ফিফার অন্দরমহলে জমে থাকা ক্ষোভ প্রশমনে ক্ষমা চাইলেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো! বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার গভর্নিং কাউন্সিলের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে নিজের সমালোচকদের কাছে ভুল স্বীকার করে ঐক্যের আহ্বানও জানিয়েছেন ফিফা সভাপতি। কিন্তু ক্ষমা চাইলেও বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারেননি তিনি। ফলে সাড়ে তিন ঘণ্টার বৈঠক শেষে সংকটের অবসানের বদলে ফিফার নেতৃত্ব নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) প্রকল্প। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অধিকার ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ৪২০ কোটি ডলারের মালিকানা বা শেয়ার বিক্রির যে পরিকল্পনা গত জুলাইয়ে সামনে এসেছিল, তা নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছেন ইউরোপীয় ফুটবল কর্তারা। পরে পরিকল্পনাটি স্থগিত হলেও এর আর্থিক কাঠামো, বিনিয়োগকারী নির্বাচন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি।
বিশেষ করে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট জোশুয়া কুশনারের সঙ্গে ইনফান্তিনোর গোপন যৌথ বিনিয়োগ চুক্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পর বিতর্ক নতুন মাত্রা পায়। বিশ্বকাপ ফাইনালের মাত্র নয় দিন পর গত জুলাইয়ে গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া এই খবর ফিফার অভ্যন্তরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কাউন্সিলের সহকর্মীদের অন্ধকারে রেখে এমন পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও ওঠে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে।
বৈঠকের শুরুতেই এফএফই প্রকল্প নিয়ে যোগাযোগ ও পরামর্শের ক্ষেত্রে ভুলের জন্য ক্ষমা চান ফিফা সভাপতি। ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) প্রধান ও ফিফার সহ-সভাপতি ডেবি হিউইট জানান, ‘তিনি কিছু অনুশোচনার সুরেই কথাটা বলেছেন।’
তবে ক্ষমা চাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় নথি কিংবা বিতর্কের নিষ্পত্তি করতে পারে এমন কোনো নতুন তথ্য সামনে আনেননি ইনফান্তিনো। বরং কাউন্সিল সদস্যদের লিখিতভাবে প্রশ্ন জমা দিতে বলেছেন তিনি। এ ঘটনায় অসন্তোষ জানিয়ে হিউইট বলেন, ‘হতাশাজনক বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো, আমরা নির্দিষ্টভাবে যেসব বিষয়ের উত্তর চেয়েছিলাম, সেগুলোর কোনো উত্তরই পাইনি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা এফএফই প্রকল্প-সংক্রান্ত নথিপত্র চেয়েছিলাম। কিন্তু সেগুলোও দেওয়া হয়নি।’
বৈঠক শেষে তার ক্ষোভ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইনফান্তিনোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে হিউইট বলেন, ‘সেই লোকটিকে অবশ্যই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে। যদি তিনি এসব প্রশ্নের জবাব না দেন, তবে সোজা কথা-ফিফার প্রেসিডেন্ট পদে থাকার কোনো যোগ্যতা তার নেই।’
শুধু ইংল্যান্ড নয়, জার্মান ফুটবল কর্তাদেরও অসন্তোষের মাত্রা ছিল একই রকম। ফিফা কাউন্সিলে উয়েফার আট প্রতিনিধির একজন জার্মান ফুটবল প্রধান বের্নড নয়েনডর্ফের মতে, বৈঠকে কোনো প্রশ্নেরই সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি, ‘কোনো প্রশ্নেরই সন্তোষজনক উত্তর দেওয়া হয়নি।’
ফিফার হারানো ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন নয়েনডর্ফ। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ প্রয়োজন, যিনি এই সংস্থার হারানো ভাবমূর্তি ও সুনাম ফিরিয়ে আনতে পারবেন-যে সুনাম নিঃসন্দেহে আজ বিনষ্ট হয়েছে।’
ইনফান্তিনোকে ঘিরে বিতর্কের প্রভাব এখন ফিফার গণ্ডি ছাড়িয়ে আইনি পর্যায়েও পৌঁছেছে। সুইজারল্যান্ডের আদালতে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দাখিলের উদ্দেশ্যে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের অনুমতি চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে উয়েফা। আদালতে জমা দেওয়া নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রস্তাবিত অঙ্গপ্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ফিফার তহবিলের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা বা নয়ছয় করা হয়ে থাকতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অধিকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার কথা ছিল প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানটির। এর অন্তত ২০ শতাংশ মালিকানা থাকার কথা ছিল ট্রাম্পের জামাতা ও দূত জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনারের নেতৃত্বাধীন বিনিয়োগকারীদের হাতে। এই মালিকানা কাঠামো নিয়েই ইউরোপীয় ফুটবল কর্তাদের আপত্তি আরও জোরালো হয়েছে।
বিতর্কের আরেকটি অংশ বিশ্বকাপের মাঠের ঘটনা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ ঘিরে। ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড এবং পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে সেই শাস্তি স্থগিত হওয়ার বিষয়েও বৈঠকে বিস্তারিত তথ্য মেলেনি। আগামী ডিসেম্বরে ট্রাম্পকে দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা বিশেষ ‘শান্তি পুরস্কার’ চালু রাখার বিষয়টিও এখন পর্যালোচনার আওতায় এনেছে ফিফা। সংস্থাটির স্থায়ী কমিটিগুলো শাস্তিমূলক কার্যক্রমের পদ্ধতির পাশাপাশি পুরস্কারটির বিষয়েও পর্যালোচনা করবে।
এদিকে সংকটের মধ্যেও ফুটবলের উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইনফান্তিনো। ফিফার ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘প্রথমেই, ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ ও পরামর্শ প্রক্রিয়ায় আমাদের যেসব ভুল হয়েছে, সেজন্য ক্ষমা চেয়েছি। এসব ভুলের কারণে অনেক নেতিবাচক পরিণতি হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে এটি ছিল কেবল এক প্রস্তাব। চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যমান উৎস থেকে পাওয়া সহায়তার বিকল্প হিসেবে নয়। বরং ফিফা যাতে সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোতে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারে, সেই সুযোগ তৈরি করা।’
ফিফার দাবি, ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশন, কনফেডারেশন ও অন্যান্য অংশীজনের মধ্যে ফুটবলের উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়িয়ে ৬৩৫ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৭৮ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। ফিফা সভাপতি জানিয়েছেন, বৈঠকে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্নমত ও দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে এবং সেসব নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকের পর ফিফা জানিয়েছে, সম্ভাব্য শাসনব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে পর্যালোচনার জন্য একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি শাস্তিমূলক কার্যক্রমের পদ্ধতি ও ফিফা শান্তি পুরস্কার নিয়ে পর্যালোচনা করবে সংস্থাটির স্থায়ী কমিটিগুলো।
তবে এসব উদ্যোগে আপাতত ইউরোপীয় ফুটবল কর্তাদের মন গলেনি। আগামী মার্চে ফিফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ইনফান্তিনোকে নেতৃত্ব থেকে সরানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে উয়েফা।
