গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ক্বারিউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার শিক্ষক মো. মোসলেম উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে; এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর, শিক্ষক-কর্মচারীদের মারধর, ১৭ লাখ টাকা ও পাঁচটি মুঠোফোন লুটের পাল্টা অভিযোগ উঠেছে, পাশাপাশি সংবাদ প্রকাশের জেরে এক সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ক্বারিউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার শিক্ষক মো. মোসলেম উদ্দিনকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর, শিক্ষক-কর্মচারীদের মারধর এবং নগদ ১৭ লাখ টাকা ও পাঁচটি মুঠোফোন লুটের পাল্টা অভিযোগ উঠেছে। দুই পক্ষের অভিযোগ ঘিরে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন আউচপাড়া এলাকার শফিউদ্দিন রোডে অবস্থিত মাদ্রাসাটিতে গত ১৯ অক্টোবর সকালে প্রথম শ্রেণির ওই ছাত্রীর সঙ্গে যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করে তার পরিবার। শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমি বাদী হয়ে ২২ অক্টোবর টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলা করেন। মামলার পর অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
শিশুর পরিবারের অভিযোগ
শিশুটির পরিবারের দাবি, ঘটনার পর থেকে সে মাদ্রাসায় যেতে চাইছিল না। প্রথমে বিষয়টি কাউকে না জানালেও পরে মা-বাবার কাছে ঘটনার কথা প্রকাশ করে। পরিবারের অভিযোগ, ঘটনা জানালে তাকে মারধরের ভয় দেখানো হয়েছিল। এ কারণে শিশুটি ভয়ে বিষয়টি গোপন রেখেছিল।
পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে পরিচিত মো. মোসলেম উদ্দিন শিশুটির সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করেন। বিষয়টি জানার পর শিশুটির বাবা মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের কাছে ঘটনার বিষয়ে জানতে চান। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় লোকজন সেখানে জড়ো হন এবং একপর্যায়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর করেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফ হোসেন জানান, শিশুটির বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তিনি ঘটনাটিকে দুঃখজনক উল্লেখ করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
শিশুর পরিবারের মামলার পাশাপাশি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও পৃথক অভিযোগ করেছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, ঘটনার দিন একদল লোক মাদ্রাসায় প্রবেশ করে অধ্যক্ষের কক্ষে ভাঙচুর চালায় এবং শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারীদের মারধর করে। এ সময় নগদ প্রায় ১৭ লাখ টাকা ও পাঁচটি মুঠোফোন নিয়ে যাওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মাওলানা ক্বারী মো. আলমাছ হোসেন গাজীপুরী জানান, জমি কেনার জন্য রাখা নগদ টাকা প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে ছিল। তাঁর অভিযোগ, হামলাকারীরা কার্যালয়ের কাচ ও বৈদ্যুতিক বোর্ড ভাঙচুর করে এবং শিক্ষক মোসলেম উদ্দিনসহ কয়েকজনকে মারধর করে। বাধা দিতে গেলে অন্য শিক্ষক-কর্মচারীরাও আক্রান্ত হন বলে তিনি দাবি করেন। ঘটনার ভিডিওচিত্র মাদ্রাসার সিসিটিভি ক্যামেরায় সংরক্ষিত রয়েছে বলেও তাঁর বক্তব্য।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিশুটির পরিবারের করা মামলার অভিযোগও আইনগত প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষভাবে তদন্তের বিষয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবাদ, গ্রেপ্তারের দাবি
মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও শিক্ষক-কর্মচারীদের মারধরের প্রতিবাদে শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে প্রতিষ্ঠানের সামনে সংবাদ সম্মেলন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এতে মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মাওলানা আলমাছ হোসেন গাজীপুরীসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তবে অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে মারধর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর কিংবা অর্থ লুটের ঘটনা ঘটলে সেসব অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাঁরা হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। এ বিষয়ে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরবর্তী কর্মসূচি দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা।
এদিকে, এ ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর দৈনিক নয়া দিগন্তের গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি মো. আজিজুল হককে মোবাইল ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সাংবাদিকের দাবি, ঘটনার দুই পক্ষের বক্তব্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশের কারণে তাঁকে গালিগালাজ ও দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি নিজের পেশাগত নিরাপত্তা চেয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগের সঙ্গে শাহজালাল রুমি ও ইসমাইল হোসেন রানার নাম উল্লেখ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তবে হুমকির অভিযোগ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য এ বিষয়ে পাওয়া যায়নি।
টঙ্গীর এ ঘটনা শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং অভিযোগের পর আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঝুঁকি-তিনটি বিষয় সামনে এনেছে। শিশুটির অভিযোগ, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের হামলা ও লুটপাটের দাবি এবং সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ-প্রতিটি বিষয় পৃথকভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
