দক্ষিণাঞ্চলের খাল-বিল ও ছোট নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ এলাকায় বছরের দীর্ঘ সময় জমি পানিতে ডুবে থাকে। পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ি দোবরা এবং নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের অনেক এলাকায় বর্ষা মৌসুমে প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত পানি জমে থাকে। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে জমিতে সবজির চারা উৎপাদন ও চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে পানিকে বাধা না ভেবে চাষাবাদের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। কচুরিপানা, শ্যাওলা, দুলালিলতাসহ অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ দিয়ে পানির ওপর ভাসমান বেড তৈরি করে তাতে সবজির চারা উৎপাদন করছেন তারা। তুলনামূলক কম খরচে চারা উৎপাদন এবং জলাবদ্ধ জমি কাজে লাগিয়ে আয়ের সুযোগ থাকায় এ পদ্ধতি দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। একসময় যেসব জলজ উদ্ভিদকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হতো, সেগুলোই এখন ভাসমান কৃষির গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার অংশ।
এই ভাসমান কৃষির উপকরণ কেনাবেচাকে ঘিরেই জমে ওঠে নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটা হাট। শনিবার ও মঙ্গলবার বসা এই হাটে ভোরের আলো ফুটতেই নদীর বুকে সারি সারি নৌকায় শুরু হয় বেচাকেনা। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে বিক্রেতারা নৌকায় করে নিয়ে আসেন শ্যাওলা, কচুরিপানা, দুলালিলতাসহ অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ। এসব উপকরণ কিনতে এক নৌকা থেকে অন্য নৌকায় ঘুরে বেড়ান কৃষকেরা। দরদাম শেষে কেউ প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে নিজের গ্রামে ফিরে যান, আবার কেউ কেনেন নৌকাভর্তি জলজ উদ্ভিদ। এভাবেই শুরু হয় ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম।

হাটে শ্যাওলা বিক্রি করতে আসা ইব্রাহিম বলেন, মোল্লারহাট থেকে শ্যাওলা নিয়ে আসি। কুড়ি হিসেবে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করি। বেচাকেনা মোটামুটি ভালো। ভালো দিনে আট-নয় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়, বাজার খারাপ গেলে পাঁচ হাজার টাকার মতো হয়।
শ্যাওলা কিনতে আসা এক ক্রেতা জানান, ভাসমান বেড তৈরি করে সবজির চারা উৎপাদনের জন্যই তিনি শ্যাওলা কিনছেন।
কৃষকেরা হাট থেকে কচুরিপানা, শ্যাওলা ও প্রয়োজনীয় লতাপাতা কিনে নিয়ে যান নিজেদের এলাকায়। সেগুলো দিয়ে তৈরি করেন ভাসমান বেড। তবে বেডে চারা উৎপাদনের আগে শুরু হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যেখানে যুক্ত রয়েছেন গ্রামের বহু নারী।
ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের প্রাথমিক ধাপে নারীরা দুলালিলতা দিয়ে তৈরি করেন ‘ম্যাদা’। স্থানীয়ভাবে পাওয়া এই লতা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সাজিয়ে তৈরি করা হয় বীজ বপনের উপযোগী কাঠামো। এতে বেগুন, মরিচ, লাউ, করলা, মিষ্টিকুমড়া, শসাসহ বিভিন্ন সবজির বীজ বপন করা হয়। বীজ থেকে চারা গজানোর পর যত্নসহকারে সেগুলোর পরিচর্যা করা হয়। চারা কিছুটা বড় হলে তা ভাসমান বেডে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নিয়মিত পরিচর্যার পর চারা বিক্রির উপযোগী হয়ে ওঠে।
এই প্রাথমিক কাজের বড় একটি অংশ সামলান গ্রামের নারীরা। কেউ লতা সংগ্রহ করেন, কেউ ম্যাদা তৈরি করেন, আবার কেউ বীজ বপন ও অঙ্কুরিত চারার পরিচর্যা করেন। বাড়ির আশপাশে কিংবা জলাভূমির কাছে বসেই চলে তাদের কাজ। ভাসমান কৃষির এই প্রক্রিয়ায় নারীদের শ্রম গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের অনেকের আয় সীমিত।
নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের গগন গ্রামের নুরজাহান বেগম তাদেরই একজন। কৃষক জাকির হোসেনের স্ত্রী নুরজাহান বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে ২০০৫ সাল থেকে ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদনের কাজ করছেন। নিজের কাজের পাশাপাশি গ্রামের অসচ্ছল ও কর্মহীন নারীদেরও এ কাজে যুক্ত করেছেন তিনি। বর্তমানে তার উদ্যোগে কাজ করছেন প্রায় ১০ জন নারী।
নুরজাহান বেগম বলেন, আমি একজন নারী উদ্যোক্তা। ২০০৫ সাল থেকে এই কাজ করছি। অনেক পরিবার দুঃখ-কষ্টে আছে। আমি তাদের সামনে এগিয়ে নিতে চাই, কিন্তু পারছি না। সরকার যদি বিনা সুদে ঋণ দিত, তাহলে সামনে এগোতে পারতাম, আরও নারীদের কাজ করাতে পারতাম। ঘরে বসে থাকা নারীদের নিয়ে কাজ করতে চাই, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই।
কাজের ধরন ও পরিমাণ অনুযায়ী এ কাজে মজুরি নির্ধারিত হয়। স্থানীয়ভাবে প্রতি এক হাজার ম্যাদা তৈরি করে একজন নারী শ্রমিক পান প্রায় ১৫০ টাকা। দিনভর কাজ করেও অনেকের আয় থাকে ২০০ টাকার আশপাশে। ফলে সংসারের খরচ চালাতে তাদের হিমশিম খেতে হয়।
