ভারত সফরে তিনবার অপরাজিত থেকে দলকে জিতিয়েছেন শাই হোপ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পাওয়া তিনটি জয়ের প্রতিটিতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন অধিনায়ক। সর্বশেষ জয়ে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে সমতা ফিরিয়ে এনেছে ক্যারিবীয়রা। হায়দরাবাদে চতুর্থ ম্যাচে ৩ উইকেট হারিয়ে ২৪৭ রান করা ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভারতকে হারিয়েছে ২৪ রানে। ভারত ১৯.২ ওভারে ১৯৫ রানেই গুটিয়ে যায় ।
এই ম্যাচে ইতিহাস গড়েছেন হোপ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তিনটি সেঞ্চুরির মালিক হয়েছেন তিনি। দলের অন্য চার ব্যাটসম্যানও ২১ থেকে ৪৯ রানের মধ্যে অবদান রেখেছেন। অন্যদিকে, কিমো পল ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম বোলার হিসেবে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে একাধিকবার পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন। ভারত সফরে প্রথমবার কোনো লক্ষ্য সফলভাবে রক্ষা করল ক্যারিবীয় দল।
দুই ইনিংস মিলিয়ে ম্যাচে উঠেছে ৪৭০ রান। দুই দলের বোলাররাই কিছুটা সহায়তা পেয়েছেন, তারপরও ব্যাটসম্যানদের দাপটে রানের বন্যা বয়ে যায়। নতুন করে প্রস্তুত করা হায়দরাবাদের তুলনামূলক শুষ্ক উইকেটে ভারত বলের গতি ও বাউন্স কাজে লাগিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান তোলার গতি কমানোর চেষ্টা করে। অন্যদিকে, শিশিরের অভাব ও মাঠের দুই পাশের বড় সীমানা কাজে লাগিয়ে ভারতকে আটকে রাখার পরিকল্পনা করে ক্যারিবীয়রা।
তিন ওভারেই বিনা উইকেটে ৫০ রান তুলে ফেলেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু এরপর টানা ১২ ওভার ১৩ বা তার কম রান দিয়ে শেষ করে ভারত। ফিল্ডাররাও এবার সব ক্যাচ নিতে সক্ষম হন। পলের পাঁচ উইকেট এবং গুদাকেশ মোতির এক ওভারে দুটি উইকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়ের পথ সহজ করে দেয়।
সিরিজে প্রথমবারের মতো শুরু থেকেই একা লড়তে হয়নি হোপকে। কামিল পুরানের পরিবর্তে দলে সুযোগ পাওয়া জুয়েল অ্যান্ড্রু অর্শদীপ সিংয়ের প্রথম ওভারেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন। আগের ম্যাচে হোপকে আটকে রাখা অর্শদীপকে শুরুতেই চাপে ফেলেন তিনি। এরপর মায়াঙ্ক যাদবের বিপক্ষে পাল্টা আক্রমণ করেন হোপ।
মাত্র পাঁচ বলে ১৭ রান করেন শিমরন হেটমায়ার। পাওয়ার প্লের ছয় ওভার শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ দাঁড়ায় ১ উইকেটে ৭৯ রান। অর্শদীপের প্রথম দুই ওভারে খরচ হয় ৩৬ রান।
নামান ধিরের প্রথম ওভারে ১৯ রান তুলে আট ওভার শেষে দলীয় সংগ্রহ ১০৯-এ নিয়ে যান হোপ। তখনই চাপে পড়ে ভারত।
এরপর প্রিন্স যাদবের বলে হেটমায়ার আউট হলে কিছুটা গতি হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস। বলও সামান্য ঘুরতে শুরু করে। আগের তিন ম্যাচে কম রান করা রভম্যান পাওয়েলও শুরুতে সময় নেন। পরে অক্ষর প্যাটেলের শেষ ওভারে চার, ছক্কা ও চার মেরে ইনিংসে গতি ফেরান।
