শামসুর রাহমানের কবিতায় মানুষ প্রায়ই তার ব্যক্তিগত পরিচয়ের সীমানা অতিক্রম করে একটি বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতার প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। ‘কালো মেয়ের জন্য পঙ্ক্তিমালা’ সেই অর্থে তাঁর মানবতাবাদী কাব্যচেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
কবিতার শুরুতেই কবি পরিচয়ের প্রচলিত কাঠামোকে প্রশ্ন করেন: “আমার নামধাম তোমার জানার দরকার নেই, কালো মেয়ে।” নাম, বর্ণ, গোত্র, জাতিগত পরিচয় এখানে ক্রমে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। “আমি শাদা কি কালো, হলদে কি বাদামি, / সবুজ কি বেগুনি / তাতে কী এসে যায়?” এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে কবিতা প্রবেশ করে মানুষের এমন এক অঞ্চলে, যেখানে চামড়ার রং দিয়ে মানুষের মূল্য নির্ধারণের সমস্ত সামাজিক যুক্তি অস্বীকৃত হয়।
এই সূচনাটির শিল্পগুণ বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো। কবি সরাসরি কোনো তত্ত্ব ঘোষণা করেননি; কথোপকথনের ভঙ্গিতে প্রশ্ন তুলেছেন। “ধ’রে নাও, আমার কোনো বর্ণ/ নেই, আমি গোত্রহীন।” পরিচয়হীনতার এই ঘোষণা আসলে পরিচয়ের বিলোপ নয়, বরং বৃহত্তর মানবপরিচয়ে প্রবেশ।
এর পরেই কবি নিজেকে একটি “কণ্ঠস্বর” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। “বলা যায়, আমি শুধু/ একটি কণ্ঠস্বর”-এই আত্মপরিচয় কবিতাটিকে ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি থেকে সামষ্টিক মানবকণ্ঠে উন্নীত করে। কণ্ঠস্বরটি আর কবির একার নয়; তা মিশে যায় “ঘন কালো অরণ্যের / লতাপাতায়”, “ঝিলের টোল-খাওয়া পানিতে”, “হরিণের মুখ রাখার ভঙ্গিমায়”, “উটের গলার ঘণ্টাধ্বনিতে”।
এই অংশে শামসুর রাহমানের চিত্রকল্প নির্মাণের ক্ষমতা বিশেষভাবে উজ্জ্বল। অরণ্য, ঝিল, হরিণ, উটের ঘণ্টা, একটি দৃশ্যের মধ্যে এগুলোকে আটকে রাখা হয়নি। শব্দটি স্থানান্তরিত হয়েছে এক ভূগোল থেকে আরেক ভূগোলে।
“এই কণ্ঠস্বর / বয়ে যায় বিষুব রেখায়, উত্তর মেরুতে, বঙ্গোপসাগরের / তরঙ্গে তরঙ্গে আর আফ্রিকার / অজস্র জেব্রার খুরধ্বনিময় প্রান্তরে।” এখানে ভূগোল হয়ে ওঠে কাব্যের সংগীত। বিষুবরেখা থেকে উত্তর মেরু, বঙ্গোপসাগর থেকে আফ্রিকার প্রান্তর, পৃথিবীর বিচ্ছিন্ন স্থানগুলোকে একটি কণ্ঠস্বরের গতির মধ্যে এনে কবি মানুষের অভিন্ন অভিজ্ঞতার একটি বিশ্বমানচিত্র আঁকেন।
কবিতার অন্যতম বড় শিল্পসৌন্দর্য নিহিত আছে ‘কালো’ শব্দটির পুনরাবৃত্তিতে। সাধারণ ভাষায় কালো একটি রং; কবিতায় এসে তা বহুস্তরীয় অর্থ অর্জন করে। “কালো মেয়ে”, “কালো মুখ”, “কালো সেই স্তন”, “সে-হাত কালো”, এই পুনরাবৃত্তি প্রথমে যেন গাত্রবর্ণের কথাই বলে।
