দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে একদিকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা আট দিনের আমদানি-রপ্তানি বিরতির প্রস্তুতি, অন্যদিকে প্রায় সাত কোটি টাকা মূল্যের পণ্য শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই বের করে নেওয়ার অভিযোগ। এর মধ্যে কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাঈন উদ্দিন আরমানকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ঘিরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে বন্দরের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, পণ্য খালাসের নিরাপত্তা ও রাজস্ব আদায় নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে কাস্টমসের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও।
বেনাপোল কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, আজ শনিবার থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ থাকার কথা রয়েছে। দুই দেশের ছুটির সময়সূচির সমন্বয় না থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ২৫ অক্টোবর থেকে স্বাভাবিক বাণিজ্য শুরুর কথা থাকলেও দীর্ঘ বিরতির পর বন্দরে পণ্যজট, পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘ সারি এবং খালাসে বিলম্বের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। এতে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের পরিবহন ব্যয়সহ অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর মধ্যেই গত ৮ অক্টোবর বেনাপোল স্থলবন্দরের ৪১ নম্বর শেড থেকে সিনথেটিক কাপড়, শাড়ি ও থ্রিপিসসহ উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য শুল্ক পরিশোধ কিংবা বৈধ এন্ট্রি ছাড়াই বের করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে ঢাকার সদরঘাট এলাকায় দুটি ট্রাক থেকে এসব পণ্য আটক হয়। আটক পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য সাত কোটি টাকা। ওই ঘটনার পর বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মাঈন উদ্দিন আরমানকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞা ৪১ নম্বর শেডে আরমানের সঙ্গে অসদাচরণ ও শারীরিক লাঞ্ছনা করেন। এ বিষয়ে আরমান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বেনাপোল কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে গাড়িতে করে কাস্টম হাউস ত্যাগ করেন। পরে তার কার্যালয়ের দরজায় তালা ঝুলতে দেখা যায়। একই সঙ্গে দরজার সামনের নামফলকও খুলে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কাস্টম হাউসের অন্য কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাইলে তারা জানান, যুগ্ম কমিশনার শরফুদ্দিন মিঞা ছুটিতে রয়েছেন। তবে তিনি কবে কর্মস্থলে ফিরবেন, সে বিষয়ে তারা নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরমান হোসেন বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। তবে তিনি অভিযোগের বিস্তারিত বিষয়ে প্রকাশ্যে আর কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক লতা বলেন, দুর্গাপূজার ছুটির কারণে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের বাড়তি ব্যয় বহন করতে হবে। সীমান্তে পণ্যবাহী ট্রাক আটকে থাকলে পরিবহন ও বিলম্ব মাশুল বাড়ে। এর সঙ্গে কাস্টমসের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং পণ্য খালাসে অনিয়মের অভিযোগ ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, আমরা চাই, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং ছুটির পর দ্রুত পণ্য খালাসের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনাপোল কাস্টম হাউসের এক রাজস্ব কর্মকর্তা বলেন, শুল্ক ফাঁকি এবং একজন কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। কোনো অনিয়মের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা ব্যবসায়ী জড়িত থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা ঠিক হবে না। কাস্টমসের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা এবং সরকারি রাজস্ব সুরক্ষা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বেনাপোল কাস্টম হাউসে বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে ১৬৫ জন কর্মরত আছেন। সামপ্রতিক ঘটনা ঘিরে অসন্তোষের কারণে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছেন না বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য, অনেকে শেডে গিয়ে পণ্য পরীক্ষার কাজও করছেন না। এতে পণ্য খালাসে বিলম্ব এবং পণ্যজটের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তারা যাতে কর্মস্থলে পুনরায় লাঞ্ছনার শিকার না হন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। বেনাপোল কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক কর্মদিবসে এখানে দৈনিক গড়ে প্রায় ২০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। সেই হিসাবে আট দিনের বাণিজ্যিক বিরতিতে প্রায় ১৬০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় পিছিয়ে যেতে পারে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, তদন্ত যেন কোনো পক্ষের প্রভাবমুক্ত থাকে। অনিয়মের সঙ্গে যার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার নির্দোষ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন। বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং বৈধ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করা জরুরি। বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার মো. রাহাত হোসেন বলেন, বেনাপোল কাস্টম হাউসে পণ্য শুল্ক পরিশোধ ছাড়া বের করে নেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, দুর্গাপূজার ছুটি শেষে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে এবং বন্দরে পণ্যজট এড়াতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। কর্মকর্তা লাঞ্ছিত করার অভিযোগটিও যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