শেষ আট ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান আসে ৭৬। ভারতের বোলাররা ওয়াইড ইয়র্কার দিয়ে রান আটকে রাখার চেষ্টা করেন। তবে শেষ দিকে শেরফেন রাদারফোর্ড আক্রমণের দায়িত্ব নেন। ইনিংসের শেষ দুই বলে টানা ছক্কা মেরে ৫০ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন হোপ। ৯০ থেকে ১০২ রানে পৌঁছে যান তিনি। শেষ চার ওভারে ৬২ রান তোলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরুতে সঞ্জু স্যামসন যেন রোস্টন চেজের মুখোমুখি হওয়া থেকে অভিষেক শর্মাকে দূরে রাখতেই চেয়েছিলেন। কিন্তু দ্রুতই ভয়ংকর হয়ে ওঠেন ভারতীয় ওপেনার। প্রথম তিন ওভারে অভিষেক মাত্র তিনটি বল খেলেন। অন্যদিকে, স্যামসন চারটি ছক্কা ও ছয়টি চার মেরে মাত্র ২৩ বলে ৫৬ রান করেন।
তখন মনে হচ্ছিল, দুই দলই সফরে নিজেদের সর্বোচ্চ সফল রান তাড়ার নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। কিন্তু ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন হেটমায়ার ও কিমো পল।
পলের শর্ট বলে পুল করতে গিয়ে স্যামসন ভালোভাবে ব্যাটে-বলে সংযোগ ঘটালেও অসাধারণ দক্ষতায় ক্যাচ নেন হেটমায়ার। সীমানার বাইরে যাওয়ার আগে বল শূন্যে ছুড়ে দিয়ে আবার মাঠে ফিরে ক্যাচটি সম্পূর্ণ করেন তিনি।
এরপর ইশান কিষান মন্থর বলকে ছক্কায় পরিণত করলেও পরের বলে আউট হন। বুদ্ধিদীপ্ত বোলিং পরিবর্তন ও গতির বৈচিত্র্যে অভিষেক শর্মা ও শ্রেয়াস আইয়ারকেও চাপে রাখে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দুজনের জুটি ৩.৪ ওভারে ৩০ রান তুললেও ম্যাচের পরিস্থিতিতে তা যথেষ্ট ছিল না।
ভারতের তখন শেষ নয় ওভারে প্রয়োজন ১২২ রান। ক্রিজে ছিলেন দুই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান অভিষেক ও নামান ধির। এমন পরিস্থিতিতেও গুদাকেশ মোতিকে আক্রমণে আনেন হোপ।
প্রথম বলেই চার মারেন অভিষেক। তবে পরের বলগুলোতে উইকেটের শুষ্কতা কাজে লাগিয়ে বল ঘোরাতে সক্ষম হন মোতি। তার বলে বড় শট খেলতে গিয়ে লং-অফে ক্যাচ দেন অভিষেক। পরের বলেই দারুণ এক ডেলিভারিতে ধিরকে স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে ফেলেন তিনি। কোনো রান না করেই বিদায় নেন ধির।
১৩২ রানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে ভারত। তখন ব্যাটিংয়ের গভীরতা কাজে লাগানোর দায়িত্ব পড়ে তিলক ভার্মা ও নীতীশ কুমার রেড্ডির ওপর।
দুজন ধীরে ধীরে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করেন। শামার জোসেফের ১৬তম ওভারে দুটি ছক্কা মেরে ২১ রান তুলে ভারতকে আবার লড়াইয়ে ফেরান রেড্ডি। শেষ চার ওভারে প্রয়োজন নেমে আসে ৫৯ রানে।
চোটের কারণে আগের ম্যাচে খেলতে না পারা রোমারিও শেফার্ড ১৭তম ওভার শুরু করেন ইয়র্কার দিয়ে। কিন্তু তার ফুলটসকে ছক্কায় পরিণত করেন তিলক ভার্মা।
এরপর উইকেট লক্ষ্য করে বোলিং করেন শেফার্ড। ওভারের শেষ দিকে তিলকের উঁচুতে ওঠা শট সহজেই তালুবন্দি হয়। এই উইকেটেই কার্যত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের হাতে।
১৮তম ওভারে দুর্দান্ত বোলিং করে ভারতকে আরও চাপে ফেলেন শামার স্প্রিঙ্গার। এরপর ১৯তম ওভারে ফিরে তিনটি উইকেট তুলে নেন কিমো পল। ভারতের শেষ ব্যাটসম্যান অর্শদীপ সিংয়ের বাইসেপে বল আঘাত করলে ম্যাচের সমাপ্তি ঘটে। চোটের ঝুঁকি এড়াতে তাকে আর ব্যাটিংয়ে নামায়নি ভারত।
দাপুটে এই জয়ে পাঁচ ম্যাচের সিরিজে সমতা ফেরাল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ফলে সিরিজের ভাগ্য নির্ধারণ হবে শেষ ম্যাচে। হোপের সেঞ্চুরি, পলের পাঁচ উইকেট এবং দলের সম্মিলিত পারফরম্যান্স ক্যারিবীয়দের এনে দিল গুরুত্বপূর্ণ এক জয়।
