কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবমুক্ত রেখে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম। এ লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে তিনটি জেলায় পাইলট প্রকল্প চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য জেলাতেও এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। কৃষকেরা যাতে সহজে ও বিনা হয়রানিতে সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারেন, সে জন্য সংগ্রহপ্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে বিকাশের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে কৃষকদের অর্থ পরিশোধের বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সম্মেলনকক্ষে জেলা প্রশাসন ও খাদ্য বিভাগ আয়োজিত জেলার খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে খাদ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ব্যাংক হিসাব খোলা ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে অনেক কৃষককে সমস্যায় পড়তে হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ধান সংগ্রহের প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হবে। এর মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
খাদ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং জনগণের ঘরে সময়মতো নিরাপদ খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার রয়েছে। সরকার সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কাজ করছে। খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সততা, নিষ্ঠা ও কর্তব্যবোধের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে হবে।
খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরে জমে থাকা সমস্যাগুলো সমাধানে কিছুটা সময় প্রয়োজন। কর্মকর্তাদের উত্থাপিত সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। তবে সব সমস্যা একসঙ্গে সমাধান করা সম্ভব নয়। জনগণের স্বার্থে কোন সমস্যাগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রত্যেককে সততা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী যে লক্ষ্য নিয়ে সরকার পরিচালনা করছেন, তা বাস্তবায়নে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব সমস্যার বিষয়ে তাঁদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাল ও গমের পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন খাদ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা যেকোনো সংকট মোকাবিলায় পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুদ থাকা জরুরি। বর্তমানে মজুদ পরিস্থিতি সন্তোষজনক থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান তিনি।
আমদানির মাধ্যমে আসা চালসহ সব ধরনের খাদ্যশস্য গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত গুণগত মান বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, কোনো চাল বা খাদ্যশস্য নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ না করলে তা গ্রহণ করা যাবে না। খাদ্যশস্যের মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যথাযথভাবে পালন করতে হবে, যাতে পরবর্তী সময়ে কোনো অনিয়ম বা অভিযোগের সৃষ্টি না হয়।
খাদ্যশস্য বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, বিতরণ করা খাদ্যশস্যের প্যাকেটে নির্ধারিত বিতরণসংক্রান্ত সিল দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা করা যাবে না। বিতরণের সঠিক প্রমাণ থাকলে খাদ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বের সীমা নির্ধারণ এবং বিতরণ-পরবর্তী অনিয়মের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সহজ হবে।
খাদ্য বিভাগের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি করতে হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিতরণ কার্যক্রমের প্রতিটি ধাপে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। সরকারি খাদ্যশস্য যাতে নির্ধারিত উপকারভোগীদের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে হবে।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর উপাদানের ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। বিশেষ করে শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। খাদ্যপণ্য, দুধ, জুসসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যে ক্ষতিকর উপাদানের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে।
তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ বিষয়ে নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে।
খাদ্য পরীক্ষার জন্য বর্তমানে পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকলেও ভবিষ্যতে দেশের ৬৪ জেলায় খাদ্য পরীক্ষার কাজে যানবাহন সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। এর মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করা এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার কার্যক্রম আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তারা জনগণের প্রকৃত চাহিদা ও সমস্যাগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারেন উল্লেখ করে খাদ্যমন্ত্রী তাঁদের অভিজ্ঞতা, পরামর্শ ও কার্যকর উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়ার আশ্বাস দেন। কর্মকর্তাদের কোনো ভালো পরামর্শ থাকলে তা সরাসরি তাঁকে জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয় ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকা উচিত নয়। সবাইকে সহকর্মী হিসেবে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কর্মকর্তাদের যৌক্তিক সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। যেসব সমস্যা মন্ত্রণালয়ের একক উদ্যোগে সমাধান করা সম্ভব হবে না, সেগুলো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
কর্মকর্তাদের কর্মপরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন হলে তারা আরও মনোযোগ ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জসীম উদ্দিন খান ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জামাল হোসেন।
সভায় জেলার খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
মতবিনিময় সভা শেষে খাদ্যমন্ত্রী চট্টগ্রাম নগরের জিয়া স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন।
