The Sangbad · সাধারণ
শিশুর প্রথম বিদ্যালয় পরিবার
১৮/১০/২০২৬

একটি শিশু মায়ের মুখে শুনল, “সব সময় সত্য কথা বলবে।” কিছুক্ষণ পর বাবার ফোন বেজে উঠল। ওপাশের মানুষটি বাবাকে চাইলে বাবা সন্তানকে বললেন, “বলবে, বাবা বাসায় নেই।” শিশুটি কোনো প্রশ্ন করল না। কিন্তু সে একটি শিক্ষা পেল। অন্যদিকে, আরেকটি পরিবারে বাবা ভুল করে কারও কাছ থেকে বেশি টাকা নিয়ে ফেললেন। ভুল বুঝতে পেরে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা ফেরত দিলেন। এখানেও কোনো বক্তৃতা হলো না। কিন্তু শিশুটি সততার একটি বাস্তব রূপ দেখল। এই দুই দৃশ্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে শিশুর শিক্ষার এক গভীর সত্য। আমরা সন্তানকে যা বলি, তার চেয়ে সে আমাদের দেখে যা শেখে, তার প্রভাব অনেক বেশি স্থায়ী হতে পারে।এই কারণেই ঘরের ভেতরে সেরা গবেষণাগার। গবেষণাগার শুধু যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজানো কোনো কক্ষ নয়। যেখানে পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা, ভুল, সংশোধন ও ফলাফলের মধ্য দিয়ে শেখা হয়, সেটিও এক ধরনের গবেষণাগার। শিশুর ঘর ঠিক তেমনই একটি জায়গা। সেখানে প্রতিদিন তার ভাষা, আচরণ, চিন্তা, মূল্যবোধ ও সম্পর্কের ধারণা তৈরি হচ্ছে। বাবা-মায়ের কথাবার্তা, পারস্পরিক সম্পর্ক, অন্যের সঙ্গে আচরণ, ভুলের প্রতি প্রতিক্রিয়া এবং দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত শিশুর জন্য নীরব পাঠ হয়ে উঠছে।শিশু জন্মের পর প্রথমে বই পড়ে না, কোনো নৈতিকতার বক্তৃতাও শোনে না। সে মানুষ দেখে। সে দেখে বাবা রাগলে কী করেন, মা বিপদে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান, কেউ ভুল করলে পরিবার কীভাবে আচরণ করে, অতিথিকে কীভাবে গ্রহণ করা হয়, দুর্বল অবস্থানের মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হয়। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই ধীরে ধীরে তার আচরণের কাঠামো তৈরি হয়। তাই শিশুর চরিত্র গঠনের সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষা অনেক সময় কথায় নয়, পরিবেশে।আমরা সন্তানকে বলি, “বড়দের সম্মান করবে।” কিন্তু সে যদি দেখে পরিবারের বড়রা একে অন্যের সঙ্গে অসম্মানজনক ভাষায় কথা বলছেন, তাহলে কথার চেয়ে দৃশ্যটাই তার কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। আমরা বলি, “সব মানুষকে সম্মান করতে হবে।” অথচ বাড়ির সহায়ক কর্মী বা কোনো সেবাদানকারী মানুষের সঙ্গে যদি অবজ্ঞার আচরণ করা হয়, তাহলে শিশুর কাছে সমতার ধারণা দুর্বল হয়ে যায়। আবার বাবা যদি দোকানদারের দেওয়া বাড়তি টাকা ফিরিয়ে দেন, মা যদি অসুস্থ প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ান কিংবা পরিবারের কেউ নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান, তাহলে শিশুর সামনে মূল্যবোধের একটি জীবন্ত উদাহরণ তৈরি হয়।এখানেই পরিবারের অদৃশ্য শিক্ষাক্রমের গুরুত্ব। বিদ্যালয়ে কোন শ্রেণিতে কোন বিষয় পড়ানো হবে, তার একটি নির্ধারিত কাঠামো থাকে। পরিবারের শিক্ষাক্রমের কোনো বই নেই, কিন্তু তার প্রভাব সর্বত্র। বাবা-মায়ের পারস্পরিক আচরণ থেকে শিশু সম্পর্কের ভাষা শেখে। মতের অমিল কীভাবে সামলানো হয়, তা থেকে বিরোধ সমাধানের কৌশল শেখে। কেউ ভুল করলে তাকে অপমান করা হয়, নাকি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়, তা থেকে নিজের ভুলের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। এমনকি রাস্তায় নিয়ম মানা, লাইনে দাঁড়ানো, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা কিংবা অপ্রয়োজনীয় অপচয় না করাও তার নাগরিক ও সামাজিক শিক্ষার অংশ হয়ে ওঠে।