কিন্তু পাঠ যত এগোয়, বোঝা যায় কবি ধীরে ধীরে শব্দটির অর্থ বদলে দিচ্ছেন। যে ‘কালো’কে সমাজ অবমাননার চিহ্ন করেছে, কবি সেই কালোকেই মাতৃত্ব, শ্রম, স্নেহ, জীবন এবং সৌন্দর্যের সঙ্গে যুক্ত করছেন।
“যে-স্তন তোমার শিরায় শিরায় বইয়ে দিয়েছিল
জীবনের ধারা, কালো সেই স্তন।”
এই পঙ্ক্তি কবিতার অন্যতম শক্তিশালী মুহূর্ত। এখানে কালো শরীর কোনো দূরবর্তী জাতিগত চিহ্ন নয়; সেটিই জীবনের উৎস।
একইভাবে, “তোমার দোলনা দুলিয়েছিল যে-হাত, / সে-হাত কালো, / তোমার জন্য রুটি বানিয়েছিল যে-হাত, / সে-হাত কালো”, এই পুনরুক্তি একদিকে ছন্দ তৈরি করেছে, অন্যদিকে কালো মানুষের শ্রম ও মমতাকে দৃশ্যমান করেছে।
বিশেষ করে “রুটি বানিয়েছিল যে-হাত” পঙ্ক্তিটি অত্যন্ত সাধারণ গৃহস্থালি দৃশ্যকে ইতিহাসের গভীর অর্থে উন্নীত করে। যে হাতকে সভ্যতার শ্রেণিবিন্যাস অবজ্ঞা করেছে, সেই হাতই শিশুকে বাঁচিয়েছে, বড় করেছে, জীবনের প্রথম উপহার তুলে দিয়েছে।
“তোমার হাতে প্রথম কাঠের পুতুল / তুলে দিয়েছিল যে-হাত / বড় স্নেহার্দ্র, বড় কালো সে হাত।” এখানে ‘হাত’ একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকল্প। হাত একই সঙ্গে শ্রমের, মাতৃত্বের, সৃষ্টির এবং স্নেহের প্রতীক। ফলে কালো শরীরকে কবি কোনো বিমূর্ত সৌন্দর্যের বস্তু করেননি; তার সৌন্দর্যকে জীবনের কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিই কবিতাটিকে গভীর মানবিকতা দিয়েছে।
কবিতার পরবর্তী অংশে ভাষার গতি বদলে যায়। “কালো মেয়ে, তুমি দারিদ্রের গহ্বরে / হামাগুড়ি দিয়ে / মিথ্যার মতো শাদার উৎপীড়নে ধুঁকে ধুঁকে”, এখানে ব্যক্তিগত নারীর জীবন হঠাৎ ইতিহাসের দীর্ঘ অন্ধকারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।
“দারিদ্রের গহ্বর”, “উৎপীড়ন”, “লাঞ্ছনার অট্টহাসি”, “বঞ্চনার শত খানাখন্দ”, “উপহাসের কাদা”, একটির পর একটি তীব্র চিত্রকল্প নারীর জীবনের পথটিকে প্রায় দৃশ্যমান করে তোলে। ভাষা এখানে অলংকারের জন্য অলংকার নয়; প্রতিটি চিত্রকল্প একটি সামাজিক অভিজ্ঞতাকে শরীরী করে তোলে।
এরপর হঠাৎ দৃশ্যপটে আসে আলো: “গা ঝারা দিয়ে জ্যোৎস্নার চন্দনলিপ্ত হরিণীর মতো / এসে দাঁড়িয়েছো যৌবনের চুড়ায়।” এই উপমাটি কবিতার সৌন্দর্যকে অন্য স্তরে নিয়ে যায়। এতক্ষণ যে নারী দারিদ্র্য, অপমান ও বঞ্চনার ভিতর দিয়ে এগিয়ে এসেছে, তাকে কবি দেখছেন জ্যোৎস্নায় স্নাত হরিণীর মতো।
এখানে প্রকৃতি নারীর সৌন্দর্যকে অলংকৃত করে না শুধু; প্রকৃতি যেন তার পাশে এসে দাঁড়ায়। ‘হরিণী’ শব্দটি কোমলতা, সতর্কতা ও মুক্ত গতির একটি অনুভূতি তৈরি করে।
