একসময় সুন্দরবন লাগোয়া ডায়মন্ড হারবারে টোল চালাতেন জনার্দন সার্বভৌম। তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে নবাব আলিবর্দি খাঁ হাজার বিঘে জমি দান করেছিলেন। সেই জমির আয় থেকে ডায়মন্ড হারবারের নেতড়া নন্দীপাড়ার চক্রবর্তী পরিবারের পঞ্চম পুরুষ দুর্গাপুজো শুরু করে। ১৮৮২ সালে বাড়িতে শুরু হয় উমা আরাধনা। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব হয়ে ওঠে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক নিদর্শন। এবার ১৪৪ বছরে পড়ল নেতড়ার চক্রবর্তী পরিবারের দুর্গাপুজো। এখনও অটুট সম্প্রীতির পরিবেশ।
এই নেতড়া গ্রামেরই সন্তান ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক নীলরতন সরকার, কিশোর সাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকারের মতো বরেণ্য ব্যক্তিরা। সেই গ্রামের চক্রবর্তী পরিবারের পঞ্চম পুরুষ পণ্ডিত রামব্রহ্ম চক্রবর্তী ছিলেন শোভাবাজার রাজবাড়ির পুরোহিত। তিনি ছিলেন জনার্দন সার্বভৌমেরই উত্তর পুরুষ। নবাবের মৃত্যুর ১০০ বছরেরও বেশি সময় পর নবাবের সেই দানের জমির আয়ের টাকাতেই চক্রবর্তী পরিবারে দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল ১৮৮২ সালে। সেদিনের সেই রীতিনীতি মেনে আজও দুর্গা আরাধনা করছে চক্রবর্তী পরিবার।
শুরুর প্রথম দু’বছর এই পরিবারে হয় ঘটপুজো। পরবর্তীকালে চালু হয় একচালার ডাকের সাজের দুর্গাপ্রতিমার পুজোর। পরিবারের বংশধর স্বাধীনতা সংগ্রামী ললিতমোহন চক্রবর্তী ছিলেন গান্ধীজির শিষ্য। মহাত্মা গান্ধীর ডাকে বিদেশি দ্রব্য বর্জন নিয়ে সারা দেশ যখন উত্তাল, সেসময় বাংলায় স্বদেশি ডাকের সাজের প্রতিমা পুজোর মাধ্যমে চক্রবর্তী পরিবার তাতে শামিল হন। পরিবারের সদস্য উৎপল চক্রবর্তী জানান, নবাবের দেওয়া নিষ্কর সম্পত্তির বেশিরভাগই এখন নদীগর্ভে বিলীন। দখল হয়ে গিয়েছে বেশ কিছু জমিও। তবে আজও দুর্গা আরাধনা হয় নবাবের দেওয়া সেই জমির দালানেই। পুজোর যাবতীয় দায়িত্ব সামলান রামব্রহ্মের দশ পুত্রের নাতি-নাতনিরাই। শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজোর নিয়ম মেনে মহালয়ার কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথি ধরে পুজো শুরু হয়। রামব্রহ্মের জ্যেষ্ঠপুত্র দীননাথ বিদ্যারত্নের রচিত পুঁথি পাঠ করে পূজার্চনা হয়।
পুজো শুরুর কয়েকদিন আগে পাশের চণ্ডীমন্দিরে ঘট বসিয়ে চলে দেবীর আরাধনা। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত মাছ ভাজা সহ ১৫-২০ রকমের পদ রান্না করে ভোগ হিসেবে দেবীকে নিবেদন করা হয়। পুজোর কদিন দর্শনার্থীদেরও খিচুড়ি ভোগ খাওয়ানো হয়। গ্রামের হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বসে একসঙ্গে খান সেই খিচুড়ি ভোগ। বাড়ির মহিলারাই ভোগ রান্নার কাজে হাত লাগান। পুজোর ক’দিন চলে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও। উৎসবে মেতে ওঠে গোটা গ্রাম।
