কালবেলা · রাজনীতি
মমেকে ব্যাপক অব্যবস্থাপনা: সংস্কার ও জনবল নিয়োগে সময়সীমা বেঁধে দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
২৪/১০/২০২৬

ধারণক্ষমতা এক হাজার রোগীর, অথচ প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন তিন থেকে চার হাজার। এর মধ্যে দায়িত্বে থেকেও অনুপস্থিত চিকিৎসক, অপরিচ্ছন্ন বাথরুম, সেবার সীমাবদ্ধতা আর প্রয়োজনীয় জনবলের সংকট। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ জেলার তিনটি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে উঠে এসেছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার এমনই বেহাল চিত্র। অনিয়মের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, অবকাঠামো সংস্কার ও জনবল নিয়োগের নির্দেশ দিয়ে এসব সমস্যা সমাধানে সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকালে ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন শেষে দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরিদর্শনে চিকিৎসকদের সময়মতো উপস্থিত না থাকা, রোগীর অতিরিক্ত চাপ, বাথরুমের দুরবস্থা এবং চিকিৎসাসেবার নানা সীমাবদ্ধতা তার নজরে আসে। উপজেলা পর্যায়ে অবকাঠামোগত সমস্যা ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু না হওয়ার বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন তিনি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কয়েকজন চিকিৎসককে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, তাদের ডিউটি রোস্টার সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কতজন চিকিৎসক অনুপস্থিত ছিলেন, তা যাচাই করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ কেউ সকাল ১০টা কিংবা পৌনে ১১টায় হাসপাতালে এসেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরে স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনা, লুটপাট ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। এসব সমস্যা একদিনে কিংবা এক মাসে দূর করা সম্ভব নয়। তবে স্বাস্থ্যসেবায় নতুন গতি ফিরিয়ে এনে সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
হাসপাতালটির ওপর রোগীর অতিরিক্ত চাপকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিদিন এক হাজার রোগীর ধারণক্ষমতার বিপরীতে এখানে তিন থেকে চার হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। ময়মনসিংহ ছাড়াও আশপাশের আট থেকে দশটি জেলার রোগীরা এ হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। ফলে চিকিৎসক, শয্যা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছে।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় সেবার মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন চিকিৎসক যেখানে ৫০ জন রোগী দেখার সক্ষমতা রাখেন, সেখানে তাকে ২৫০ থেকে ৩০০ জন রোগী দেখতে হলে স্বাভাবিকভাবেই চাপ তৈরি হয়। তবে এ কারণে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উপেক্ষা করা হবে না। কোনো ধরনের গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিদর্শনে হাসপাতালের বাথরুমগুলোর পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি দেখতে পান মন্ত্রী। কয়েকটি বাথরুম ভালো অবস্থায় থাকলেও বেশ কয়েকটির অবস্থা অত্যন্ত খারাপ বলে জানান তিনি। সেগুলো পরিষ্কার ও প্রয়োজনীয় মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালের খাবারের মান নিয়েও কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, নিজে খাবার খেয়ে দেখেছেন এবং অন্যান্য অনেক হাসপাতালের তুলনায় এখানকার খাবারের মান ভালো।
ডেঙ্গু ওয়ার্ড পরিদর্শন করে মশারির ব্যবস্থায় মোটামুটি সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। তবে কিছু রোগী হাসপাতালের সেবাব্যবস্থা সম্পর্কে যথাযথ তথ্য না পাওয়ায় বাইরে থেকে রক্ত পরীক্ষা করিয়েছেন বলে জানান। রোগীদের প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া এবং সেবার ক্ষেত্রে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানান মন্ত্রী।
স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন ও চিকিৎসাসামগ্রী সংগ্রহে একাধিক পরিকল্পনার কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র কেনার প্রক্রিয়া চলছে। কিছু ক্ষেত্রে ঋণপত্র বা এলসি খোলা হয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কার শেষ করে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার দরপত্র আহ্বায়ের উদ্যোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ক্যানসার চিকিৎসার আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন এবং পাঁচটি রোবোটিক সার্জারি ব্যবস্থা আনার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী।
জনবল সংকট মোকাবিলায় পাঁচ হাজার নার্স নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। স্বাভাবিক প্রসবের হার বাড়াতে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক নিয়োগ ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে কাজ চলছে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে ‘ফ্যামিলি ওয়েলবিয়িং সেন্টার’-এ রূপান্তর করে সেখানে সার্বক্ষণিক ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী।
সরকারি হাসপাতালের আশপাশে থাকা বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে রোগী নিয়ে যাওয়ার জন্য দালাল চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগের কথাও তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার নামে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন ক্লিনিক স্থাপনের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান ক্লিনিকগুলোও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করলে কিংবা রোগীদের যথাযথ সেবা না দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
সাংবাদিকদের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, বিভিন্ন অনিয়ম ও ভুলত্রুটি তুলে ধরার মাধ্যমে সাংবাদিকেরা সংশোধনের সুযোগ তৈরি করছেন। ভালো কাজের প্রশংসা এবং খারাপ কাজের সমালোচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের বক্তব্য ও প্রতিবেদন থেকে সরকার সংশোধিত হতে চায়।
তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামগ্রিক অবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও সেখানে এখনো ইনডোর সেবা চালু হয়নি। আগামী সপ্তাহের মধ্যে চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে এ সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সক্ষমতা ১০০ শয্যা থেকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি এসব হাসপাতালে ডায়ালাইসিস, ফিজিওথেরাপি, মাতৃসেবা এবং শিশুদের জন্য পৃথক শয্যার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাথরুম মেরামত, নালা-লাইন পরিষ্কার ও প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ আগামী দুই দিনের মধ্যে শেষ করতে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন মন্ত্রী। কাজের অগ্রগতি ভিডিওর মাধ্যমে দেখানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
পরিদর্শনে উঠে আসা সমস্যাগুলো সমাধানে জনবল নিয়োগ, শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি, অবকাঠামো সংস্কার ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংযোজনের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে হলে ঘোষিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করা, চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং উপজেলা পর্যায়ে কার্যকর চিকিৎসাসেবা চালু করা জরুরি।
বিশেষ করে আশপাশের জেলার রোগীদের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর নির্ভরতা কমাতে উপজেলা হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখার বিষয়, পরিদর্শনে চিহ্নিত সমস্যাগুলোর কতটা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমাধান হয় এবং ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে রোগীদের সেবায় কতটা পরিবর্তন আনে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