কিন্তু কবিতার সৌন্দর্য কখনোই বাস্তবতার বেদনা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। নারীর স্বামীকে “ঘরছাড়া” করা হয়েছে, তার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। “ওর কালো মখমলের মতো কণ্ঠস্বর / ওরা স্তব্ধ করে দিয়েছে”, এখানে “কালো মখমল” একটি অসাধারণ শ্রুতিদৃশ্য-নির্ভর চিত্রকল্প।
কণ্ঠস্বরকে মখমলের সঙ্গে তুলনা করে কবি তার কোমলতা ও গভীরতাকে স্পর্শযোগ্য করে তুলেছেন। আবার সেই কণ্ঠের অনুপস্থিতি তৈরি করেছে শূন্যতা। “তোমার কানে কোনোদিন আর গুঞ্জরিত / হবে না তার তারা-ঝলসিত গান।” কণ্ঠ, গান, তারা, শ্রুতি ও দৃশ্যের এই মেলবন্ধন কবিতার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা বাড়িয়ে দেয়।
এই মৃত্যুবোধের মাঝেই কবি ভবিষ্যতের জন্মের সম্ভাবনা স্থাপন করেন। “তরমুজের মতো তোমার উদরে / মাসের পর মাস বেড়ে উঠছে ওর সন্তান।” উপমাটি একেবারেই দৈনন্দিন, স্পষ্ট এবং প্রাণবন্ত। মাতৃগর্ভকে কোনো দুর্বোধ্য প্রতীকে আড়াল না করে কবি তরমুজের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ফলে অনাগত শিশুর বেড়ে ওঠা হয়ে উঠেছে সহজে দৃশ্যমান একটি জীবনপ্রক্রিয়া।
শিশুটির জন্মের কল্পিত মুহূর্তে কবিতার ভাষা একেবারে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে: “সূর্যোদয় গালিচা বিছিয়ে দেবে তার উদ্দেশে, / গান গেয়ে উঠবে রঙবেরঙের পাখি, / গাছাপালা করতালিতে / মুখর ক’রে তুলবে দশদিক।”
এখানে প্রকৃতি আর পটভূমি নয়; সে নিজেই নবজাতকের অভ্যর্থনায় অংশ নেয়। সূর্যোদয় হয়ে যায় অভ্যর্থনার গালিচা, পাখি হয়ে ওঠে গায়ক, গাছপালা হয়ে ওঠে করতালিদাতা। এই মানবীকরণ কবিতার কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করেছে।
যে শিশুর পূর্বপুরুষেরা অপমান ও নিপীড়নের ইতিহাস বহন করেছে, তার জন্মকে কবি সমগ্র প্রকৃতির উৎসব হিসেবে কল্পনা করেছেন।
শেষ অংশে কবিতাটি ব্যক্তিগত নারী ও তার সন্তানের গল্প ছাড়িয়ে ইতিহাসের বৃহত্তর ভবিষ্যতের দিকে যায়। “তোমার কোল-আলো-করা ছেলে বেড়ে উঠবে / শত্রুর বন্দুকের ছায়ায়”, এই দুটি পঙ্ক্তিতে জন্ম ও সহিংসতা পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়।
শিশুটি এমন এক পৃথিবীতে বড় হবে, যেখানে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এখনো অসম্পূর্ণ। কিন্তু গভীর রাতে সে “স্বাধীনতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে” স্যাক্সোফোনে তুলবে “তোমার পূর্বপুরুষদের যন্ত্রণার সুর”। সংগীত এখানে বিনোদন নয়; এটি ইতিহাসের স্মৃতি বহনের মাধ্যম।
কবিতার শেষ চিত্রকল্পগুলোর মধ্যে “ক্রুশবিদ্ধ মর্যাদা” বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মর্যাদা এখানে এমন এক মানবিক মূল্য, যাকে নিপীড়নের ইতিহাস ক্রুশবিদ্ধ করেছে। আর সেই ক্ষত ধুয়ে সেখানে “প্রসন্ন অর্কিড” ফোটানোর কল্পনা ভবিষ্যতের পুনর্গঠনের ইঙ্গিত বহন করে।
শেষ পর্যন্ত শিশুটিই হয়ে ওঠে ইতিহাসের প্রতিকারকারী শক্তি। “সে তার জোরালো কালো হাতে মুছিয়ে দেবে আফ্রিকার / কালো হীরের মতো চোখ থেকে গড়িয়ে-পড়া অশ্রুজল।” কালো হাত, যা একসময় অবজ্ঞার চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, কবিতার শেষে সেই হাতই অশ্রু মোছার শক্তি হয়ে ওঠে। ‘কালো’ শব্দটির অর্থ এখানে সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।
এই কবিতার ভাষাশৈলীর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর দীর্ঘশ্বাসের মতো বাক্যপ্রবাহ। কোথাও পঙ্ক্তি ছোট, কোথাও দীর্ঘ; কোথাও পুনরুক্তি, কোথাও দ্রুত চিত্রের পর চিত্র। ফলে কবিতাটি প্রচলিত ছন্দের বদলে কথনের নিজস্ব ছন্দ তৈরি করে।
“সে-হাত কালো”, “সে-হাত কালো”, “বড় কালো সে হাত”, এই পুনরাবৃত্তি যেমন অর্থকে জোরালো করে, তেমনি পাঠের সময় একটি মৌখিক আবেগ তৈরি করে। আবার “বিষুব রেখায়, উত্তর মেরুতে, বঙ্গোপসাগরের/ তরঙ্গে তরঙ্গে”, এই বিস্তৃত বাক্যপ্রবাহ কণ্ঠস্বরের ভৌগোলিক যাত্রাকে অনুভব করায়।
সবচেয়ে বড় কথা, শামসুর রাহমান এই কবিতায় সৌন্দর্যকে বাস্তবতা থেকে সরিয়ে নেননি। দারিদ্র্য আছে, অপমান আছে, হত্যা ও নির্বাসন আছে; কিন্তু তার মধ্যেই আছে মাতৃত্ব, প্রেম, সংগীত, প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ।
তাই কবিতার সৌন্দর্য কোনো সাজানো দৃশ্যের সৌন্দর্য নয়। এটি আহত ইতিহাসের মধ্য থেকে উঠে আসা মানুষের সৌন্দর্য। ‘কালো’ শব্দটি কবিতার শুরুতে যে পরিচয়ের সংকট নিয়ে আসে, শেষ পর্যন্ত সেই কালোই হয়ে ওঠে জীবন, স্মৃতি, মর্যাদা ও প্রতিরোধের ভাষা।
‘কালো মেয়ের জন্য পঙ্ক্তিমালা’ বিচ্ছিন্নতা ও ক্ষুদ্র সীমা থেকে পরিব্যাপ্ত হয়ে একজন নারীর উদ্দেশে লেখা কবিতা নয়; এটি রঙের রাজনীতি অতিক্রম করে মানুষের মুখ পুনরুদ্ধারের কবিতা। এর শিল্পসৌন্দর্য নিহিত আছে সেই পুনর্নির্মাণের প্রক্রিয়ায়।
শামসুর রাহমান কোনো বক্তৃতা দেননি; তিনি রং, শরীর, হাত, কণ্ঠস্বর, অরণ্য, হরিণ, পাখি, সূর্যোদয়, স্যাক্সোফোন, অর্কিড ও অশ্রুজল দিয়ে একটি মানবিক পৃথিবী নির্মাণ করেছেন। সেই পৃথিবীতে মানুষের পরিচয় তার গায়ের রঙে থেমে থাকে না। বরং একটি কালো মুখের ভিতরেও কবি আবিষ্কার করেন এমন এক আলো, যার সামনে তাঁর নিজের “কণ্ঠস্বর” শ্রদ্ধায় নত হয়।
The post শামসুর রাহমানের ‘কালো মেয়ের জন্য পঙ্ক্তিমালা’ appeared first on সুপ্রভাত বাংলাদেশ.
