরের প্রাঙ্গণে ঘোরাঘুরি শেষ করে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহশালায় ঢুকে পড়ি। জেন কাঠ দিয়ে তৈরি ভেতরের পুরো অংশটিই আশ্চর্য রকমের শীতল। মূল হলঘরের ভেতরে রয়েছে প্রাচীন আঠারোটি আরহাত বা বুদ্ধের শীর্ষ শিষ্যদের মূর্তি এবং প্রায় ষাটটি স্বর্ণমণ্ডিত কাঠের ও ব্রোঞ্জের মূর্তি। ঘরজুড়ে আসাধারণ সূক্ষ্ম কারুকাজ করা সোনালি-রুপালি বেদিতে সুদৃশ্য বুদ্ধমূর্তি শোভা পাচ্ছে। মূল্যবান মণিমানিক্যখচিত এসব ধাতব ভাস্কর্য চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। ধর্মকর্মে মতি না থাকলেও ক্ষতি নেই। শুধু ধর্মীয় অনুভূতির শিল্পরূপ প্রত্যেক দর্শনার্থীকে শিল্পরসে জারিত করবে সন্দেহ নেই।
ভিন ত্রাং থেকে বেরিয়ে হোটেলে ফিরে দেখলাম ব্লু ডায়মন্ডের একনিষ্ঠ রুম সার্ভিস যথারীতি ঘর-দুয়ার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, চেয়ার-টেবিল ঝেড়ে-মুছে, চাদর টান টান করে পেতে, বিছানা-বালিশ সব গুছিয়ে রেখেছে। ইচ্ছে করছিল বিছানায় গড়িয়ে পড়ি। কিন্তু গড়িয়ে পড়লে ঘুমিয়েও পড়তে পারি। অতএব, গড়িমসি করলে চলবে না। রাতের হো চি মিন সিটির সৌন্দর্য নিজের চোখে দেখতে হলে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সাইগন নদীর তীরে পৌঁছাতে হবে।
আমি শুরু থেকেই এটিকে মেকং নদীতে সান্ধ্য ভ্রমণ মনে করেছিলাম। পরে জানলাম ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী মূল হো চি মিন সিটি বা অতীতের সাইগন শহরটি আসলে গড়েই উঠেছে সাইগন নদীর তীরে। অন্যদিকে মেকং নদী আর বিখ্যাত মেকং ডেল্টা অঞ্চলটি শহর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে। আমাদের নির্ধারিত ক্রুজশিপ ইন্দো-চায়না কুইনের অবস্থান হোটেল থেকে বড় জোর মিনিট দশেকের পথ, কাজেই তাড়াহুড়া নেই, তবে সাড়ে ৬টার মধ্যে লবিতে উপস্থিত থাকলে ড্রাইভারই আমাদের রানির কাছে পৌঁছে দেবে। সঙ্গে পথের দিশা ভ্যানগগ নেই, নিজেদের দায়িত্বেই যেতে-আসতে হবে।
আমরা যখন নদীতীরে পৌঁছলাম তখন রৌদ্রকরোজ্জ্বল সারা দিনের ক্লান্তি মুছে দিতে সাইগন থেকে প্রশান্তির শীতল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। নদীতীরের জাহাজে-লঞ্চে এবং ছোট ছোট নৌযানে জ্বলে উঠেছে সন্ধ্যাবাতি। তীরে আলোকমালায় সজ্জিত হয়ে পরপর অনেক জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের গাড়িচালক সম্ভবত ভুল করে সব জাহাজ ছাড়িয়ে শেষপ্রান্তে চলে গিয়েছিল, তার পর ইউটার্ন নিয়ে ধীরে ধীরে ফিরে আসে লাইনের শুরুতে। আমাদের নামিয়ে দেওয়ার পরে নাবিকের সাদা পোশাক পরা জাহাজের গ্রাউন্ড ফোর্সের লোকজনকে মনে হলো আমাদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে। তারা আমাদের দেখে বাজেট ক্রুজের ব্যাকপ্যাকার ট্যুরিস্ট ভেবেছিল কি না জানি না, আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে প্রবেশপত্র দেখতে চাইল। ভাগ্যিস ভ্যানের কাছে থেকে আগেই কার্ড দুটো নিয়ে রেখেছিলাম। কার্ডে চোখ বুলিয়ে সসম্মানে ওপরে ওঠার সিঁড়ি দেখিয়ে দিলেন নৌযানের নিচে দাঁড়ানো নাবিক।
তিন তলায় উঠে দেখা গেল বিশাল হলঘরের একটা বড় অংশ তখনো খালি। একজন সদ্যা হাস্যোজ্জ্বল তরুণী নাবিক আমাদের জন্য নির্ধারিত টেবিলে নিয়ে বসালেন। বিশাল খোলা জানালার পাশে বসে বাইরের আলো ঝলমলে হো চি মিনের একটা বড় অংশ বেশ ভালো চোখে পড়ে। মনে হলো আমরা নেহায়েত ভাগ্যবান বলেই ভেতরের সারিতে বসতে হয়নি। তবে তখনো জানা ছিল না, এদিকের টেবিল পুরোটাই ভেজিটেরিয়ানদের জন্য নির্ধারিত। মঞ্চে প্রস্তুত শিল্পীরা আমাদের আসন গ্রহণের পরপরই আরম্ভ করলেন সংগীত পরিবেশন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো হলঘর কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল। সম্ভবত জাহাজের একটি আসনও খালি ছিল না।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আমাদের ইন্দো-চায়না রানি একটু নড়াচড়া করে ডক থেকে যাত্রা শুরু করল। ভাসমান জাহাজে নদী থেকে হো চি মিন সিটির চোখ ধাঁধানো রাতের স্কাইলাইন, ল্যান্ডমার্ক এইটটি-ওয়ান টাওয়ার, বিটেক্সকো ফিন্যান্সিয়াল টাওয়ার এবং বাচ ড্যাং হোয়ার্ফের আলো ঝলমলে দৃশ্য দেখতে দেখতে, মঞ্চে পরিবেশিত ভিয়েতনামি লোকসংগীত শুনতে শুনতেই টেবিলে একের পর এক নামতে থাকল খাবারের ডিশ! কিন্তু হা হতম্মি! এ যে দেখছি সবই শাকপাতা, বেগুন, মুলা, ঢেঁড়স, গাজর আর সঙ্গে স্টিকি রাইস এবং ঝোলে ডোবানো নুডলস।
রিভার ক্রুজে সাধারণত বাজেট এবং পছন্দ অনুযায়ী বুফে ও সেট মেনু দুই ধরনের খাবারেরই ব্যবস্থা থাকে। এখানে অবশ্য বুফের ব্যবস্থা নেই, তবে ভিয়েতনামি ঐতিহ্যবাহী সি-ফুড থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ও এশিয়ান নানা ধরনের খাবার থাকার কথা! পরিবেশকদের একজনকে ডেকে বলতেই সে কী বুঝল আল্লা মালুম, ভালো ইংরেজি জানা একজনকে ডেকে নিয়ে এল। তিনি বিনয়ের সঙ্গে জানালেন, ‘আপনাদের দুজনের ব্যাপারে বুকিংয়ের সময়ই ভেজিটেরিয়ান বা নিরামিষভোজী উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে। আপনারা চাইলে এখনো বিশেষ ভেগান মেনুর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’ এ তো দেখি ভেজিটেরিয়ান থেকে আরও একধাপ নামিয়ে আমাদের ভেগান বানিয়ে দিতে চায়। তাকে বুঝিয়ে বললাম, ‘সাপ-ব্যাঙ, কুমির কিংবা কুকুরের মতো দুই চারটা জিনিস ছাড়া পৃথিবীর প্রায় কোনো খাদ্যেই আমাদের অরুচি নেই। তবে তোমাদের সমস্যা হলে নতুন করে কোনো ব্যবস্থা করতে হবে না।’
তিনি অবশ্য বললেন, ‘সমস্যা নেই। আমরা এক্ষুণি তোমাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করছি।’ সে আবার নতুন করে কী নিয়ে এসে হাজির হয়, এই ভয়ে বললাম, ‘তোমাদের ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই, শুধু ডিম বা চিকেনের কোনো আইটেম থাকলে পাঠাতে পার।’
শেষ পর্যন্ত আমাদের আগে পরিবেশিত শাকান্নের সঙ্গে মুরগির ডিমের অমলেট এবং সুইট অ্যান্ড সাওয়ার চিকেনের ভিয়েতনামি সংস্করণের সঙ্গে আঠালো ভাতের ডিনার খুব একটা খারাপ হয়নি। ইন্দো-চায়না কুইনের ফিরতি পথের যাত্রায় বাইরের আলোকসজ্জা দেখার ফাঁকে ফাঁকে মঞ্চে ভিয়েতনামের ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্যে চোখ রেখেছিলাম। দুটি ক্রুজ শিপ আমাদের পাশ কাটিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় এবং একটি আমাদের অতিক্রম করে সামনে এগোবার সময় লক্ষ করলাম আলোর কারসাজিতে কোনোটা মাছের মতো আবার কোনোটা ড্রাগনের চেহারা নিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। আমাদের ইন্দো-চায়না রানিরও নিশ্চয়ই একটা বিশেষ রূপ আছে, সেই চেহারা শুধু অদূরে ভেসে বেড়ানো কোনো জাহাজ থেকেই দেখা সম্ভব।
ইন্দো-চায়না কুইন যখন ঘাটে এসে ভিড়ল তখন রাত ১০টা। ঘরে ফেরার সময় হয়ে গেছে আর আমাদের বাহনও নিশ্চয়ই এতক্ষণে জেটিতে এসে গেছে।
চলবে...
