বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাবিত ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও আর্থিক খাতের সংস্কারকে গুরুত্ব দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির মতে, দেশে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমে প্রায় ৭ শতাংশে নেমেছে, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি। একই সঙ্গে দেশের আর্থিক খাতের বিদ্যমান দুর্বলতা দূর করতে বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখার ওপরও জোর দিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন-চন্দ্র এসব কথা বলেন। এদিকে, থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠককে ঘিরে সংস্থা দুটির নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন প্রায় ৬০০ মানুষ। তাদের অভিযোগ, বড় উন্নয়ন প্রকল্প ও বিদেশি বিনিয়োগের সুবিধা বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পেলেও এর মূল্য দিতে হচ্ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে।
সোনালি জৈন-চন্দ্র বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে অর্থনীতির বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কারও বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ বর্তমানে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতি—এই তিন ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। সোনালি জৈন-চন্দ্র জানান, আগের কর্মসূচির আওতায় আর ঋণের কিস্তি না নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর গত
মে মাসে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ সংস্থাটির কাছে নতুন একটি কর্মসূচির অনুরোধ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। ওই সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সংস্কারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। আইএমএফের কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনায় উঠে আসা সংস্কারের বিষয়গুলো চলতি বছরের আর্টিকেল ফোর পরামর্শে দেওয়া সুপারিশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জুলাইয়ের সফরের পর থেকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইএমএফের নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। সোনালি জৈন-চন্দ্র বলেন, বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে সংস্থাটির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম শুরু করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে আইএমএফ আগ্রহী।
রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে : বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমে বর্তমানে প্রায় ৭ শতাংশে নেমেছে। এই অনুপাত বিশ্বের সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি। আইএমএফের মতে, সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করতে রাজস্ব আয় বাড়ানো জরুরি। এ জন্য রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন আনার পাশাপাশি আহরণ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কম রাজস্ব আহরণের কারণে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থায়ন এবং অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কার ও আয় বাড়ানোর উদ্যোগকে নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করার তাগিদ : বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, দেশের আর্থিক খাত অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে খাতটির সক্ষমতা বাড়ানো এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য সংস্কার কৌশল গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। আর্থিক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছে আইএমএফ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ধরে রাখার পরামর্শ : দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলা মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শুধু কঠোর মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়। এ জন্য আর্থিক খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের নীতির বিরুদ্ধে ৬০০ মানুষের বিক্ষোভ : এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক বৈঠককে ঘিরে সংস্থা দুটির নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন প্রায় ৬০০ মানুষ। বিক্ষোভকারীরা কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারের দিকে মিছিল নিয়ে গেলে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের নীতি বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পকে বেশি সুবিধা দিচ্ছে। অন্যদিকে এসব প্রকল্পে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে এবং সরকারি ঋণের বোঝা বাড়ছে। বিশেষ করে থাইল্যান্ডের ইস্টার্ন ইকোনমিক করিডরের মতো বড় প্রকল্প নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন তারা। বিক্ষোভকারীরা বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদের কাছে প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগ তুলে ধরতে চান। তাদের বক্তব্য, উন্নয়নের সুফল কারা পাচ্ছে এবং এর মূল্য কাদের দিতে হচ্ছে, সেই প্রশ্ন আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাওয়া উচিত। বিক্ষোভ চলাকালে পথচারীদের ব্যবহৃত একটি উড়ালসড়কে ব্যানার টাঙানোকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তি হয়।
