সীমান্তের ওপার থেকে পলাতক স্বৈরাচারের দেওয়া অর্থে একটি গোষ্ঠী দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং বিভিন্ন কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির চক্রান্ত করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, মিথ্যা কথা বলে স্বৈরাচার ও একটি বিশেষ দল এক হয়ে দেশের অর্থনৈতিক গতি ও অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। গতকাল বিকালে রাজশাহীর
হাজী মুহম্মদ মুহসীন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আখচাষিদের মধ্যে প্রণোদনার অর্থ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে কম্পিউটারে বোতাম টিপে রাজশাহী অঞ্চলের ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির মোবাইল হিসাবে মোট ১২ কোটি টাকা প্রণোদনা পাঠান প্রধানমন্ত্রী। এ সময় ১৫ জন আখচাষির হাতে চেক তুলে দেন তিনি। চেক পাওয়া আখচাষিরা হলেন আবু সাঈদ চান, আবদুল আউয়াল মালেক, আবদুল মান্নান মন্ডল, এমাজ উদ্দিন, মো. কাহার, গোলাম রাব্বানী, সবিতা রানী, জালাল উদ্দিন মৃধা, জিয়াউল হক, মহিদুল ইসলাম, আবদুল মাজেদ, নিরান্দ কুমার ঘোষ, শামীমুর রহমান, রীমা খাতুন ও রফিকুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ সময় এসেছে বাংলাদেশের জনগণকে সচেতন হওয়ার। আমাদের সচেতন হতে হবে, যাতে কেউ বাংলাদেশে আর কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। দেশের অর্থনীতি, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এবং ভাগ্যের পরিবর্তনে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেই কাজ যাতে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকার বন্ধ মিল-কারখানাগুলো চালু করতে চায়। কৃষকদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে চায়। শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়িয়ে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়। বেকারত্বের অভিশাপ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে চায়। কিন্তু কতকগুলো মানুষ একটি বিশেষ দলের সঙ্গে আরও কয়েকটি দলকে নিয়ে রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
তারেক রহমান বলেন, দেশীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, যাতে বন্ধ কলকারখানাগুলো চালু করা যায়। বিদেশি উদ্যোক্তাদেরও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তাদের বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে বন্ধ মিল-কারখানাগুলো চালু করুন। এর মাধ্যমে দেশের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে এবং বেকার শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। কিন্তু এসব উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করতে কতকগুলো দল উঠে-পড়ে লেগেছে। জনগণকে বিভ্রান্ত করতে তারা রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
কৃষি খাতে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে, কৃষি বাঁচলে কৃষক বাঁচবে, দেশ বাঁচবে। এ কারণেই কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী কিছুদিনের মধ্যে এ-সংক্রান্ত কাজ শেষ হবে। এরপর ধীরে ধীরে কৃষকদের হাতে কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি বছর দেশের ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের মধ্যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ৪০ লাখ কৃষকের কাছে কৃষক কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকেরা অন্তত একটি ফসলের জন্য সার, বীজ ও কীটনাশক সহায়তা, ফসলবীমা, ব্যাংকঋণ এবং মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার পূর্বাভাসসহ মোট ১০টি বিশেষ সুবিধা পাবেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার গঠনের মাত্র সাত দিনের মাথায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৩ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
দেশের সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাড়াতে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, গত আট মাসেই ৮০০ কিলোমিটার খাল খনন সম্পন্ন হয়েছে।
রাজশাহী অঞ্চলের পানিসংকটের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কত নিচে নেমে গেছে, তা রাজশাহীর মানুষ জানে। এ কারণে অনেক মানুষ পানির কষ্টে রয়েছেন। খাল খননের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাড়বে এবং ধীরে ধীরে পানির সংকট কমবে।
পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় এবং উত্তরাঞ্চলের পানিসংকট দূর করতে পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণের ঘোষণাও দেন তিনি। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় ১৪টি জেলার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে ২ হাজার ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ১৫০-তে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, নারীদের অনার্স পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ এবং উপবৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিবারপ্রধান নারীদের স্বাবলম্বী করে তুলতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর রায়। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন।
জনসভায় রাজশাহী জেলার বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী অংশ নেন। সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষরাও উপস্থিত ছিলেন। এর আগে দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে সামরিক বিমানে শাহ মখদুম বিমানবন্দরে পৌঁছে সরাসরি জনসভাস্থলে যান প্রধানমন্ত্রী। এর আগে তিনি রংপুর সফর করেন এবং সেখানে ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন।
রাজশাহীর কর্মসূচি শেষে প্রধানমন্ত্রী রাজশাহী ধর্মসভা পরিদর্শন করেন। সেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতৃবৃন্দ ও পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। পরে ধর্মসভা প্রাঙ্গণে একটি রক্তচন্দন গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