আরও পড়ুন
দেশের নাম ভিয়েতনাম: মেকং নদীর বদ্বীপ, ম্যানগ্রোভে মজার খাবার
প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম
অলংকরণ: মেহেদী হাসান
-->পর্ব: এগারো
নারিকেলের মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে বেরিয়ে আমরা যে পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম সেটা একটা ছোট আকারের বাজার বলা যায়। অনেকটা আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে খালপাড়ে গঞ্জের হাটের মতো চেহারা। তবে হইচই কম আর পরিচ্ছন্নতা বেশি। রাস্তার একপাশে টেম্পোর মতো বাহন একসারিতে সাজানো। সবই নতুন ঝকঝকে। টুপি, স্যান্ডেল তেল-সাবান, কোক-ফান্টা এবং রংবেরঙের খেলনায় সাজানো একটা ভ্যানগাড়িকে পাশ কাটিয়ে খানিক দূর এগোবার পরে একটা ঘাটে এসে পৌঁছলাম। এটা তেমন কোনো লঞ্চ বা নৌকার ঘাট নয়। স্বরূপকাঠি, ঝালকাঠি এলাকায় খালপাড়ে যেমন নৌকা ভেড়াবার ব্যবস্থা থাকে তেমনি ঘাটে দাঁড়াতেই একটা ছোট ডিঙি নৌকা এসে ভিড়ল। ছোট্ট নৌকার মাঝ বরারবর চারটি নীলরঙের কাঠের পাটাতন বসানো। এই পাটাতনে বসে খোলের ভেতরে পা রাখেন যাত্রীরা।
প্রথমে মনে হয়েছিল এটি হাতের বৈঠা টানা নিঃশব্দ নৌযান। যাত্রীরা উঠে বসার পরে দেখা গেল এর পুচ্ছেও একটি যন্ত্র বসানো আছে। ইঞ্জিন চালু হলে নৌকা ভটভট শব্দ করে খালের ভেতরে চলতে শুরু করল। তবে যান্ত্রিক হলেও এর শব্দ তুলনামূলকভাবে কম। একটু পরেই মনে হলো আমরা সুন্দরবনে এসে পড়েছি। দুপাশে খালের কিনারা পর্যন্ত বিস্তৃত গোলপাতার সারি। ঘোলা জলের খালপথে গোলপাতার ঘন সারির ভেতর দিয়ে মাঝে মাঝে চোখে পড়ে দু-একটি নারিকেল গাছ এবং কলাগাছের বাগান। গোলপাতা ছাড়াও বড় কিছু গাছ ডাল-পাতাসহ খালের ওপর ঝুঁকে পড়ায় ছায়ায় ছায়ায় রোদের তাপ খুব একটা গায়ে লাগে না। মিনিট দশেক বা তারও একটু কম সময়ে পৌঁছে গেলাম ভিয়েত নাত ইকোলজিক্যাল রেস্টুরেন্টে। ত্রানের ভাষ্য অনুসারে এটি ভিয়েতনামের বেন ত্রে প্রদেশের একটি জনপ্রিয় ইকো-ট্যুরিজম রিসোর্ট ও রেস্তোঁরা। মেকং ডেল্টার প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য এখানে ঐতিহ্যবাহী ভিয়েতনামিজ খাবার পরিবেশন করা হয়ে থাকে।
ভিয়েত নাত যে পরিবেশবান্ধব রেস্তোরাঁ, ত্রান তা না বললেও চোখে দেখেই বোঝা যায়। কংক্রিটের স্লাব বসানো রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতেই চোখে পড়ে চারদিকে সবুজ গাছপালার ছায়ায় বিশাল চত্বরে খানিক দূরে দূরে চালাঘরের নিচে সাজানো রেস্তোঁরা। কাঠের খুঁটি এবং গোলপাতার ছাউনির নিচে কাঠের রেলিং দিয়ে ঘেরা চালাঘরের মেঝেতে টাইলস বসানো। লাঞ্চের সময় হয়নি বলে ক্ষুধার্ত পর্যটকরা এখনো ভিড় জমাতে শুরু করেনি। রঙিন ডোরাকাটা টেবলক্লথ পাতা কাঠের টেবিল আর প্রত্যেক টেবিল ঘিরে চারটা করে চেয়ার পাতা। খোলামেলা চাতালে বসে খাবার খেতে খেতেই এখান থেকে চোখে পড়বে খাল দিয়ে ভেসে যাওয়া রঙিন নৌকা। পুরো এলাকাটাই ফলফুলের গাছে পরিপূর্ণ। অনেক বড় গাছের গোড়া গোল করে বাঁধানো। এসব গাছপালা এবং চালাঘরের ফাঁকে ফাঁকে সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন পর্যটকদের কেউ কেউ। আট-দশ বছরের কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে দিব্যি সাইকেল চালিয়ে আসতে দেখে আমার তো ভিরমি খাবার জোগাড়। এখান থেকে সাইকেল নিয়ে গ্রাম ঘুরে দেখার ব্যবস্থা আছে। আমাদের হাত-পায়ের জোর নিশ্চয়ই কমেছে, তবে তার চেয়ে বেশি কমেছে মনের জোর। তাই ইচ্ছে করলেও কিংবা সামর্থ্য থাকলেও দু-চাকার সাইকেল চালিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারব না। কী জানি বাপু! কোথায় সাইকেল থেকে পড়ে হাত-পা ভেঙে বসব, সেই ভয়টাই কাজ করে সবার আগে।
ভিয়েত নাত রেস্তাঁরায় আমাদের হাত ব্যাগসহ ছোটখাটো জিনিসপত্র ত্রানের জিম্মায় রেখে এবারে ম্যানগ্রোভের গভীরে যাওয়ার জন্য নৌকায় উঠে পড়লাম। ইঞ্জিনবিহীন সত্যিকারের ছোট নৌকা, একটার ধারণক্ষমতা চারজনের বেশি নয়। নৌকায় ওঠার সময় প্রত্যেকের হাতে একটা করে রঙিন মাথাল ধরিয়ে দেওয়া হলো। প্রকৃতপক্ষে হাতে নয়, টুপি পরানো হলো মাথায়। মাথালে রোদের তাপ থেকে মাথা হয়তো বাঁচবে, তারচেয়ে বড় কথা হলো, চারজন মানুষ যখন নৌকায় এক সারিতে বসে খালের জলে ভাসতে ভাসতে সামনে এগিয়ে যায়, তখন যে নান্দনিক দৃশ্যের সৃষ্টি হয় তার তুলনা নেই।
ভিয়েতনামের একেবারেই দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে মেকং নদীর বদ্বীপ হলো এক অনন্য জলজ ভূখণ্ড। ভিয়েতনামের ‘ধানের গোলা’ হিসেবে পরিচিত মেকং ডেল্টায় তার জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খালের সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। এই বিশাল খাল নেটওয়ার্কের মোট দৈর্ঘ্য ৯১ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম খাল মিলিয়ে জলপথে শুধু ট্যুরিস্ট বোট নয়, চলাচল করে অসংখ্য ছোটবড় নৌকা। আমাদের কাঠের তৈরি ডিঙি নৌকা সরু খালের ভেতর দিয়ে চলতে শুরু করলে এক ধরনের নৈঃশব্দের ভেতরে মাঝির বৈঠা ফেলার শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না। মাঝে হঠাৎ দুটা পাখি টিটি... চিঁউ চিঁউ...ঠি রি রি... করে উড়ে গেলে শুধু ওদের ডাক শুনতে পেলাম, চোখের দেখা দেখতে পাইনি। তথ্য অনুসারে খালের আশপাশের জলাভূমি ও বনে ২৪০টিরও বেশি প্রজাতির পাখি বাস করে। বক, পানকৌড়ি এবং বিভিন্ন পরিযায়ী পাখিও দেখা যায়। কিন্তু পাখির এই অভয়ারণ্যে আমাদের তেমন কোনো পাখি চোখে পড়েনি, এমনকি পাখির ডাকও শোনা গেছে খুবই সামান্য। হতে পারে সুন্দরবনে আমরা ভোরবেলা চুপচাপ বেরিয়ে পড়ি বলে সদ্য ঘুমভাঙা পাখিদের কলকাকলি শোনা যায়। এখানকার পাখিরা খাবারের খোঁজে কোথায় উড়ে গেছে কে জানে!
আমাদের নৌকার পাশ দিয়ে উল্টো দিক থেকে আসা নৌকা কখনো চারজন কখনোবা দুই বা তিনজন যাত্রী নিয়ে ভেসে চলে যাচ্ছে। পর্যটকের চেহারা প্রায় দেখাই যায় না, গোলপাতার পটভূমিতে শুধু রঙিন রঙিন মাথালগুলো অদ্ভুত সৌন্দর্য ছড়িয়ে পার হয়ে যায়। খালপাড়ে কোথাও কোথাও গোলপাতার ঝোপের ভেতর থেকে ছোট্ট ঘাটের মতো সিঁড়ি নেমে এসেছে। মাঝিকে জিজ্ঞেস করে কোনো উত্তর পাওয়া যাবে না জেনেও আকারে-ইঙ্গিতে জানতে চাইলাম এসব সিঁড়ির রহস্য। তিনি একগাল হেসে যে উত্তর দিলেন, তা বুঝতে হলে আমাকে ভিয়েতনামের দক্ষিণাঞ্চলের ভাষা শিখতে হবে। তবে কথা বলে একটা উপকার হয়েছে। এতক্ষণ যাকে ‘চালক’ ভেবেছিলাম, তিনি আসলে ‘চালিকা’–আমাদের নৌযানের চালিকাশক্তি।
পরে তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে জানা গেছে মেকং ডেল্টার উর্বর পলিমাটি আর জলে ডোবা পরিবেশের কারণে এর চারপাশের সবুজে ঘেরা খালের পাড়ে এবং বনাঞ্চলে প্রধানত ক্যাজুপুট গাছ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ অঞ্চলের প্রচুর উদ্ভিদ দেখা যায়। খালের দুই পাড়েই স্থানীয় মানুষ বড় বড় ফলের বাগান গড়ে তুলেছেন। এসব বাগানে জন্মে প্রচুর নারকেল, আম, জাম্বুরা, ড্রাগন ফ্রুট, কলা, কাঁঠাল এবং লেবুজাতীয় ফলের গাছ। কাজেই ধরে নেওয়া যায় ম্যানগ্রোভের ভেতরে শুধু ‘গ্রোভ’ বা বনভূমি নয়, সেখানে ‘ম্যান’-এরও বসবাস আছে। এই মনুষ্যকুলের যাতায়াতের প্রধান বাহন নৌযান এবং সে কারণেই মাঝে-মাঝেই গোলপাতার ফাঁকে উঁকি দেয় ছোট ছোট ঘাট।
মিনিট পনেরো একইভাবে সামনে চলার পরে ফেরার সময় হলো। সকালে হোটেলের ব্রেকফাস্টের পরে লোকসংগীতের আসরের ফল এবং মৌমাছিদের হানি-টির আর কোনো অস্তিত্ব উদরে নেই
। অতএব, ভিয়েত নাতে ফেরাটাই এখন জরুরি। আমাদের মাঝিনী নৌকা ঘুরিয়ে ফিরে চললেন। এবারে চলার পথে খালের পানিতে পেলাম প্রচুর জলজ ঘাস, আর রেস্তোঁরার আশপাশে ছোট ছোট জলাশয়ে চোখে পড়ল পদ্ম এবং শাপলা ফুলের সমারোহ। ঘাটে নৌকা ভিড়লে নেমে যাওয়ার সময় দেখলাম খালের অপর পাড়ে বেশ কয়েকটা ছোট ডিঙি নৌকা বাঁধা। মাঝিরা পান-তামাক খাচ্ছেন কি না বলতে পারব না, তবে তারা যে জিরিয়ে নিচ্ছেন সে কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
আমাদের লাঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছিল দোতলায়। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে বাঁশ, কাঠের আসবাবে সাজানো খোলামেলা হলঘরের কোনার দিকে নির্ধারিত টেবিলে বসে পড়লাম আমরা আটজন। এরপরে একের পর আসতে থাকল জানা-অজানা রং-রূপ-ঘ্রাণের নানা পদের খাবার। খাদ্যতালিকায় ‘অথেন্টিক ভিয়েতনামিজ ফুড’ বলা হলেও দেখা গেল আমাদের দেশেও এসব খাবার যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য। প্রথমেই ধরা যাক ভিয়েতনামি খাবারের মূল ভিত্তি সেদ্ধ সাদা চালের ভাত বা কোম ত্রাঙ্গ! সবুজ বাটিতে পরিবেশিত ঝরঝরে সাদা ভাত ভিয়েতনামি ঐতিহ্যের দুপুরের বা রাতের প্রধান খাবার, আমাদেরও প্রধান খাবার। তবে ওদের ভাতটা সামান্য আঠালো। এরপরেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি হোল ফ্রাইড ফিশ। বড় আকারের একটা আস্ত রূপচাঁদাজাতীয় মাছের ফ্রাই পুরোটাই টেবিলে এসে হাজির। ভিয়েতনামের খাবার পরিবেশনের রীতি হচ্ছে বাঙালির একান্নবর্তী পরিবারের সবাই মিলে ভাগ করে খাওয়ার রীতি। এখানে পশ্চিমা সংস্কৃতির মতো প্রত্যেকের জন্য আলাদা প্লেটে খাবার না দিয়ে টেবিলের ঠিক মাঝখানে মূল পদের সব বড় বাটি সাজিয়ে রাখা হয়, প্রত্যেকে নিজের ছোট বাটিতে ভাত-মাছ বা সবজি চপস্টিক দিয়ে মাঝখানের পাত্র থেকে তুলে এনে খায়।
পরিবেশিত অন্যান্য খাবারের মধ্যে ছিল রাইস পেপার বা চালের তৈরি পাতলা কাগজে মাংস, মাশরুম ও সবজির পুর ভরে মচমচে করে ভাজা স্প্রিং রোলস, রসুনের কুঁচি ছিটানো সবুজ কলমি শাক, গাজর ও অন্যান্য সবজি কুঁচি দিয়ে তৈরি হালকা ভিয়েতনামি ‘কান’ স্যুপ, তাজা সালাদ এবং ডিপিং সস। ভিয়েতনামি খাবারে সস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোট বাটিতে গাঢ় সস সাধারণত মাছের সস লেবুর রস ও চিনির মিশ্রণে তৈরি ‘নক চাম’। এটি ভিয়েতনামের ঘরে ঘরে নিত্যদিনের খাবার। মেকংয়ের খালগুলোতে প্রচুর চিংড়ি পাওয়া যায়। সম্ভবত সেখান থেকে কিছু গলদা চিংড়ি ধরে এনে আমাদের টেবিলেও সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দাড়ি গোঁফ এবং চোখ নাকসহ পরিবেশিত চিংড়ি বাটিতে তুলে নেওয়ার ইচ্ছে হলো না। অন্য সব খাবারই বেশ ভালো ছিল, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়।
টেবিলে খাবার পরিবেশনের পরে ভিয়েতনামি রীতি অনুসারে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিটি খাওয়া শুরু করার পর বাকিরা শুরু করেন। এখানে আটজনের স্বল্প সময়ের পাবিবারিক আবহে আমি বয়োজ্যেষ্ঠ হলেও ভিয়েতনামি বা বঙ্গদেশীয় নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করেই যে যার মতো খেতে শুরু করেছেন। খেতে খেতেই টুকটাক কথাবার্তা চলছিল। নেদারল্যান্ডস দম্পতির উকিল সাহেব অনেক কসরৎ করে ভাজা রূপচাঁদা ভেঙে তার স্ত্রীর বাটিতে তুলে দিলে টেবিলের অপর প্রান্ত থেকে স্বল্পবসনা নারী তার সফরসঙ্গীকে খোঁচা দিয়ে বললেন, ‘লুক! হাউ লাভিং হাজবেন্ড হি ইজ!’ স্বামীটি উত্তর দিলেন, ‘আইনজীবীরা সাধারণত স্বামী হিসেবে ভালো হয় না। তবে ইনি নিঃসন্দেহে একজন ব্যতিক্রমী মানুষ।’ আইনজীবীর স্ত্রী হেসে বললেন, ‘রাইট ইউ আর। আনটিল টুডে, হি ইজ আ রিয়াল লাভিং হাজবেন্ড।’
‘আনটিল টুডে... অর্থাৎ ভবিষ্যতে কী হবে, এখনই বলা যাচ্ছে না।’ আমার কথায় সবাই একযোগে হেসে ওঠে।
[চলবে...]
