১৫ বছর ধরে প্রতিদিন স্ত্রীর কবর পরিষ্কার করেন ৮৫ বছরের আইনজীবী!
ভালোবাসার মানুষটি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন ১৫ বছর আগে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কমেনি তাঁর প্রতি ভালোবাসা, মুছে যায়নি স্মৃতিও। প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে হাতে ঝাঁটা নিয়ে স্ত্রীর কবর পরিষ্কার করতে ছুটে যান ৮৫ বছর বয়সী প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মওলা বক্স। শুধু স্ত্রীর কবরই নয়, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে পরিচ্ছন্ন রাখছেন পুরো কবরস্থানও। দিনাজপুরের এই প্রবীণ আইনজীবীর নিঃশব্দ ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ যেন মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের ভালোবাসা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায় না।
দিনাজপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা মোড়। চারপাশে সুউচ্চ ভবন, আধুনিক ফ্ল্যাট আর নাগরিক জীবনের নানা আয়োজন। অথচ এসবের মোহ পেছনে ফেলে প্রতিদিন সকালে এক ভিন্ন টানে ছুটে যান অ্যাডভোকেট মওলা বক্স। জীবনের ৮৫ বছর পেরিয়েও তাঁর দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কাটে প্রিয় স্ত্রীর কবরের পাশে। সেখানে মোনাজাত করেন, কবর পরিষ্কার করেন এবং আশপাশের ময়লা-আবর্জনা সরিয়ে পুরো স্থানটি পরিচ্ছন্ন রাখেন।
এই ভালোবাসার গল্পের শুরু ১৯৭০ সালে। সামাজিক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী এক তরুণীকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করেন মওলা বক্স। তাঁর স্ত্রীর নাম জাহানারা বেগম ঝর্ণা। পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় গড়ে ওঠে তাঁদের সংসার। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে তাঁদের ঘরে আসে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষিত এবং বাবার মতো আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
কিন্তু ২০১১ সালে তাঁদের জীবনে নেমে আসে গভীর শোক। দীর্ঘ চার দশকের সুখ-দুঃখের সঙ্গী জাহানারা বেগম ঝর্ণা মারা যান। প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন মওলা বক্স। তবে স্ত্রীর স্মৃতিকে ভুলে থাকার পরিবর্তে তাঁর প্রতি ভালোবাসাকে একটি নিয়মিত কাজের মধ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখেন তিনি।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষ করে কবরস্থানে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন এই প্রবীণ আইনজীবী। সেখানে স্ত্রীর আত্মার মাগফিরাত কামনায় মোনাজাত করেন। এরপর নিজ হাতে পরিষ্কার করেন তাঁর কবর। শুকনো পাতা, গাছের ডালপালা ও আগাছা সরিয়ে কবরের চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখেন। একসময় নিজের স্ত্রীর কবর পরিষ্কারের পাশাপাশি পুরো কবরস্থানের হাঁটাচলার পথ ও আশপাশ পরিষ্কারের কাজও শুরু করেন তিনি।
এভাবেই দেখতে দেখতে কেটে গেছে ১৫ বছর। বয়সের ভার কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা—কোনোটিই তাঁর এই অভ্যাসে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা শীতের সকালেও স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা থেকে গড়ে ওঠা এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি সামাজিক ক্ষেত্রেও পরিচিত মুখ অ্যাডভোকেট মওলা বক্স। তিনি বিরামপুর জেলা বাস্তবায়ন আন্দোলনের স্বপ্নদ্রষ্টা ও সভাপতি হিসেবে এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ভূমিকা রেখেছেন। পেশাগত ও সামাজিক জীবনে পরিচিত এই মানুষটি কবরস্থানে গিয়ে যেন অন্য এক পরিচয়ে ধরা দেন—সেখানে তিনি একজন স্বামী, যিনি প্রিয় মানুষের স্মৃতিকে যত্নে আগলে রেখেছেন।
স্ত্রীর প্রতি এই ভালোবাসার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মওলা বক্স। তাঁর ভাষ্য, স্ত্রী নিজের পরিবার, ধর্ম ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে শুধু তাঁর ওপর বিশ্বাস রেখে সংসার শুরু করেছিলেন। স্ত্রীর সেই ত্যাগ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথা স্মরণ করেই তিনি প্রতিদিন কবরস্থানে যান। তাঁর কাছে কবর পরিষ্কার করা কেবল একটি অভ্যাস নয়, বরং প্রিয় মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি উপায়।
ভালোবাসার গভীরতা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ভালোবাসা যত বড় হয়, জীবনটা তত নয়।’
৮৫ বছর বয়সেও স্ত্রীর কবরের পাশে প্রতিদিন ফিরে যাওয়া মওলা বক্সের এই গল্প তাই শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত শোকের গল্প নয়; এটি দীর্ঘ দাম্পত্য, বিশ্বাস, কৃতজ্ঞতা আর স্মৃতি আগলে রাখার এক আবেগঘন দৃষ্টান্ত। প্রিয় মানুষটি আর পাশে নেই, কিন্তু তাঁর প্রতি ভালোবাসাকে প্রতিদিনের কাজে বাঁচিয়ে রেখেছেন এই প্রবীণ আইনজীবী।
