চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) রেলস্টেশনে রাতে ঘুমিয়ে থাকা দুই পথশিশুকে টাকার লোভ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন চার থেকে পাঁচজন ব্যক্তি। শিশু দুটি যেতে রাজি না হলে তাদের মুখ চেপে ধরে হাত-পা টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় শিশুদের চিৎকার শুনে এক পথচারী এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা পালিয়ে যান। এ ঘটনায় ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মাকসুদ আলী নামে একজনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছেন শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেলস্টেশন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
মাকসুদ আলী সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার তেলিয়া গ্রামের বাসিন্দা।
আরও পড়ুন
ঘটনার বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মিনহাজ আলম সৌরভ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি চললেও পরীক্ষার কারণে তিনি ক্যাম্পাসসংলগ্ন জিরো পয়েন্ট এলাকায় অবস্থান করছিলেন। শনিবার ফজরের নামাজ শেষে ফেরার পথে রেলস্টেশনে লোকজনের জটলা দেখতে পেয়ে সেখানে যান তিনি। পরে উপস্থিত স্থানীয়দের কাছ থেকে রাতের ঘটনার বিস্তারিত জানতে পারেন।
স্থানীয়দের বরাতে সৌরভ জানান, রাতে রেলস্টেশনের একটি দোকানের টেবিলে ঘুমিয়ে ছিল দুই পথশিশু। তাদের একজনের বয়স আনুমানিক ১৩ থেকে ১৪ বছর এবং অন্যজনের বয়স ১০ বছরের নিচে। ভোররাত সাড়ে ৩টার দিকে চার থেকে পাঁচজন ব্যক্তি সেখানে এসে শিশু দুটিকে এক হাজার টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সঙ্গে যেতে বলেন। শিশু দুটি রাজি না হলে তাদের মুখ চেপে ধরে এবং হাত-পা ধরে টানাহেঁচড়া শুরু করেন তারা।
আরও পড়ুন
একপর্যায়ে শিশু দুটি চিৎকার করলে পাশ দিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তি এগিয়ে আসেন। তার উপস্থিতি বুঝতে পেরে অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। পরে ওই ব্যক্তি শিশু দুটিকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করেন।
সকালে শিশু দুটিকে নিয়ে আবার রেলস্টেশনে ফিরে এলে অভিযুক্তদের একজনকে সেখানে দেখতে পান ওই ব্যক্তি। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।
মিনহাজ আলম সৌরভ বলেন, ‘সকালে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনিও আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় ওই ব্যক্তি একটি মোটা কাঠের লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করার চেষ্টা করেন। পরে উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে আটক ব্যক্তির হাতাহাতি হয় এবং তাকে মারধর করা হয়।’
তিনি জানান, আটক ব্যক্তিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করতে প্রক্টরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। প্রথমে ফোনে সাড়া না পাওয়া গেলেও পরে নিরাপত্তাকর্মীদের মাধ্যমে যোগাযোগ সম্ভব হয়। এরপর প্রক্টরিয়াল বডির একজন প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে এসে অভিযুক্তকে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেন।
তবে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রথমে আটক ব্যক্তিকে হেফাজতে নিতে অনীহা প্রকাশ করে বলে অভিযোগ করেন সৌরভ। তার দাবি, আটক ব্যক্তিকে মারধর করা হয়েছে জানিয়ে পুলিশ আগে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলে। এতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন ক্ষুব্ধ হন। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে পুলিশ তাকে নিয়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন সৌরভ বলেন, ‘রেলস্টেশন এলাকায় শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। কিন্তু সেখানে, বিশেষ করে রাতের বেলায়, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে স্টেশন এলাকায় নিয়মিত টহল ও নিরাপত্তা নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি তৌহিদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন এলাকায় শিক্ষার্থী কিংবা বহিরাগত সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রক্টরিয়াল বডি ও নিরাপত্তা দপ্তরের। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি থাকায় নিরাপত্তাকর্মীর সংকট থাকতে পারে, তবে সেটি নিরাপত্তার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার পর প্রক্টরিয়াল বডির দ্রুত সাড়া না দেওয়ার বিষয়ে প্রশাসনের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। অভিযুক্তকে আদালতে সোপর্দ করা এবং পুলিশ যেন দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, সে বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হোসেন বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। বিষয়টি এখন পুলিশের অধীনে রয়েছে। তারা আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’
অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে এর আগেও নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রক্টর জানান, এ ধরনের কোনো অভিযোগ আগে তাদের কাছে আসেনি। অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হতো। এমনকি অভিযোগ ছাড়াও কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রশাসনের নজরে এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রেলস্টেশনের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘বিশেষ করে রাতে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার সময় স্টেশন এলাকায় কিছু ভাসমান মানুষের আনাগোনা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধে আজ থেকেই আমাদের টহল দলকে স্টেশনগুলোতে নজরদারি ও টহল জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমাদের কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’
আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি, আদালতে পাঠানো হয়েছে।’
আল আরাফ/রিফাত/