আরও পড়ুন
দেশের নাম ভিয়েতনাম
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
অলংকরণ: মেহেদী হাসান
-->পর্ব: দশ
মেকং ডেল্টার থই সন দ্বীপে লোকসংগীতের দলের সঙ্গে চমৎকার সময় কাটানোর পর শিল্পী এবং বাদ্যযন্ত্রীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এখানে গ্রামীণ পথের দুপাশেই ছোট ছোট প্রাকৃতিক জলাশয় বা ডোবার চারপাশে সবুজ তরুলতা ও উদ্ভিদের সমাবেশ। দ্বীপের উর্বর পলিমাটিতে বিশাল সব ফলের বাগানে সারা বছর ফলতে থাকে নানা ধরনের ফল। আমাদের চেনা গাছপালার মধ্যে চোখে পড়ে আম, লেবু, মাল্টা বা কমলার মতো সাইট্রাস জাতীয় গাছ এবং এক ধরনের বড় জাতের জাম্বুরা। এছাড়া রয়েছে জলপাই ও পাম জাতীয় গাছ। জলাধারগুলোর আশপাশে জন্মেছে প্রচুর জলজ ঘাস ও আগাছা এবং বুনো লতা ও ঘাস। ভাট বা আশশেওড়া জাতীয় পরিচিত বন্য ফার্ন বা ঢেঁকিশাক জাতীয় উদ্ভিদও চোখে পড়ে। ডোবার পানিতে ভাসছে কচুরিপানা আর ক্ষুদ্র টোপাপানা। খালের পাড়ে বা ডোবার কিনারে সবুজ গুচ্ছ গুচ্ছ হেলঞ্চা আর কলমি শাক। আহা! হেলঞ্চা আর কলমি তুলে ভেজে খাবার ব্যবস্থা থাকলে এই ঝকঝকে সবুজ তাজা শাক তুলে নিয়ে যাওয়া যেত।
ভেজা মাটির রাস্তা ছেড়ে একটা ছোট্ট কাঠের সেতু পার হয়ে আমরা একটু প্রশস্ত পথে উঠলাম। এটিও কাঁচা রাস্তা, তবে কাঁকর বালি ছড়ানো। এখানে পথের দুই ধারে ছোট ছোট নারিকেল গাছের সারি, আর তার জালের বেড়ায় ঘন সবুজের মধ্যে ফুটে আছে নীল অপরাজিতা। গ্রামের পথে কোনো যানবাহন চোখে পড়েনি। খানিকটা চলার পরে পেলাম পিচঢালা পথ, আঁকাবাঁকা পথের দুপাশে ইলেকট্রিক পোল। এবারে একটা কালভার্ট পার হয়ে বাম দিকে নেমে গেলেই চোখে পড়ে বেশ বড় আকারের চালাঘর। এখানেও চারদিকে বিভিন্ন ধরনের বুনো ঝোপঝাড় আর হলদে রঙের ফুল। চত্বরে পৌঁছে বুঝলাম এটি একটি মৌমাছি চাষ এবং মধু আহরণ প্রকল্প। ছাউনির নিচে কয়েক সারি চেয়ার টেবিল পাতা। একজন মধ্য বয়সী নারী আমাদের আপ্যায়নের জন্য ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করলেন। শিশু কোলে একজনসহ দুজন তরুণী টেবিলে কাপ পিরিচ সাজাচ্ছেন আর একজন চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে আসছেন। কাউন্টারে একজন বৃদ্ধ ছাড়া আর কোনো পুরুষের দেখা পাওয়া গেল না, তবে বোঝা গেল এটি পুরোপুরি পারিবারিক বাণিজ্য কেন্দ্র।
আঁশফল, রামবুটান এবং বিভিন্ন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফলের বাগানে ঘেরা মেকং ডেল্টার এই দ্বীপগুলোতে মৌমাছিরা প্রাকৃতিকভাবেই এসব ফলের ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। কোনো মৌচাক ছাড়াই কাঠের বাক্সের ভেতরের ফ্রেমগুলোতে কীভাবে হাজার হাজার মৌমাছি মধু তৈরি করছে তা সরাসরি দেখতে পাওয়া একটা অভিজ্ঞতা বটে। কোনো প্রতিরক্ষামূলক গ্লাভস বা মাস্ক ছাড়াই মৌমাছি ভর্তি ফ্রেম বা কৃত্রিম এই মৌচাক হাতে নিয়ে ছবি তোলা আমার খুব জরুরি মনে হয়নি। আরও জনা তিনেক পর্যটকের পরে ভ্যান একটা ফ্রেম আমার সফর সঙ্গিনীর হাত ধরিয়ে দিলে আমি দূরে থেকে তার হাসি হাসি মুখের ছবি তুললাম, কিন্তু কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করিনি। ভ্যান অবশ্য বারবারই বলছিল এখানকার মৌমাছিরা খুবই শান্ত প্রকৃতির হয়ে থাকে, তাই ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। এই শান্ত মৌমাছিরাই যে আমাকে দেখে অশান্ত হয়ে উঠবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে! অতএব, আমি আমার ‘পুলিশ, কুকুর ও মৌমাছি থেকে দূরে থাকার নীতি’তে অটুট থেকে হানি-টির কাপে চুমুক দেওয়ার জন্য টেবিলে বসে পড়লাম।
পরিবারটি তাদের তৈরি খাঁটি মধুর সঙ্গে রয়্যাল তাজা লেবু অথবা কমলা এবং হালকা গরম চা মিশিয়ে একটি বিশেষ ‘হানি-টি’ পরিবেশন করেছে। কোনো আধুনিক প্রযুক্তি বা ক্ষতিকর যন্ত্রপাতি ছাড়াই স্থানীয় মৌ-চাষিরা প্রাকৃতিক উপায়ে মধু সংগ্রহ করেন। জানলাম স্বাদ ও সুবাসে অনন্য এই মধু অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর এবং ক্লান্তি দূর করতে এর জুড়ি নেই। আমাদের এখনই ক্লান্ত হয়ে পড়লে চলবে না। কাজেই বিভিন্ন ধরনের মধু মিশিয়ে পরপর তিন কাপ চা পান সম্পন্ন করার পরে মনে হলো বিনামূল্যে চতুর্থ কাপটা বেশি হয়ে যাবে।
মধুর খামার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে হাতের বাঁ দিকে কয়েকটি তাকে সাজানো খাঁটি মধু, রয়্যাল জেলি এবং মধু দিয়ে তৈরি বিভিন্ন স্কিন কেয়ার পণ্য। মধুর ব্যাপারে কেউ তেমন আগ্রহ না দেখালেও আমাদের বাহরাইন সুন্দরী ত্বক সুন্দর করার কয়েকটা স্কিন কেয়ার হানি ক্রিম কিনে ফেললেন।
আবারও গ্রামের পথ ধরে হাঁটা। কিছুটা এগোবার পরেই এমন একটা গাছের দেখা পেলাম যা দেখে ফল না ফুল বোঝা মুশকিল। তথ্য অনুসন্ধান করে জানা গেল এটি একটি চিরসবুজ গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ, মিকি মাউস প্ল্যান্ট। কেউ কেউ এটিকে বিদেশি জাতের কনকচাঁপা হিসেবেও চেনেন। গাছটির আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে ফুল ঝরে যাওয়ার পর। এর পাপড়িগুলো ঝরে পড়লে ফুলের নিচের বৃত্তটি আকারে বড় হয়ে টুকটুকে লাল রং ধারণ করে। এই লাল অংশের ওপর ছোট ছোট মটরদানার মতো ফল প্রথমে সবুজ থাকে এবং পাকার পরে কুচকুচে কালো হয়ে যায়। কালোর ওপর লাল রঙের ফলগুলো থাকায় এটি দেখতে অনেকটা কার্টুন চরিত্র ‘মিকি মাউস’-এর মুখের মতো দেখায়। আদিতে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্ভিদ হলেও বর্তমানে ভিয়েতনাম এবং বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ হিসেবে এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
‘মিকি মাউস প্ল্যান্টের ফল পাখিদের খাদ্য হলেও মানুষের জন্য এটি ভক্ষণযোগ্য নয়।’ ভ্যান এই তথ্য পরিবেশন করলে নেদারল্যান্ডসের ভদ্র মহিলা জানতে চান, ‘পাখি যেহেতু খেতে পারে, তাহলে এটি বিষাক্ত নয়। সেক্ষেত্রে আমি যদি এই ফল একটু চেখে দেখি, তাহলে কী হতে পারে?’
ভ্যান একটু ভেবে বলে, ‘আই অ্যাম নট শিওর, বাট ইউ মে ডাইরেক্টলি গো টু হেভেন। নট ভায়া আমসটার্ডাম!’