একটি শিশুর হাতে জীবনের প্রথম বড় শিক্ষা আসে খুব সাধারণ ঘটনা থেকে। ধরুন, সে অসাবধানতাবশত একটি গ্লাস ভেঙে ফেলেছে। বাবা যদি রেগে গিয়ে বলেন, “তুমি কোনো কাজই ঠিকমতো করতে পারো না”, তাহলে শিশুটি হয়তো শিখবে, ভুল করলে সত্য গোপন করতে হয়। কিন্তু বাবা যদি বলেন, “গ্লাস ভেঙেছে, এটা ঠিক হয়নি। তবে তুমি সত্যি বলেছ। এখন আমরা পরিষ্কার করি এবং পরেরবার কীভাবে সাবধান হওয়া যায়, দেখি”, তাহলে একই ঘটনা দায়িত্ববোধের শিক্ষায় পরিণত হয়। শিশুকে ভুলহীন মানুষ বানানো সম্ভব নয়; কিন্তু ভুল হলে সত্য বলা, দায়িত্ব নেওয়া এবং সংশোধন করার অভ্যাস শেখানো সম্ভব।শিক্ষার এই সুযোগ শুধু ভুলের মুহূর্তেই আসে না। দৈনন্দিন জীবনও শেখার অসংখ্য উপকরণ বহন করে। বাজারে গিয়ে পণ্যের দাম তুলনা করা থেকে গণিত ও অর্থের মূল্য শেখানো যায়। পরিবারের খরচের ছোটখাটো পরিকল্পনায় সন্তানকে যুক্ত করলে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। রান্নার সময় খাবারের পরিবর্তন নিয়ে কথা বললে বিজ্ঞান জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়। গাছের পরিচর্যা থেকে পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি হতে পারে। পরিবারের কোনো ছোট সিদ্ধান্তে সন্তানের মতামত জানতে চাইলে সে যুক্তি দিয়ে নিজের কথা বলতে এবং অন্যের মত শুনতে শেখে।এভাবে শিক্ষা বইয়ের পাতা থেকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়। আর এই সংযোগ তৈরি করার সবচেয়ে স্বাভাবিক জায়গা হলো পরিবার।তবে বর্তমান সময়ে ঘরের শিক্ষার সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পর্দানির্ভর জীবন। বাবা মুঠোফোনে, মা মুঠোফোনে, সন্তানও মুঠোফোনে। তারপর অভিযোগ ওঠে, “বাচ্চা বই পড়ে না।” শিশুকে বই পড়তে বলার আগে তাকে বই পড়ার পরিবেশ দিতে হবে। পরিবারের বড়রা যদি নিয়মিত বই পড়েন, সপ্তাহে কিছু সময় সবাই মিলে পড়া নিয়ে আলোচনা করেন, তাহলে বই শিশুর কাছে উপদেশের বিষয় না হয়ে পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠবে। একইভাবে সন্তানকে মুঠোফোন ব্যবহারে সংযম শেখাতে হলে বড়দের নিজেদের আচরণেও সেই সংযম দেখাতে হবে।পরিবারে মতের অমিলও শিশুর জন্য শিক্ষার সুযোগ। বাবা ও মায়ের মধ্যে মতভেদ হতেই পারে। কিন্তু সেই মতভেদ যদি অপমান ও চিৎকারে পরিণত হয়, শিশু শিখবে, বিরোধ মানেই সংঘাত। আর যদি যুক্তি, শ্রবণ ও সমঝোতার মাধ্যমে তা সমাধান হয়, তাহলে সে বুঝবে, ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং মতের অমিলের মধ্যেও সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা করা যায়। একইভাবে বাবা যদি সন্তানের কাছে নিজের ভুল স্বীকার করেন, তাহলে তিনি ছোট হন না। বরং সন্তান শেখে, ভুল স্বীকার করার জন্য বয়স বা অবস্থান কোনো বাধা নয়।এ ক্ষেত্রে অভিভাবকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে ভালো মানুষ হওয়ার উপদেশ দেওয়া সহজ, কিন্তু নিজের আচরণকে সেই শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা কঠিন। অথচ শিশুর সামনে নিখুঁত হওয়ার অভিনয়ও প্রয়োজন নেই। বরং নিজের ভুল স্বীকার করা, প্রয়োজনে ক্ষমা চাওয়া, কথা রাখার চেষ্টা করা এবং অন্যের প্রতি সম্মান দেখানোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষা।আমরা সন্তানের ফলাফল নিয়ে অনেক উদ্বিগ্ন থাকি। পরীক্ষায় কত নম্বর পেল, কোন বিষয়ে দুর্বল, কোথায় ভর্তি হবে, ভবিষ্যতে কী করবে—এসব নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন প্রায়ই বাদ পড়ে যায়। সে কি ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করতে পারে? নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে? অন্যের কথা শুনতে পারে? দুর্বল কাউকে সাহায্য করতে পারে? নিজের সুবিধার বাইরে অন্যের প্রয়োজন বুঝতে পারে? এসব দক্ষতা ও মূল্যবোধ শুধু পাঠ্যবই থেকে আসে না। এগুলোর ভিত্তি তৈরি হয় পরিবারে।এ কারণেই বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে একটি সেতু প্রয়োজন। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে সহযোগিতা, সততা, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার কথা বলবেন, আর পরিবারে তার বাস্তব অনুশীলনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বিদ্যালয় শিশুকে দায়িত্বশীল হতে শেখালে ঘরেও তাকে বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব দিতে হবে। বিদ্যালয় অন্যের মতামতকে সম্মান করতে শেখালে পরিবারেও তার কথা মন দিয়ে শুনতে হবে। শিক্ষা তখনই গভীর হয়, যখন শ্রেণিকক্ষের মূল্যবোধ জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়।আমরা সন্তানের জন্য ভালো বিদ্যালয় চাই, দক্ষ শিক্ষক চাই, উন্নত বই চাই, প্রযুক্তি চাই। এসব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার সঙ্গে একটি সুস্থ পারিবারিক পরিবেশও প্রয়োজন। কারণ শিশু প্রতিদিন শুধু পাঠ্যবই পড়ে না, সে তার চারপাশের মানুষকেও পড়ে। আমাদের আচরণ, ভাষা, সম্পর্ক ও সিদ্ধান্ত তার কাছে প্রতিদিনের বাস্তব পাঠ।তাই সন্তানকে বদলানোর আগে ঘরের পরিবেশের দিকে তাকানো দরকার। তাকে সত্যবাদী হওয়ার কথা বলার আগে আমরা সত্য বলছি কি না, তাকে সম্মান শেখানোর আগে আমরা অন্যকে সম্মান করছি কি না, তাকে দায়িত্বশীল হতে বলার আগে আমরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করছি কি না—সেই প্রশ্নগুলো নিজেদের কাছেই করতে হবে।ঘরকে তাই শুধু খাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম ও বিনোদনের জায়গা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে পারে প্রশ্ন করার জায়গা, বই পড়ার জায়গা, আলোচনা করার জায়গা, ভুল থেকে শেখার জায়গা এবং মূল্যবোধ চর্চার জায়গা। বিদ্যালয়ের গবেষণাগারে শিশু বিজ্ঞান পরীক্ষা করে, কিন্তু ঘরের গবেষণাগারে সে জীবন পরীক্ষা করে।এই পরীক্ষার উপকরণ আমরা প্রতিদিন তার সামনে রাখছি—আমাদের কথায়, কাজে, আচরণে, সম্পর্কের ধরনে। আমরা তাকে যে পৃথিবী দেখাই, সে সেই পৃথিবী থেকেই নিজের পৃথিবী বানাতে শেখে।তাই শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ার কাজ শুধু বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। তার শুরু হয় ঘরে। বাবা-মায়ের প্রতিদিনের আচরণ, পরিবারের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ছোট ছোট সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় তার নৈতিক বোধের ভিত।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ। আমরা সন্তানকে কেমন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই, তার আগে কি আমরা তার সামনে সেই মানুষটির একটি জীবন্ত উদাহরণ হতে পারছি?কারণ শিশুর প্রথম বিদ্যালয় তার ঘর, প্রথম শিক্ষক তার পরিবার এবং সবচেয়ে শক্তিশালী পাঠ্যপুস্তক তার বাবা-মায়ের প্রতিদিনের আচরণ।ঘরের ভেতরে যে গবেষণাগার প্রতিদিন চলছে, সেখানে শুধু একটি শিশুর ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছে না। তৈরি হচ্ছে আগামী দিনের সমাজের চরিত্রও।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়, ময়মনসিংহ]
মূল প্রতিবেদনে যান ↗