চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি ইজারার চেয়ে অতিরিক্ত অংশ দখল করে কারখানা পরিচালনা এবং সরকারি ১ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার ১১৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুব উর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
তিনি চট্টগ্রাম-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং গ্যাসমিন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুদক চট্টগ্রামের উপসহকারী পরিচালক তাপছির বিল্লাহ বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪২৭ ও ৪৪৭ ধারায় মামলাটি করেছেন। চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন মামলার বিষয়টি ঢাকা পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রেলওয়ের কাছ থেকে শূন্য দশমিক ৭৪ একর জমি ইজারা নিলেও মীরসরাইয়ের পশ্চিম হিঙ্গুলী মৌজায় সংস্থাটির ২ দশমিক ২৮ একর জমি তার দখলে ছিল। ইজারার অতিরিক্ত ১ দশমিক ৫৪ একর জমি অবৈধভাবে দখল করে ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি, রেকর্ডে পুকুর হিসেবে থাকা জমি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ভরাট করে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, মাহবুব উর রহমানের বিরুদ্ধে রেলওয়ের জমি অবৈধভাবে ইজারা নিয়ে কারখানা নির্মাণের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ এ বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তের পর অভিযোগটি অনুসন্ধানের জন্য নথিভুক্ত করা হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, মীরসরাই উপজেলার পশ্চিম হিঙ্গুলী মৌজার বিএস ৫১১৯ দাগে ৭ দশমিক ৫৯ একর জমি রেল রাস্তা এবং বিএস ৫১২০ দাগে শূন্য দশমিক ৪২ একর জমি পুকুর হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়ের নামে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে বিএস ৫১১৯ দাগের ১ দশমিক ৭২ একর জমি ২০০৭ সালে একরামুল হক নামের এক ব্যক্তিকে কৃষি লাইসেন্স দেওয়া হয়। পরের বছর বিএস ৫১২০ দাগের শূন্য দশমিক ৪১ একর জমি তাকে মৎস্য চাষের জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত লাইসেন্স দুটি নবায়ন করা হয়েছিল।
এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পরিবেশবান্ধব সিমেন্ট, বালি ও হলো ব্লক কারখানা স্থাপনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের ৩ দশমিক ৭৫৬৪ একর জমি দীর্ঘমেয়াদি ইজারা চেয়ে আবেদন করেন মাহবুব উর রহমান।
ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রেলওয়ের তৎকালীন সহকারী ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাং অহিদুন্নবী ২৬ ডিসেম্বর সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেন। এতে পশ্চিম হিঙ্গুলী মৌজার তিনটি দাগে মোট ৩৪২ দশমিক ৮০ শতক রেলভূমি গ্যাসমিন লিমিটেডের দখলে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইজারা মঞ্জুর হওয়ার আগেই সেখানে ৬ হাজার ৪৮৯ বর্গফুটের একটি আধাপাকা কারখানা নির্মাণ করা হয়েছিল। পাশাপাশি, ৯৯০ বর্গফুট জায়গায় দ্বিতল পাকা অফিস ভবন নির্মাণের কাজ চলছিল। ওই দখলীয় জমির মধ্যে অন্য ব্যক্তির নামে কৃষি ও মৎস্যচাষের লাইসেন্স থাকা জমিও ছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে, রেলওয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটির সভা ও তৎকালীন রেলপথমন্ত্রীর নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১২ মার্চ গ্যাসমিন লিমিটেডের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের চুক্তি হয়। এতে পশ্চিম হিঙ্গুলী মৌজার বিএস ৫১১৯ দাগের ৩২ হাজার ১৩০ বর্গফুট বা শূন্য দশমিক ৭৪ একর জমি অস্থায়ীভাবে এবং বার্ষিক নবায়নের ভিত্তিতে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের লাইসেন্স দেওয়া হয়।
তবে, মীরসরাই উপজেলা ভূমি অফিসের সরেজমিন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএস ৫১১৯ ও ৫১২০ দাগে মোট ২ দশমিক ২৮ একর জমি মাহবুব উর রহমানের দখলে ছিল। এর মধ্যে কারখানা, দ্বিতল অফিস ভবন, মসজিদ, অজুখানা, নির্মিত ব্লক শুকানো ও সংরক্ষণের মাঠ এবং পানির ট্যাংকি রয়েছে। অথচ রেলওয়ে থেকে ইজারা নেওয়া জমির পরিমাণ ছিল শূন্য দশমিক ৭৪ একর।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, বিএস ৫১২০ দাগে রেকর্ডভুক্ত পুকুরের অস্তিত্ব সরেজমিনে পাওয়া যায়নি। পুকুর ভরাট কিংবা জমির শ্রেণি পরিবর্তনের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনসংক্রান্ত কোনো নথিও অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে আসামিও কোনো নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ২ দশমিক ২৮ একর জমির বিপরীতে ভ্যাট ও আয়করসহ মোট ইজারা বাবদ পাওনা ছিল ১ কোটি ৫৭ লাখ ৩১ হাজার ৬৪৬ টাকা। বিপরীতে শূন্য দশমিক ৭৪ একর জমির জন্য তিনি পরিশোধ করেছেন ৪৪ লাখ ৯৫ হাজার ৫২৯ টাকা। দুই অঙ্কের পার্থক্য ১ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার ১১৭ টাকা। এই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এজাহারে বলা হয়েছে, ইজারাপ্রাপ্ত জমির অতিরিক্ত ১৫৪ শতক জমি অবৈধভাবে দখল করে ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করার মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ে তথা সরকারের আর্থিক ক্ষতি করেছেন মাহবুব উর রহমান। পাশাপাশি অনুমতি ছাড়া পুকুর ভরাট, জমির শ্রেণি পরিবর্তন এবং ইজারা পাওয়ার আগেই সরকারি জমিতে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এমআর/জেআই