‘দেন আই মে ট্রাই ইট ওয়ান্স’ বলে নেদারল্যান্ডস-বাসিনী মিকি মাউস প্ল্যান্টের দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন। তার আইনজীবী স্বামী দ্রুত তাকে নিবৃত্ত করে ডাচ ভাষায় কী বললেন বুঝতে পারলাম না। তবে আইনের লোক হিসেবে নয়, স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা থেকেই কাজটি করেছিলেন বলে মনে হলো।
এবারে গ্রামের পথ ধরে হাঁটার সময় নারিকেলের পাশাপাশি বেশ কিছু সুপারি গাছ চোখে পড়ে। মেঠোপথের পরে কিছুটা কংক্রিটের রাস্তায় হেঁটে একটা খালের পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। ঘাটে নৌযান প্রস্তুত ছিল। মাঝি এবং নৌকা বদলের সঙ্গে বসার ব্যবস্থাও বদলে গেছে। এবার আসনগুলো দুই সারিতে না সাজিয়ে পাশাপাশি বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সে যাই হোক, সামান্য দূরত্বের পথ দেখতে দেখতেই ফুরিয়ে যাবে। খালের দুই পাড়ে বেশ কিছু সাম্পান অপেক্ষা করছে। আমাদের চালক সেগুলো চমৎকারভাবে পাশ কাটিয়ে কাউকে ধাক্কা-গুঁতা না দিয়ে গোলপাতার ঝোপের ভেতর দিয়ে পথ করে দিব্যি মূল মেকং নদীতে এসে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যে নৌকা যে ঘাটে এসে ভিড়ল সেখানে রীতিমতো পরিচিতিমূলক সাইনবোর্ড লাগানো, ছোট হলেও প্রথাসিদ্ধ ঘাট। নারিকেলের দু-চারটি গাছ ডানে-বাঁয়ে রেখে সামনে এগোতেই চোখে পড়ে অসংখ্য কলাগাছ। এই জায়গাটার নাম সহজেই কলাবাগান বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।
পায়ের নিচে ভেজা মাটি আর মাথার ওপরে ছায়ায় ঘেরা পথে হেঁটে একটা খালের পাশে এসে দাঁড়ালাম। খালের চারপাশ প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো লতাগুল্ম, শাক-পাতায় পরিপূর্ণ। দুপাশের অনেক গাছের ডালপালা খালের পানিতে ঝুঁকে পড়েছে আর খালের জলে ভাসছে নানা ধরনের জলজ উদ্ভিদ। বিস্তৃত শেডের বাইরে নারিকেলের খোসার স্তূপ দেখেই অনুমান করা যায় আমরা ‘কোকোনাট ক্যান্ডি’র কারখানায় এসে পড়েছি।
আমাদের গাইড ভ্যান একটা ত্রিশূলের মতো চোখা মাথাওয়ালা লোহার দণ্ডের ওপর একের পর এক নারিকেল রেখে দ্রুত গোটা তিনেক নারিকেলের ছোবড়া ছিলে ফেলল। সে যেসব কাজের কাজি তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এই হাসিখুশি ছেলে মেয়েগুলো লেখাপড়া শিখে যে পেশা বেছে নিয়েছে সেখানে মলিন মুখ করে নীরবে বসে থাকলে চলে না। প্রাচ্য প্রতীচ্যের নানা দেশের বিভিন্ন ভাষাভাষী বিচিত্র সব মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আর সব ধরনের মানসিকতার মানুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো কঠিন কাজ এরা আয়ত্ত করে ফেলেছে।
নারিকেল ছেলার পরে ভ্যান একটা নারিকেল কুরণি দিয়ে কুরেও দেখালো। কুরণিগুলো আমাদের দেশের নারিকেল কুরণির মতোই। স্থানীয় ভাষায় ‘কেও জুয়া’ নামের ক্যান্ডি তৈরির প্রক্রিয়া চোখে দেখার সঙ্গে সঙ্গে চেখেও দেখলাম, আর জেনেও নিলাম এর নারিকেল থেকে ক্যান্ডি হয়ে ওঠার কয়েকটি ধাপ। নারিকেলের ভেতরের সাদা শাঁসের অংশ কুরে নিয়ে বা কুচি কুচি করে কেটে মেশিনে গুঁড়া বা গ্রেট করা হয় এবং এর থেকে চিপে ঘন, তাজা নারকেলের দুধ বের করে নেওয়া হয়। ভ্যান বর্ণনার সঙ্গে খানিকটা কোরা নারিকেল হাতে চিপে দেখায়। এই ঘন নারকেলের দুধের সঙ্গে মেশানো হয় নির্দিষ্ট অনুপাতে চিনি এবং আঠালো চাল থেকে তৈরি বিশেষ ধরনের মল্ট সিরাপ। মিশ্রণটিকে বড় বড় কড়াইয়ে নিয়ে নিচে কাঠের আগুন দিয়ে হালকা আঁচে জ্বাল দেওয়া হয়। কড়াইয়ের নিচে লেগে না যায় বা পুড়ে শক্ত না হয়ে যায় সে জন্য ৪০-৪৫ মিনিট টানা নাড়তে হয়। বললাম, ‘এতক্ষণ ধরে নাড়লে নারিকেলের যাই হোক যে নাড়বে তার হাত তো আর আস্ত থাকবে বলে মনে হয় না।’
‘সেই জন্যেই তো আছে নারিকেল নাড়ানোর মেশিন।’ ভ্যানের উত্তর।
ক্যান্ডি কারখানার যন্ত্রপাতি খুবই সাধারণ। তার মধ্যে প্রধান আকর্ষণ এই স্টিয়ারিং মেশিন বা নাড়ানি যন্ত্র। নাড়তে নাড়তে তরল মিশ্রণটি এক সময় ঘন, আঠালো সোনালি ক্যারামেলের চেহারা নেয়। আঠালো গরম ক্যান্ডির মণ্ড কড়াই থেকে নামিয়ে ছাঁচে ঢেলে কিছুটা ঠাণ্ডা করা হয়। স্বাদের ভিন্নতার জন্য যোগ করা হয় পাতার রস, চকোলেট, কফি বা কোনো ফলের ফ্লেভার। কারখানার মেয়েরা লম্বা স্ট্রিপ বা ফিতার মতো আকার দিয়ে ছোট ছোট চারকোনা টুকরো ক্যান্ডির আকারে কাটছে। আরেকদল লম্বা উঁচু টেবিলের পেছনে দাঁড়িয়ে-ক্যান্ডিগুলো যেন গলে বা একে অপরের সঙ্গে লেগে না যায় সেজন্য একটি পাতলা চালের তৈরি ভোজ্য কাগজের আবরণ দিয়ে তারপর রঙিন কাগজের মোড়কে প্যাক করছে।
সবশেষ উঁচু টেবিলে নারিকলের তৈরি ক্যান্ডি, চকোলেট এবং নারিকেলের সন্দেশ জাতীয় পিঠা ছাড়াও কাজু বাদাম, চীনা বাদাম, চিপস এবং ছোটদের খেলনা সামগ্রীর স্তূপ। এভরি থিং ফর সেল, সবকিছুই বিক্রয়ের জন্য। একটা ছোট্ট বোর্ডে ইংরেজিতে লেখা, ‘বাই ফাইভ গেট ওয়ান ফ্রি!’ এরপরে আর কোকোনাট ক্যান্ডি না কিনে পারা যায় না। বিভিন্ন স্বাদের চকোলেট আর ক্যান্ডি মিলিয়ে ১০ প্যাকেট কিনে ফেললাম, সঙ্গে অবশ্যই বিনামূল্যে দুই প্যাকেট।
চলবে...
আরও পড়ুন
দেশের নাম ভিয়েতনাম
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৭ পিএম
অলংকরণ: মেহেদী হাসান
-->পর্ব: নয়
সকালে নির্ধারিত সময়ের মিনিট দশেক আগেই লবিতে এসে বসে আছি। কাজেই হোটেল ব্লু ডায়মন্ডের সামনে ট্যুরিস্ট বাস এসে পড়লে গাড়িতে উঠে পড়তে দেরি হলো না। পর্যটকের সাথে সাথে আমাদের গাইডও বদলে গেছে। এখানে সকল ট্যুর গাইডেরই পোশাক লাল টি-সার্ট। ছেলেটির বয়স কুড়ি বাইশ বছরের বেশি হবে বলে মনে হয় না। অবশ্য কোরিয়া, জাপান, ভিয়েতনামীদের চেহারা দেখে বয়স বোঝা কঠিন। ভ্যান তার পরিচয় দিয়ে প্রথমেই ভিয়েতনামের একটা ম্যাপ বের করে দেশটির ইংরেজি "এস" আকৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। বিষয়টা আগে থেকেই জানা ছিল, তারপরেও আসলেই সেটা কতোটা "এস" তা একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের আজকের গাইড! বর্তমানে আমরা কোন অবস্থানে আছি এবং কোন গন্তব্যে যাচ্ছি, সে সম্পর্কে একটা নাতিদীর্ঘ বক্তৃতায় সে বলছিল: হো চি মিন সিটির কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ ছেড়ে মেকং নদীর বাম তীরে অবস্থিত 'মাই থো' নামের ছোট্ট শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছি। আমি মনে মনে বললাম, "হো চি মিন যদি কোলাহল পূর্ণ হয়, তাহলে ঢাকায় তুমি একদিনও তিষ্টাতে পারবে না।"
হো চি মিন সিটি থেকে মাই থো শহরের দূরত্ব প্রায় সত্তুর কিলোমিটার। কুড়ি পঁচিশ মিনিট চলার পরে একটা দীর্ঘ বাঁক নিয়ে আমরা প্রকৃত অর্থেই নিরিবিলি গ্রাম এবং মফস্বল শহর পার হয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের সাথে সাথে চলা সড়ক দ্বীপে সবুজ পাতার মধ্যে ফুটে আছে অজ¯্র লাল ফুল। মাঝে মাঝে ঘন লাল ফুলের বিস্তার চলছে তো চলছেই, সবুজ পাতা আড়ালে পড়ে গেছে। ছোট ছোট শহরের পথ ঘাট, দোকান পাট আর বাড়ি ঘর দেখে বাংলাদেশের দৃশ্য বলে ভুল হতে পারে। তবে বাজার হোক কিংবা রিফুয়েল স্টেশন, সর্বত্রই ঝাঁকে ঝাঁকে মোটর বাইকের দেখা মেলে।
মাই থো শহরের কাছাকাছি এসে একটা ট্রাফিক জংশনে দূরে থেকেই চোখে পড়ে বেশ বড় একটি গেøাব। গোল চত্বরের কেন্দ্রবিন্দুতে "ট্রুং লুওং রাউন্ড অবাউট" নামের সোনালি রঙের মানচিত্রের রেপ্লিকা মেকং ডেল্টা অঞ্চলের দিকে যাওয়ার পথে একটি বিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক। এই ল্যান্ড মার্ক পেরোতে না পেরোতেই ভ্যান বলে উঠলো, "উই আর হিয়ার...। আমরা মেকং নদীর পূর্ব তীরে মাই থো ট্যুরিস্ট বোট পিয়ারে এসে পড়েছি। স্থানীয়ভাবে তিইয়েন নদী নামে পরিচিত নদীর তীরে এটি একটি প্রধান পর্যটন ঘাট। এখান থেকেই আমরা ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকা বা সাম্পানে করে মেকং ডেল্টার বিখ্যাত চারটি দ্বীপ লং, ল্যান, কুই, ফুং অর্থাৎ ড্রাগন, ইউনিকর্ন, ফিনিক্স এবং টরটয়েজ-এই চারটি সুন্দর দ্বীপ ঘুরে আসবো।"
আমরা যেখানে নামলাম সেটি আমাদের দেশের একটি বড় লঞ্চঘাট বলা যায়, কিন্তু কী চমৎকারভাবে সাজানো! যেমন এর ভবনের স্থাপত্য, তেমনি ভেতরের পরিবেশ। বুড়িগঙ্গা তীরের সদরঘাটের মতো কোনো হৈচৈ হুলুস্থুল নেই, যাত্রী ডাকাডাকি নেই এবং জনসমাগমও নেই। কয়েকটা সাইনবোর্ডে গন্তব্য এবং টিকেটের দাম লেখা ভিয়েতনামী ভাষায়। পাশাপাশি ইংরেজিতে পর্যটকদের জন্যে বিভিন্ন অফার বা ট্যুর প্যাকেজের সচিত্র বিজ্ঞাপন। অনেকটা নির্জন ওয়াকওয়ে ধরে এগোতে থাকলে পাশেই নোঙর করা ভাইকিং সায়গন এবং ডেল্টা কুইনের মতো বড় যাত্রীবাহী জলযান। এ্যাসবেস্টাসের ছাউনির নিচে দিয়ে সাম্পানের ঘাটের দিকে যাবার পথে দু'পাশের রেলিং-এ বোগেনভোলিয়া জাতীয় ফুল ফুটে আছে। একেবারে যেখানে পাটাতন নদীর কিনারে চলে গেছে, সেখানে দুপাশের রেলিং-এ ঝুলছে কমলা এবং সাদায় মেশানো লাইফবয়া।
আমরা একে একে নৌযানে উঠে দেখলাম এটি আসলে আমাদের সাম্পানের মতো নয়। যন্ত্রচালিত নৌকা, তবে বসার ব্যবস্থা দুপাশে দুটি করে পাঁচটি সারির আসন। আমি মাথা গুণে দেখলাম নৌকার মাঝি এবং গাইডসহ মোট দশজন। নৌকা ছেড়ে দেবার পরে আমরা উজানের দিকে ভেসে চললাম। সবগুলো আসনেই পর্যটকেরা জোড়া জোড়া করে বসেছেন। ভ্যান কিছু একটা বলার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু জলযানের ভটভট শব্দে তেমন কিছু বোঝা গেল না। আমাদের পেছনে দুজন দুটো ডাব হাতে স্ট্র দিয়ে চুমুক দিচ্ছিলেন। আরেক জোড়া নারী-পুরুষের নারী মোবাইল ফোনে সেলফি তোলার চেষ্টা করছিলেন। ফোনসহ তাঁর হাতটা নৌযানের খোলা জানালার বাইরে চলে গিয়েছিল। ভ্যান কাছে এসে বললো, 'এখানে মেকং-এর গভীরতা আট থেকে দশ মিটার। তোমার সেল ফোন নদীতে পড়ে গেলে তোলার চেষ্টা করা যেতে পারে, তবে সেটা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।' ভদ্রমহিলা দ্রæত তাঁর হাত ভেতরে নিয়ে ছবি তোলায় ক্ষ্যান্ত দিলেন। ভ্যানের তথ্য অনুসারে নদীর এই অংশটা প্রায় দেড় কিলোমিটার প্রশস্ত। মেকং নদীর জল স্বচ্ছ হবে ভেবেছিলাম, কিন্তু ধারণার সাথে মেলেনি। ঘোলা জলে ছোট ছোট ঢেউয়ের উপর ভেসে বেড়াচ্ছে দলছুট কচুরি পানা। নদীতে নৌযানের সংখ্যাও বেশি নয়। একটা দুটো ট্রলার জাতীয় নৌযান এবং দু তিনটি ডিঙি নৌকার মতো ছোট নৌকা কেন মেকং পাড়ি দিচ্ছে বুঝলাম না। একটা ধীর গতির বড় টুরিস্ট বোট আমাদের বিপরীত দিক থেকে এসে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
মিনিট পনের পরে ল্যান অর্থাৎ ইউনিকর্ন দ্বীপে আমাদের প্রথম যাত্রা বিরতি। সাম্পান থেকে যেখানে নেমে গেলাম সেটা ঠিক প্রচলিত কোনো ঘাট নয়। একটু উঁচু মাটির ঢিপির উপরে দাঁড়িয়ে যে গাছটির সাথে ভারসাম্য রক্ষা করলাম, সেটি একটি ছোট্ট নারিকেল গাছ। গাছ ছোট হলেও তিন দিক থেকে অসংখ্য কচি ডাব ঝুমঝুম করছে। সকলেই নেমে এলে ভ্যান নৌযানে রাখা আমাদের ছোট ছোট ব্যাগগুলো নিয়ে নেমে এলো। জিজ্ঞেস করে জানলাম ফেরার পথে আমরা অন্য একটি সাম্পানে ফিরবো। দু পাশে একটু উঁচু মাটির আইলের মাঝখান দিয়ে কংক্রিটের ¯øাব বসানো পথে হেঁটে চললাম। প্রথমেই বাঁ হাতে একটা ছোট্ট ছিমছাম বাড়ি, মনে হলো রিসোর্ট ধরনের কিছু একটা। তারপরই হাতের দুই পাশে ফলের বাগান। আম, জলপাই, নারিকলে এবং সফেদার সাথে আরও সব নাম না জানা ফলের গাছ। এক পাশে তারজালের বেড়ায় ছড়িয়ে আছে আঙুর লতা। তবে লতায় আঙুরের দেখা নেই, ফলে এই আঙুর টক না মিষ্টি চেখে দেখা সম্ভব হয়নি।
কিছুদূর হেঁটে ক্লান্ত হবার আগেই আমরা রাস্তা থেকে ডান দিকে নেমে গেলাম। সেখানে নারিকেল পাতায় ছাওয়া বেশ চওড়া চাতালের বাইরে ফুটে আছে থোকা থোকা লাল রাধা চ‚ড়া আর ঝুলছে হলুদ বর্ণের সোনালু। চারিদিকে গাছপালা, নীরব নির্জন প্রকৃতি, এখানে সেখানে ছড়ানো ফুলের রাজ্যে সোনালুকে আর যাই হোক বাঁদর লাঠি বললে তার সৌন্দর্যের অবমাননা হয়। ছাউনি দেওয়া চত্বরের ভেতরে দুপাশে কয়েক সারি চেয়ার টেবিল সাজানো। এক টেবিলেই আমাদের আটজনের জায়গা হয়ে গেল। এখানেই দলের অন্য সবার সাথে পরিচয় পর্বও সম্পন্ন হলো। আমাদের মুখোমুখি বসেছিলেন বাহরাইনের এক তরুণ দম্পতি। বাহরাইন শুনলে আমাদের যেমন মধ্য প্রাচ্যের ইসলামি চেহারা ভেসে ওঠে, এই দুজন মোটেও তেমনটা নন। মুসলমান ভাই সাহেবের চোয়ালে এং থুতনিতে সামান্য দাড়ি থাকলেও ভাবী সাহেবা জিন্স টি-সার্ট পরিহিতা এবং রীতিমতো লিপস্টিক চর্চিতা। ধর্মের যতো বাহাদুরি এবং বাড়াবাড়ি, সবই আমাদের দেশে! পাশেই বসেছিলেন নেদারল্যান্ডস থেকে আসা এক আইনজীবী এবং তাঁর স্ত্রী। অন্য দুজনও ইওরোপ থেকে এসেছেন তবে তাঁদের জাতীয় পরিচয় ভিয়েতনাম ছাড়ার আগেই ভুলে গেছি।
আমরা বসে পড়ার পরপরই টেবিলে আসতে থাকে নানা রকম ফল। এতোক্ষণ যে সব বাগানের ভেতর দিয়ে এসেছি সেই আম, সফেদা এবং পেয়ারা ছাড়াও ছিল রামবুতান ও আনারস। একটি প্লেটে লবন এবং মরিচের গুঁড়া দেখে একটু অবাক হলাম। এটাও সম্ভবত এশিয়ান পরিবেশনা। আমাদের ফলাহারের সাথেই শুরু হলো সঙ্গীত। প্রথমে নারী কণ্ঠে একক সঙ্গীত, তারপরে নারী-পুরুষ দ্বৈত কণ্ঠে আর সব শেষে তিনজনের কণ্ঠে কোরাস গান। তিনজন বাদ্যযন্ত্রী তাঁদের যন্ত্র নিয়ে প্রস্তুত ছিলেন। গান শুরু আগেই তাঁরা কিছুক্ষণ যন্ত্র সঙ্গীতের মহড়া দিয়ে পরিবেশ সৃষ্টি করলেন, তারপরে শুরু হলো আবহ সঙ্গীতসহ ভিয়েতনামী লোকসঙ্গীতের অনুষ্ঠান। ভিয়েতনামের লোকগানের সুর এবং ভাষা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই, তবে শুনতে মন্দ লাগছিল না। গানগুলোর সাথে আমাদের রাজশাহী অঞ্চলের বিয়ের গীতের বেশ মিল আছে। বিশেষ করে শেষ পর্বে তিনজন যখন হাতে তালি দিয়ে একটি সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন করলেন, তখন আসলেই গানের আসর বেশ জমে উঠেছিল।
গানের সাথে তিনজন বাদ্যযন্ত্রী তাঁদের যন্ত্র বাজাচ্ছিলেন। প্রথমজনের হাতে ছিল হাওয়াইয়ান গিটার, এটার পরিচয় না দিলেও চলবে। তবে ট্রাডিশনাল ফোক মিউজিকের অনুসঙ্গ তিনটি বাদ্যযন্ত্রের একটি ছিল দান নগুয়েত, একটি দান বাউ আর অন্যটি দান নি। মেকং ডেল্টা অঞ্চলের গোল আকৃতির দান নগুয়েত বাদ্যযন্ত্রটির আকৃতি চাঁদের মতো গোল বলে একে চাঁদ-দোতারাও বলা হয়। দুই তার বিশিষ্ট তারের বাদ্যযন্ত্রটি আঙুল বা পিক দিয়ে বাজানো হয়। অন্য জন, বয়োবৃদ্ধ একজন শিল্পী, পর্যায়ক্রমে বাজাচ্ছিলেন দান নি আর দান বাউ। দান নি আমাদের দেশের বেহালা বা সারেঙ্গীর মতো যন্ত্র। এটিও দুই তার বিশিষ্ট ভিয়েতনামি বাদ্যযন্ত্র। ধনুকের মতো একটি ছড় দিয়ে টেনে তিনি বাজাচ্ছিলেন দান নি। তবে শেষ পর্যন্ত যে যন্ত্রটি দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেটি আমাদের সাধের লাউ দিয়ে তৈরি দান বাউ, আর বাউ শব্দটির অর্থ হলো লাউ। মনোকর্ড বা এক-তারবিশিষ্ট এই যন্ত্রের তারটি ডান হাতে ছোট একটি পিক দিয়ে টেনে বাজানো হয়। এর শেষ প্রান্তের গোলাকার অংশটি লাউয়ের খোল দিয়ে তৈরি। আজকাল শব্দ বিবর্ধক এই গোল জিনিসটি কাঠ দিয়েও বানানো হয়। বিস্ময়কর হলো, একটি মাত্র তার দিয়ে এটি অত্যন্ত সূ² স্বরভেদ, কম্পন ও মেলোডি তৈরি করতে পারে। যন্ত্রটির সুর অনেক সময় মানুষের কণ্ঠস্বরের মতো টানা, কোমল ও আবেগপূর্ণ শোনায়। বৃদ্ধ যন্ত্র শিল্পীর বয়স এবং মুখাবয়ব দেখে মনে হচ্ছিল দান বাউতে তিনি তাঁর জীবনের কোনো করুণ কাহিনির সুর সৃষ্টি করে চলেছেন।
চলবে...
