মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ভিটেমাটি বন্ধক রেখেও শূন্য হাতে উত্তর হালিশহরের গলিচিপা এলাকার আব্দুল মান্নান ও তাঁর ভাগিনা নুরনবিসহ বারুনি ঘাটা ও রাণী রাসমনি ঘাটের অসংখ্য মৎস্যজীবী চরম বিপাকে পড়েছেন। মাছ ধরে ভাগ্য ফেরানোর আশায় নিজেদের শেষ সম্বলটুকুও বাজি ধরেছিলেন তাঁরা। ইলিশের মৌসুমকে সামনে রেখে জমি বন্ধক এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করে বড় অঙ্কের পুঁজি সংগ্রহ করেছিলেন। সেই টাকায় বড় নৌকা ভাড়া করার পাশাপাশি বেশি মাছ ধরার আশায় ভোলা থেকে চুক্তিভিত্তিক দক্ষ জেলেও নিয়ে এসেছিলেন।
সব প্রস্তুতি শেষ করে সাগরে নামার ঠিক আগমুহূর্তে আসে সরকারি নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেও সাগরে আশানুরূপ ইলিশ পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে অনেকেই তেলের খরচও তুলতে পারেননি। এখন টানা ২২ দিন আয় বন্ধ থাকায় কিস্তি পরিশোধ ও দাদনের টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে চরম হতাশায় ভুগছেন তাঁরা।
বিকল্প আয়ের উৎস না থাকায় জেলে পরিবারগুলোর দৈনন্দিন খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া ভিজিএফের চাল অনেক সময় পর্যাপ্ত হয় না কিংবা সময়মতো পৌঁছায় না বলে অভিযোগ জেলেদের।
বর্তমানে বারুনি ঘাটে মাছ ধরার ট্রলার ও নৌকাগুলো নোঙর করে রাখা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে জেলেরা ঘাটে বসে পুরোনো জাল বোনা, ট্রলারের ইঞ্জিন মেরামত ও নৌকায় রং করার কাজ করছেন।
তীব্র অভাবের কারণে বারুনি ঘাটা ও আশপাশের আনন্দবাজার এবং ধুমপাড়া উপকূলের কিছু জেলে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতে বা ভোরে সাগরে নামার চেষ্টা করছেন। এ কারণে নিয়মিত অভিযানে অনেককে আটক ও জরিমানা করা হচ্ছে।
জেলেদের দাবি, মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের দেওয়া ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি তাঁরা আগে থেকে জানতে পারেননি। নিষেধাজ্ঞার কারণে মুহূর্তেই তাঁদের জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা।
সাগরে জাল ফেলা তো দূরের কথা, নৌকা ঘাটে বেঁধে রেখেও প্রতিদিন গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের লোকসান। মাছ ধরতে না গেলেও নৌকার ভাড়া দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, ভোলা থেকে চুক্তিতে নিয়ে আসা জেলেদের দৈনিক মজুরি ও খোরাকির খরচও বহন করতে হচ্ছে।
আয়-রোজগার বন্ধ থাকলেও প্রতিদিনের খরচের বোঝা বেড়েই চলেছে। ধারদেনা ও জমি বন্ধকের টাকা পরিশোধের চিন্তার পাশাপাশি দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে গিয়ে দিশেহারা আব্দুল মান্নান, নুরনবিসহ এলাকার মৎস্যজীবীরা। সরকারি নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে আয় বন্ধ থাকায় তাঁদের জীবনে দেখা দিয়েছে চরম মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট।
