জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা পেতে হলে দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রাথমিক প্রমাণ দেখাতে হবে। শুধু জমির দখলে থাকা, দলিল থাকার দাবি করা কিংবা নামজারির কথা বললেই অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যাবে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে একটি জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের ঘটনায় করা সিভিল রিভিশন নম্বর ৩৭৭৪/২০১৩ খারিজ করে এ পর্যবেক্ষণ দেন হাইকোর্টের বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খানের একক বেঞ্চ। গত ১০ সেপ্টেম্বর এ মামলার রায় দেওয়া হয়, যা ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত হয়।
মামলার বাদী মো. ইসহাক আলী (মৃত) ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের দাবি, ১৯৪৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি একটি দলিলের মাধ্যমে তাঁরা জমিটি কেনেন এবং পরে ভোগদখল করেন। তাঁদের অভিযোগ, জমির খতিয়ানে ভুলভাবে অন্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া ১৯৭৭ সালে একটি স্বত্ব মামলায় রায় ও ডিক্রি পাওয়ার ভিত্তিতেও তাঁরা জমিটির মালিকানা দাবি করেন।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে তাঁদের নামজারি বাতিল করা হয় এবং জমিটি অন্যদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। এ অবস্থায় জমির ওপর নিজেদের অধিকার রক্ষায় তাঁরা মামলা করেন এবং জমি নিয়ে কোনো পদক্ষেপ ঠেকাতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চান।
অন্যদিকে, সরকারি পক্ষের দাবি, জমিটি অর্পিত সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। জমির মালিকানা প্রমাণে বাদীপক্ষের দাখিল করা দলিল এবং আগের মামলার রায় ও ডিক্রির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে তারা।
মামলার শুরুতে বিচারিক আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও পরে তা প্রত্যাহার করেন। এরপর অতিরিক্ত জেলা জজ মামলাটি ফেরত পাঠিয়ে জমিটি অর্পিত সম্পত্তির আওতায় পড়ে কি না এবং এ অবস্থায় মূল মামলাটি আইন অনুযায়ী চলতে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যান বাদীপক্ষ।
নথিপত্র পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখতে পান, বাদীপক্ষের মালিকানা দাবির অন্যতম ভিত্তি ছিল ১৯৪৪ সালের একটি অনিবন্ধিত দলিল। এ ছাড়া ১৯৭৭ সালের স্বত্ব মামলার রায় ও ডিক্রির সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন ছিল। সংশ্লিষ্ট মামলার রেজিস্টারের সঙ্গে আদালতে দাখিল করা রায় ও ডিক্রির সত্যায়িত অনুলিপির মিল পাওয়া যায়নি।
বাদীপক্ষ জমির নামজারি সংশোধন এবং সংশোধিত এসএ খতিয়ানের কথা উল্লেখ করলেও সংশ্লিষ্ট খতিয়ান বা নামজারির নথি আদালতে জমা দিতে পারেননি। ফলে জমিটির মালিকানা দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে মনে করেন হাইকোর্ট।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগে বাদীর দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে মূল মামলাটি আইন অনুযায়ী দায়ের করা সম্ভব কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
এ সময় আদালত অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১-এর ৭ ও ১৩ ধারাও আলোচনা করেন। তবে মূল মামলার প্রয়োজনীয় আরজি হাইকোর্টে না থাকায় মামলাটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি আদালত।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বাদীপক্ষ জমির মালিকানা দাবির পক্ষে যথেষ্ট প্রাথমিক প্রমাণ দেখাতে পারেননি। নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার মতো কোনো আইনগত ভুলও পাওয়া যায়নি। এ কারণে সিভিল রিভিশনের রুল খারিজ করে আগের অন্তর্বর্তী আদেশ প্রত্যাহার করেন আদালত।
একই সঙ্গে মামলাটি তখনও নিষ্পত্তি না হয়ে থাকলে অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ না করে যত দ্রুত সম্ভব নিষ্পত্তির জন্য নিম্ন আদালতকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
রায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ হলেই অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা পাওয়া যায় না। আবেদনকারীকে দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রাথমিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। দলিল, আগের মামলার রায়, খতিয়ান ও নামজারির নথিতে অসংগতি থাকলে তা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