আরও পড়ুন
দেশের নাম ভিয়েতনাম
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৭ পিএম
অলংকরণ: মেহেদী হাসান
-->পর্ব: আট
দীর্ঘ কুড়ি বছর ধরে চলা ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হয়েছিল ১৯৭৫ সালের এপ্রিল মাসে, আর হো চি মিন সিটিতে যুদ্ধ স্মারক জাদুঘর, ওয়ার রেমনান্টস মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠিত হয় একই বছর সেপ্টেম্বর মাসে। অর্থাৎ যুদ্ধ শেষের তিন মাসের মধ্যেই ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং প্রথম ইন্দোচীন যুদ্ধের ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির ইতিহাস তুলে ধরতে গড়ে তোলা হয়েছিল এই জাদুঘর। কতটা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দুরদর্শিতা থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ভিয়েতনামের নেতৃত্ব যুদ্ধ শেষে তাৎক্ষণিকভাবে এ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
জাদুঘরের বাইরের চত্বরে এসে দাঁড়াতেই দেখা যায় পরাজিত মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত বিশাল সব সামরিক সরঞ্জাম। এর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, ট্যাংক এবং বিভিন্ন ধরনের কামান। এ ছাড়াও আরও কিছু অস্ত্রশস্ত্র সাজিয়ে রাখা হয়েছে এখানে-সেখানে, এসবের নামও আমাদের জানা নেই। নগুয়েন টিকিট সংগ্রহ করতে গেলে আমরা ঘুরে ঘুরে ভিয়েতনামে ফেলে যাওয়া মার্কিন অস্ত্রগুলো দেখছিলাম। টিকিটের মূল্য প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৪০ হাজার ভিয়েতনামি ডং অর্থাৎ ১৮০ টাকার মতো। টিকিটের মূল্য নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা ছিল না, কিন্তু মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় মিউজিয়ামে ঢোকা যায়, এটা কেবল এশিয়ার দেশগুলোতেই সম্ভব। ইওরোপের যেকোনো মিউজিয়ামে ঢুকতে গেলে দেড়-দু হাজার টাকার কমে কোথাও প্রবেশ করা সম্ভব নয়। প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামের টিকিট টাকার অঙ্কে ৪ হাজার আর আমসস্টারডামের আনা ফ্রাঙ্ক মিউজিয়ামে ঢুকতে হলে টিকিট কিনতে হবে অন-লাইনে কমবেশি আড়াই হাজার টাকায়। অবশ্য ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রবেশ করা যায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
এই জাদুঘরের তিনতলা ভবনে ২০ হাজারের বেশি নথিপত্র, ছবি এবং চলচ্চিত্র সংরক্ষিত আছে। আমরা নিচের তলা থেকেই শুরু করলাম জাদুঘর পরিক্রমা। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে বিশ্বজুড়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং শান্তিকামী মানুষের আন্দোলনের দুর্লভ সব ছবি ও নথিপত্র। ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব ভিয়েতনামের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি বাদামি মলাটে বাঁধাই করে রাখা হয়েছে লাল গালিচার ওপরে একটি কাচের শো কেস-এ। এরপরই ভিয়েতনামের রাজনৈতিক নেতাদের সাদা-কালো গ্রুপ ছবি। একটি ছবিতে স্পষ্ট দেখা যায় তরুণ হো চি মিনকে। বেশ কয়েকটি দূরপাল্লার কামান, রকেট লঞ্চারসহ ভারী আগ্নেয়াস্ত্রও রাখা হয়েছে প্রদর্শনীতে।
দোতলাতেও রয়েছে যুদ্ধকালীন আলোকচিত্র। দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহকদের ক্যামেরায় ধারণ করা যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা এবং সাধারণ মানুষের ওপর চালানো নির্যাতনের ভয়াবহ দৃশ্য ধরা পড়েছে এসব ছবিতে। কয়েকটি গ্রামে ম্যাসাকারের চিত্র এবং ধ্বংসযজ্ঞের পরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও তাদের বাঁচার আকুতির ছবিতে ফুটে উঠেছে মার্কিনিদের হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা। একটি বড় ক্যানভাসে জ্বলতে থাকা গ্রামের পটভূমিতে অস্ত্র হাতে মার্কিন সেনাদের নির্বিচার গুলিবর্ষণের নৃশংসতা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এ দৃশ্যের তুলনা চলে কেবল বাংলাদেশে একাত্তর সালে পাকিস্তানিদের নির্মমতার সঙ্গে। কয়েকটি গ্রামের হত্যাকাণ্ডে নিহতদের বয়সসহ তাদের নামের তালিকাও দর্শনার্থীদের মনে করিয়ে দেয় মার্কিন বর্বরতা হত্যাকারীদের হাতে পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধ থেকে তিন বছরের শিশুও রক্ষা পায়নি।
দোতলার কক্ষগুলোতে আলোকচিত্রের পাশাপাশি সাজানো রয়েছে হ্যান্ড গ্রেনেড, মর্টার শেল, ফ্লেয়ার কার্টিজ এবং নানা ধরনের বুলেট। এখানে আধুনিক অস্ত্রের সঙ্গে প্রায় অপ্রচলিত শর্টগান বা দোনলা বন্দুকও দেখা যায়। মার্কিন যুদ্ধবাজরা দক্ষিণ ভিয়েতনামের পুতুল সরকারকে কী পরিমাণ অস্ত্র কতটা সরবরাহ করেছিল তারও একটি সচিত্র তালিকা রয়েছে জাদুঘরের দেয়ালে। দোতলার বারান্দায় রয়েছে বেশ কিছু ছোট ছোট ভাস্কর্য। যুদ্ধের পাশাপাশি প্লাস্টার অব প্যারিসের তৈরি দুই কিশোর-কিশোরীর হাতে শান্তির পায়রার ভাস্কর্য আমার ভালো লেগে যায়। সেখানে বোধহয় আমি একটু বেশি সময় নিয়ে ফেলেছিলাম। ফলে তিনতলার ব্যালকনি থেকে দলছুট আমাকে দেখে আমার সফর সঙ্গিনী হাত দিয়ে ইশারা করে কী যেন বলতে চেষ্টা করছিলেন। আমি তাদের নিশ্চিত করলাম, আমি এখানেই আছি এবং শিগগিরই ওপরে উঠে যাব।
তৃতীয় তলায় আমেরিকান বাহিনীর ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিক অস্ত্র ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ এবং এর দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ জিনগত প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত প্রদর্শনী রয়েছে। আজও নতুন প্রজন্মের বিপুল সংখ্যক মানুষ এই মারাত্মক বিষের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ায় দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন। এই ফ্লোরেই আছে গেরিলা যোদ্ধা এবং বাঁশের ঝোপঝাড়ের মধ্যে লতাপাতা ও বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরি তাদের ছোট ছোট ঘরের মডেল। এ ছাড়া রয়েছে বোমা হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রাম থেকে উদ্ধার করা মাটি ও চীনা মাটির পাত্র, বাঁশের তৈরি ঝুড়ি, টিন এবং সিরামিকের থালাবাটি। গেরিলা যোদ্ধাদের ব্যবহৃত পোশাক, জুতা ও টুপি সযত্নে রেখে দেওয়া হয়েছে জাদুঘরে।
বের হয়ে আসার পথে আমি এক মার্কিন সহযাত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেমন লাগল ওয়ার রেমনান্ট মিউজয়াম?’ আমি আসলে বলতে চেয়েছিলাম, ‘কেমন লাগল তোমাদের পরাজয়ের স্মৃতি মিউজিয়াম?’ নেহায়েত ভদ্রতা করে সে কথা বলতে পারলাম না। সে অবশ্য মৃদু হেসে উত্তর দিল, ‘ইয়েস দিস ওয়াজ দ্য রিয়ালিটি। এটাই ছিল বাস্তবতা এবং এটা আমাদের মেনে নিতে হবে। ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিলে ভালো হতো, তবে দুঃখের বিষয় কেউই অতীত থেকে শিক্ষা নেয় না।’
মার্কিন মেয়েটিকে খোঁচা দিলেও আমি নিজে বিস্ময়ের সঙ্গে বেশ কিছুটা হতাশা নিয়েই জাদুঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। ভিয়েতনামের একটি গ্রামে বোমা হামলায় নিহত সতেরোজন মানুষের প্রত্যেকের নাম, পরিচয় ও বয়সের তালিকা তারা যুদ্ধ স্মারক জাদুঘরে রেখে দিয়েছে। আমাদের যশোরের চুক নগর, শেরপুরের সোহাগপুর কিংবা জয়পুরহাটের কড়ই-কাদিপুরে একই দিনে নিহত শত শত মানুষের নাম-পরিচয় কোথাও নেই, কোনো জাদুঘরে নেই, কোনো স্মারক স্তম্ভে নেই। আমরা জাতিগতভাবেই অকৃতজ্ঞ ও নিমকহারাম।
ওয়ার রেমনান্ট মিউজয়াম থেকে ১০ মিনিটেরও কম সময় হেঁটে পৌঁছে গেলাম সায়গন সেন্ট্রাল পোস্ট অফিসে। নগুয়েন আমাদের নামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমরা এখন ভিয়েতনামের প্রধান পোস্ট অফিস এবং একই সঙ্গে ডাকঘর জাদুঘর হিসেবেখ্যাত সায়গন সেন্ট্রাল পোস্ট অফিসের সামনে। পোস্ট অফিসে সপ্তাহের ওয়ার্কিংডে-তে সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা। সাড়ে ৫টা বেজে গেছে, কাজেই আমরা আজ আর কোথাও যাচ্ছি না। তোমরা ইচ্ছে করলে ঘণ্টাখানেক সময় সেন্ট্রাল পোস্ট অফিসেই কাটাতে পার। পোস্টকার্ড বা এনভেলাপ কিনে দেশে কোনো প্রিয়জন বা বন্ধুদের চিঠিও লিখতে পার। আর হ্যাঁ, এই জাদুঘরে ঢুকতে কোনো প্রবেশমূল্য দিতে হবে না। দলের কেউ একজন বললেন, ‘আমরা তো পোস্ট অফিসে ডাকটিকিট বা পোস্টকার্ড কিনতেই ঢুকব। তার জন্য আবার টিকিট কীসের?’
‘সেজন্য তো বললাম, পোস্টকার্ডের সঙ্গে জাদুঘর ফ্রি,’ নগুয়েনের উত্তর।
সেন্ট্রাল পোস্ট অফিস ভবন বাইরে থেকে দেখতে অনেকটা ইউরোপের কোনো দেশের রাজপ্রাসাদের মতো। এর উজ্জ্বল হলুদ রঙের দেয়াল, খিলান আকৃতির জানালা এবং প্রবেশদ্বারের ওপরে থাকা বিশাল ঘড়ি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তবে আমাকে প্রথমেই আকর্ষণ করল ভবনের সামনে সোভিয়েত স্টাইলের একটি যুগল প্রস্তর মূর্তি। ভাস্কর্যটির কাছে এসে অবশ্য বুঝতে পারলাম এটি কালো পাথরের তৈরি নয়, প্রকৃতপক্ষে গাঢ় ব্রোঞ্জের তৈরি। ভাস্কযের্র নিচের বেদিতে একটি ফলকে লেখা এই ভাস্কর্যের তথ্য আর ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা। ভিয়েতনামের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এবং স্বাধীনতার পরে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যেসব সাধারণ ডাককর্মী ও সৈনিক জীবন বাজি রেখে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে অবদান রেখেছিলেন, তাদের সম্মান জানাতে সায়গন শহরের প্রতিষ্ঠার ৩০০ বছর পূর্তিতে এই স্মৃতিস্তম্ভটি তৈরি করা হয়। পোস্ট অফিসের সামনের বাগানে উজ্জ্বল হলুদ রঙের পোস্ট অফিস ভবনের ঠিক সামনে এই কালো রঙের বিপ্লবাত্মক ভাস্কর্যটি চমৎকার একটি বৈপরীত্য তৈরি করেছে। এটি একদিকে ফরাসি উপনিবেশের ইতিহাস এবং অন্যদিকে আধুনিক ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট বিপ্লবের ইতিহাস উভয়কেই একসঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছে। তবে একজন নারী ও একজন পুরুষের দৃঢ় ও গতিশীল গঠনভঙ্গিটি নিঃসন্দেহে সোভিয়েত স্থাপত্যশৈলীর কথা মনে করিয়ে দেয়। পোস্ট অফিসে আসা-যাওয়ার সময় অনেকেই নাকি এই সুন্দর ভাস্কর্যটির সামনে ছবি তুলতে পছন্দ করেন। আমরাও সেই সব পর্যটকের মতো দাঁড়িয়ে গেলাম ‘দ্য সোলজার’ স্ট্যাচুর সামনে।
ছবি তোলা শেষ হলে সুদৃশ্য ফটক পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম পোস্ট অফিসে। হো চি মিন সিটির অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক নিদর্শন এই পোস্ট অফিস তৈরি হয়েছিল ফরাসি উপনিবেশ আমলে। বিট্রিশ ভারতে ইংরেজদের অবকাঠামোগত উন্নয়নের তুলনায় ভিয়েতনামের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ফরাসিদের অবদান খুব বেশি নয়। তবে সায়গন এবং হ্যানয়সহ কয়েকটি বড় শহরে তাদের নির্মিত ভবন, প্রাসাদ বা সড়ক ও উদ্যান এখনো সেই ঔপনিবেশিক কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খুব গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টিশীল নির্মাতা, শিল্পী বা স্থপতির কাজ না হলে আমি সাধারণত কারও নাম মনে রাখার চেষ্টা করি না। তবে এই ডাকঘরটির কথা একটু ভিন্ন। এর স্থাপত্য নকশা করেছেন ফরাসি স্থপতি আলফ্রেড ফুলহো এবং এর ভেতরের লোহা ও কাচের তৈরি চোখ ধাঁধানো ছাদের কাঠামোটির নকশা করেছেন প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের স্থপতি বিখ্যাত প্রকৌশলী গুস্তাভ আইফেল। সে কারণেই এটি এখন শুধু একটি পুরোদমে সচল ডাকঘরই নয়, রীতিমতো পর্যটকদের আকর্ষণের ক্ষেত্র।
পোস্ট অফিসের ভেতরে বিশাল হলঘরে ঢুকে মনে হলো ইউরোপীয়দের কোনো পুরোনো রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি। উঁচু খিলানযুক্ত ছাদ এবং পুরোনো আমলের কাঠের টেলিফোন বুথগুলো অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। হলঘরে পেতে রাখা কয়েক সারি বেঞ্চে বসে টেবিলে পোস্টকার্ড রেখে মনোযোগের সঙ্গে চিঠি লিখছেন কয়েকজন নারী-পুরুষ। দৃশ্যটি ভীষণ ভালো লাগে। এটি এখনো একটি সচল ডাকঘর, তাই পর্যটকরা এখান থেকে স্ট্যাম্প কিনে নিজেদের দেশে বা প্রিয়জনদের কাছে ঐতিহ্যবাহী পোস্টকার্ডে চিঠি পাঠাতে পছন্দ করেন। আমার দেখা প্রায় অর্ধশত দেশের মধ্যে জার্মানি ছাড়া আর কোথাও এখন চিঠি লেখার প্রচলন তেমন দেখিনি। এখানে এসে আমাদের ভ্রমণসঙ্গী বইবন্ধু জাফর সৈয়দের কথা খুব মনে পড়ছিল। তিনি যে দেশেই যান, সে দেশের পোস্টকার্ড, খাম, ডাক টিকিট সরাসরি পোস্ট অফিস থেকে কিনতে পছন্দ করেন। হো চি মিন সিটির এই পোস্ট অফিসে এলে নিশ্চয়ই খুশি হতেন।
হলের ভেতরের দিকে দেয়ালে ১৮৯২ সালের সায়গন ও তার আশপাশের অঞ্চলের এবং ১৯৩৬ সালের কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার দুটি বিশাল হাতে আঁকা মানচিত্র রয়েছে। হলের দুই পাশে স্যুভেনির শপ রয়েছে, তাবে আমাদের কেনাকাটার ইচ্ছে এবং সময় কোনোটাই নেই বলে ওদিকে যাইনি। দীর্ঘ করিডরের একেবারে শেষ মাথায় অনেকটা উঁচুতে দেখতে পাই ভিয়েতনামের মহান নেতা প্রেসিডেন্ট হো চি মিনের একটি বেশ বড় প্রতিকৃতি। দুই দিন ধরে সারা শহর ঘুরেও কোথাও হো চি মিনের কোনো প্রতিকৃতি বা ভাস্কর্য চোখে পড়েনি। এই প্রথম একটা ছবি দেখলাম, তাও প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে, পোস্ট অফিসের প্রান্তে।
চলবে...