বলদিয়া গ্রামের নারী শ্রমিক রহিমা বেগম বলেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করি। সারা দিন এত পরিশ্রম করেও ২০০ টাকা আয় করতে অনেক কষ্ট হয়। নারীদের আর কোনো কাজ নেই, তাই এগুলোই করি। আমাদের ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে ভালো হতো। এক হাজার ম্যাদা বানিয়ে দেড়শ টাকা পাই। তাতে কি আর সংসার চলে।
স্থানীয় নারীরা জানান, আধুনিক পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন, ব্যবসা পরিচালনা ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেলে তাদের কাজের দক্ষতা বাড়বে। পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে ছোট পরিসরে কাজ করা অনেক নারী নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারবেন। এতে একদিকে তাদের আয় বাড়বে, অন্যদিকে গ্রামে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
ভাসমান বেডে চারার পরিচর্যা ও বিপণন
নারীদের হাতে বীজ থেকে চারা গজানোর প্রাথমিক কাজ শেষ হলে সেগুলো ভাসমান বেডে নিয়ে যাওয়া হয়। জলাভূমির ওপর কচুরিপানা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি এসব বেডে সারিবদ্ধভাবে বসানো হয় চারা। এরপর চলে নিয়মিত পরিচর্যা। কৃষকেরা চারায় প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ করেন, আগাছা ও লতা পরিষ্কার করেন এবং চারা বিক্রির উপযোগী করে তোলেন। ভাসমান এসব বেডে একসঙ্গে উৎপাদিত হয় বিভিন্ন জাতের সবজির হাজার হাজার চারা।

ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনকারী কৃষক লুৎফুর রহমান বলেন, এখানে সকাল ৬টায় আসি কাজ করতে। বেডে চারা রোপণ করি, ওষুধ দিই, লতা পরিষ্কার করি। এই জায়গার চারা ঢাকা যায়, খুলনা যায়, গোপালগঞ্জ, বরিশালসহ অনেক জায়গায় যাই। প্রতিবছর এখানে লাখ লাখ চারা উৎপাদন হয়। এই জায়গায় পেঁপে, লাউ, করলা, বেগুন, মরিচ, মিষ্টিকুমড়ার চারা উৎপাদন হয়। বিভিন্ন রকমের সবজির চারা প্রতি পিস তিন টাকা থেকে সাত টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
বেডে উৎপাদিত চারা বিক্রির জন্য কৃষকেরা বৈঠাকাটা ও আশপাশের বিভিন্ন হাটে নিয়ে আসেন। সেখান থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ চারা কিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করেন। পরে স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে এসব চারা পৌঁছে যায় কৃষকদের হাতে। এভাবে কয়েকটি পর্যায় পেরিয়ে ভাসমান বেডে উৎপাদিত চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সবজি চাষের সঙ্গে যুক্ত হয়।
পিরোজপুর পৌর শহরে সবজির চারা খুচরা বিক্রি করেন রফিক শেখ। তিনি বলেন, নাজিরপুরের ভাসমান বেডের চারা এনে এখানে বিক্রি করি। আমরা বিভিন্ন জাতের সবজির চারা ১০ থেকে ১৫ টাকা করে বিক্রি করি। ভাসমান বেড থেকে পাঁচ থেকে সাত টাকা করে প্রতি পিস কিনে আনি।
জাত, আকার, চাহিদা ও বাজারের ওপর নির্ভর করে চারার দাম কমবেশি হয়। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দামের এই পার্থক্য থেকে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ মেটানোর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের আয় হয়। ফলে চারা উৎপাদনকারী কৃষক, পাইকার, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও খুচরা বিক্রেতাকে নিয়ে এই কৃষিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
সম্ভাবনা ও চাহিদা
নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলার ভাসমান বেডে উৎপাদিত সবজির চারা এখন স্থানীয় বাজারের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হচ্ছে।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, নাজিরপুর এবং নেছারাবাদে ভাসমান বেডে চারা উৎপাদন হয়। উৎপাদিত সবজির চারা খুলনা, যশোর, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যাচ্ছে। এই পেশায় প্রায় ছয় হাজার কৃষক জড়িত। তাদের কৃষি অফিস থেকে সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মৌসুমে এ অঞ্চলে প্রায় এক কোটি বিভিন্ন প্রজাতির সবজির চারা উৎপাদিত হয়। এসব চারার আনুমানিক বিক্রয়মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। এই পেশার ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষও। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য জলজ উদ্ভিদ এবং পানিকে কাজে লাগিয়ে গড়ে ওঠা এই কৃষিব্যবস্থা দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
তবে এ খাতের সম্ভাবনা আরও বাড়াতে আধুনিক চাষপদ্ধতি, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ভাসমান কৃষির প্রাথমিক ধাপে কাজ করা নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করা গেলে তাদের শ্রমের মূল্য বাড়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার পথও তৈরি হতে পারে।
আরএআর
