চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঢাকের বাদ্য, নাচ আর সিঁদুর খেলার আবেগঘন মুহূর্তে শেষ হলো বারঘরিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘বাইশ পুতুল’খ্যাত দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। বুধবার সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে বিদায়ের ক্ষণ নেমে আসে পূজাম-পে। রাতে মহানন্দা নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এ প্রাচীন দুর্গোৎসবের। আয়োজক কমিটির দাবি, এবার এ পূজার ৩২১তম বার্ষিকী। দীর্ঘদিন ধরে জেলার অন্যতম বৃহৎ ও প্রাচীন দুর্গাপূজা হিসেবে পরিচিত বারঘরিয়ার এ আয়োজন। শুধু জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকেই নয়, দূরদূরান্ত থেকেও শত শত পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থী ছুটে আসেন ‘বাইশ পুতুল’-এর প্রতিমা দেখতে। পূজাকে ঘিরে মন্দিরসংলগ্ন সড়কের পাশে বসে ঐতিহ্যবাহী মেলা। প্রতিমা দর্শন আর মেলায় ঘোরাঘুরিÑদুইয়ে মিলে বহু মানুষের দুর্গোৎসবের আনন্দ পূর্ণতা পায়। তবে দীর্ঘদিনের সেই আকর্ষণ থাকলেও এবার পূজাম-প ও মেলায় দর্শনার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল বলে জানিয়েছেন আয়োজক ও ব্যবসায়ীরা। প্রচলিত পূজার আয়োজনের তুলনায় এখানে একসঙ্গে ২২টি প্রতিমা স্থান পেয়েছে। আর এ কারণেই পূজাটি ‘বাইশ পুতুলের দুর্গাপূজা’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিমা বিন্যাসে সবার ওপরে রয়েছেন গঙ্গাদেবী। এর নিচে গাড়ির ওপর গলায় সাপ জড়ানো মহাদেব, তাঁর দুই পাশে নন্দী ও ভৃঙ্গী হিসেবে পরিচিত অনুচর, রাম ও লক্ষ্মণের প্রতিমা রয়েছে। এরপর কেন্দ্রে বিরাজ করছেন দেবী দুর্গা। পাশাপাশি রয়েছেন কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। তাঁদের বাহন হিসেবে রয়েছে ইঁদুর, ময়ূর, প্যাঁচা ও সাদা হাঁস। সব মিলিয়ে ২২টি প্রতিমার সমাহার এ পূজাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। ঠিক কবে, কার উদ্যোগে কিংবা কীভাবে বারঘরিয়ায় এ পূজার সূচনা হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে স্থানীয় জনশ্রুতি ও প্রচলিত ইতিহাসে উঠে এসেছে এক বিস্ময়কর কাহিনি।
১৯৮৭-২০০০ সাল পর্যন্ত পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী প্রণব কুমার পালের ভাষ্য অনুযায়ী, তিন শতাধিক বছর আগে গোমস্তাপুর উপজেলার চৌডালা ইউনিয়নের শুক্রবাড়ি গ্রামে ‘বাইশ পুতুলের’ দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো। কোনো এক সমস্যার কারণে সেখানকার পূজা উদ্যাপনকারীরা পূজার কাঠামো বা পাঠ মহানন্দা নদীতে ভাসিয়ে দেন। নদীর স্রোতে ভাসতে ভাসতে সেটি প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটার দূরে এসে ঠেকে বর্তমান বারঘরিয়া এলাকায়। জনশ্রুতি রয়েছে, শুক্রবাড়ির পূজার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি স্বপ্নে নির্দেশনা পানÑযেখানে পূজার কাঠামো এসে ঠেকেছে, সেখানেই এই পূজার আয়োজন করতে হবে। পরে শুক্রবাড়ির লোকজন বারঘরিয়ায় এসে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের পূজাটি আয়োজনের অনুরোধ জানান। মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য জমিও কিনে দেন তাঁরা। সেই থেকে বারঘরিয়ায় ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে এ প্রাচীন দুর্গাপূজা।
পূজা উদ্যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মৃণাল কান্তি পাল বলেন, নবমীর দিনে আমাদের ম-পে সাধারণত উপচে পড়া ভিড় থাকে। মানুষের আসা-যাওয়ার সময় অনেক কষ্ট করতে হয়। কিন্তু এবার সেই তুলনায় লোকসমাগম কম ছিল। তিনি আরও বলেন, মন্দিরের আয় খুবই কম, অথচ ব্যয় অনেক বেশি। ফলে পূজার খরচ মেটাতে আয়োজকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এবার পূজার দানবাক্সেও অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক কম দান জমা পড়েছে।
মেলায় নানা ধরনের মিষ্টি, খাবার ও বিভিন্ন পণ্যের পসরা নিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু দর্শনার্থী কম থাকায় এবার তাঁদের অনেকেই প্রত্যাশিত বিক্রি করতে পারেননি। অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম তরু বলেন, একসময় জেলা ও জেলার বাইরের হাজারো মানুষ এ পূজা দেখতে আসতেন। সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বহু বছর ধরে যাত্রাপালা ও নাটকের আয়োজন বন্ধ রয়েছে। মেলার বিস্তীর্ণ ফাঁকা জায়গাগুলোতে বাড়িঘর গড়ে ওঠায় মেলার পরিসরও সংকুচিত হয়েছে। সব মিলিয়ে আগের মতো জৌলুস আর চোখে পড়ে না। এবারও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল।