চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চীন থেকে আমদানি করা রানা ফার্ম অ্যান্ড হ্যাচারী লিমিটেডের একটি যন্ত্রপাতির চালান খালাসে শুল্কায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চালানটির পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, এইচএস কোড এবং রেয়াতি শুল্কসুবিধা গ্রহণের বৈধতা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।
সংশ্লিষ্ট নথির তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের কালাপাগলা এলাকার রানা ফার্ম অ্যান্ড হ্যাচারী লিমিটেড চালানটির আমদানিকারক। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার ৬০১, শেখ মুজিব রোডের চতুর্থ তলায় অবস্থিত ‘ডায়নামিক ফ্রেইড সিস্টেম’ নামের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট গত ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে। বিল অব এন্ট্রির নম্বর সি-১২২৫৮১৬।
অভিযোগ রয়েছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির আওতায় রেয়াতি সুবিধা নিয়ে চালানটি খালাস করা হয়েছে। এতে প্রাপ্য শুল্ক-কর আদায়ে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাপ্ত নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, বিন নম্বর ০০৩৫৪৪৩৯২-০১০৪-এর বিপরীতে এমভি ‘এমসিসি ইয়াগন’ জাহাজে (রোটেশন নম্বর ২০২৬/৪১০৯) চীন থেকে চালানটি আনা হয়। এর ঘোষিত মূল্য ৫ লাখ ৬ হাজার ৬৮২ মার্কিন ডলার। বিল অব এন্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, চালানটিতে ২ হাজার প্যাকেট পণ্য রয়েছে, যার মোট ওজন ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৬ কেজি।
পণ্যের ইনভয়েসে ‘বিএনসিএম ফর পোলট্রি ফার্ম (লেয়ার হাউস) (প্ল্যান্ট)’ উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, চালানটি মূলধনী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করে এসআরও নম্বর ১৯১-আইন/২০২৫/১৩/কাস্টমস, তারিখ ২৯ মে ২০২৫-এর আওতায় রেয়াতি সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চালানটির পণ্যের ধরন ও প্রকৃত ব্যবহার বিবেচনায় নিবন্ধিত হাঁস-মুরগির খামারের উপকরণ আমদানির জন্য প্রযোজ্য রেয়াতি সুবিধার এসআরও নম্বর ২৪৪-আইন/২০২৬/৭৪/কাস্টমস, তারিখ ৩০ জুন ২০২৬-এর প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করা প্রয়োজন। পণ্যের প্রকৃত শ্রেণিবিন্যাস, ঘোষিত এইচএস কোড এবং সংশ্লিষ্ট এসআরওর শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য আমদানি-সংক্রান্ত নথি, পণ্যের কারিগরি বিবরণ ও শুল্কায়ন আদেশ পরীক্ষা করা জরুরি।
শুল্কায়ন নিয়ে প্রশ্ন, তদন্তের দাবি
অভিযোগে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের ডেপুটি কমিশনার মো. তারেক মাহমুদের নাম উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চালানটির বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন। তবে শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার এবং কোনো অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. তারেক মাহমুদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি চালানটি সম্পর্কে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান রানা ফার্ম অ্যান্ড হ্যাচারী লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল রানার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ডায়নামিক ফ্রেইড সিস্টেমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানে আলম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমার কাস্টমস জেটি সরকার আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।’
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি ও কাস্টমস জেটি সরকার তাপস মজুমদার বলেন, ‘চালানটি সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। আমদানিকারকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী যথাযথ নিয়ম মেনে খালাস করেছি। বাকি বিষয়গুলো আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও কাস্টমস হাউস কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।’
নথি যাচাইয়ে বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র
বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, চালানটির আমদানি ঘোষণা, এইচএস কোড নির্ধারণ, প্রযোজ্য এসআরওর শর্ত, শুল্কায়ন আদেশ এবং আদায়কৃত শুল্ক-কর পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে পণ্যের কারিগরি বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহার সরেজমিনে যাচাই করে প্রকৃত শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণ করা যেতে পারে।
তাঁদের দাবি, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করলে চালানটির শুল্কায়নে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি কত এবং এর সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হতে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে বলে মনে করছেন ব্যবহারকারীরা।
The post চট্টগ্রাম বন্দরে রানা ফার্মের চালান খালাসে শুল্কায়ন নিয়ে প্রশ্ন! appeared first on বাংলাধারা.
