Published on
:
3 min read
অর্ণব সাহা
ভারতীয় জনপ্রিয় সিনেমা-চর্চায় এটা আজ প্রতিষ্ঠিত, দেশের গড়পড়তা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, স্মৃতি, আচার-অভ্যাস, ফ্যান্টাসি ও ক্ষোভ-বিদ্রোহ সবই অনুপুঙ্খ ধরে রাখে পপুলার সিনেমা। আধুনিক জাতি যদি হয় একটি ‘কল্পিত কমিউনিটি’, তবে সেই কল্পিত জাতিসত্তা নির্মাণের পিছনে পুঁজির আধিপত্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আর, মূলধারার সিনেমা যেহেতু পুঁজিরই উৎপাদন, তাই সিনেমারও মতাদর্শ থাকে, জনমনে পুঁজির সেই মতাদর্শ চারিয়ে দেওয়ার কাজটাও সে করে অত্যন্ত সুচারু ভাবে। উল্টো দিকে, পুঁজির আধিপত্যবাদী মতাদর্শের ভিতরেই জনপ্রিয় সিনেমাও কখনও কখনও চালায় অন্তর্ঘাত। দেশভাগ-পরবর্তী এ পার বাংলায় যে তীব্র সামাজিক সঙ্কট গড়ে উঠেছিল, সেই সঙ্কটকে এক ভাবে ধরতে চেয়েছিল নিমাই ঘোষের ছবি ‘ছিন্নমূল’, আর সম্পূর্ণ পপুলার ধারায় তাকে একটু ভিন্ন ভাবে দেখতে চেয়েছিল বিখ্যাত ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’।
কেন জনপ্রিয় ছবি সময়চিহ্নিত, তা বোঝাতে গিয়ে ‘জনতা সিনেমা হল’-এর লেখক উল্লেখ করছেন ১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া দু’টি হিন্দি ছবির কথা। একটি ‘দর্পণা’য় মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ববি’, অন্যটি ‘মিত্রা’ হলে রিলিজ় হওয়া ‘ইয়াদোঁ কি বরাত’। ‘ববি’ টিন-এজ প্রেমের সঙ্গে পারিবারিক পার্থক্যের বাধা, শ্রেণি-রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনরেখা কী ভাবে প্রেমের অন্দরমহলের সমীকরণ বদলে দেয়, তার মূলধারার ভাষ্য তুলে ধরে। ‘ইয়াদোঁ কি বরাত’ হয়ে উঠল বলিউডের প্রথম ‘মসালা ছবি’ যাতে রইল অ্যাকশন-সমৃদ্ধ প্রতিশোধের গল্প, রোম্যান্স, অপরাধের দুর্ধর্ষ ককটেল। একই সঙ্গে এটি ‘মিউজি়ক্যাল’ ছবি, যা এর জনপ্রিয়তাকে বাড়িয়ে দিতে সাহায্য করল।
তবে রুপোলি পর্দার কল্পচ্ছবিকেও বহু ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মোকাবিলা করতে হয়। ২৮ জানুয়ারি, ১৯৭০, রিলিজ় করল দেব আনন্দ, ওয়াহিদা রহমান জুটির ছবি ‘প্রেম পূজারী’। ১৯৬৯-এ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বামপন্থীদের সবচেয়ে মিলিট্যান্ট অংশটির নিজস্ব দল। ‘প্রেম পূজারী’ ছবির কোথাও চিন-বিরোধিতার আভাস হয়তো পেয়েছিলেন সেই উগ্র বামপন্থী দলের কোনও কোনও সদস্য। তাই ‘খান্না’ হলে এই সিনেমার ম্যাটিনি-শো চলাকালীন ওই গ্রুপের লোকজন হলের মধ্যে ঢুকে সিনেমার স্ক্রিনে আগুন ধরিয়ে দেয়। একই সঙ্গে কেউ এই সব জনপ্রিয় সিনেমার ভিতরে খুঁজে পাচ্ছেন প্রতিক্রিয়াশীলতা, আবার কেউ পাচ্ছেন ফ্যান্টাসির উপাদান। তাই জনপ্রিয় ছবি একই সঙ্গে সময়চিহ্নিত, আবার তা গণ-মনকে প্রভাবিত করার অন্যতম হাতিয়ার।
পরিচালক রমেশ সিপ্পিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল— ‘আপনার দর্শক কারা? ভারতীয়, না কি আন্তর্জাতিক?’। রমেশ সিপ্পি বলেছিলেন, দর্শকের অনুভূতির সীমান্ত হয় না ঠিকই, তবে ভারতীয় দর্শককেই কেন্দ্রে রেখে আজকের মেইনস্ট্রিম সিনেমা তৈরি করা উচিত। রমেশ সিপ্পির এই ভাবনার সূত্রেই বোঝা যায়, বক্স-অফিসের সর্বকালীন রেকর্ড-করা ছবি ‘শোলে’র (১৯৭৫) ডাকাত গব্বর সিং কী ভাবে ওয়েস্টার্ন ছবির খলনায়ক না হয়ে একজন ভারতীয় ডাকাত হয়ে ওঠে। সত্তর দশক থেকেই যে অমিতাভ বচ্চন ‘সুপারস্টার’ হয়ে উঠলেন, সুধীর কক্কর তাঁকেই ‘গুড-ব্যাড হিরো’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বম্বের শ্রমিকনেতা দত্তা সামন্ত ষাট-সত্তর দশক জুড়েই ব্যাপক শ্রমিক আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠছিলেন। ১৯৮২ সালে তিনি ভারত-কাঁপানো টেক্সটাইল ধর্মঘটে স্তব্ধ করে দিচ্ছেন ভারতীয় পুঁজিবাদের দুর্গ। ১৯৮৩ সালেই রিলিজ় করছে মনমোহন দেশাইয়ের সেই বিখ্যাত ছবি ‘কুলি’। হাতে কাস্তে আর হাতুড়ি নিয়ে অমিতাভ বচ্চনের এগিয়ে-চলা তীব্র প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার ছবি তুলে ধরে। আবার ১৯৯১-এর উদারীকরণ, সোভিয়েতের অবলুপ্তি আর যাবতীয় বিশ্বজোড়া ইউটোপিয়ার মৃত্যু ঘটার পর ১৯৯৩-এর ছবি ‘রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান’-এ নানা পাটেকর যখন জড়ো হওয়া পথচলতি মানুষকে ভোকাল টনিক দেয়— ‘জিন্দেগি মে কুছ বননা হ্যায় তো উপর দেখনা সিখ’, তখনও হিন্দি ছবি তার নিজস্ব সময়কে ধারণ করে।
আশিস নন্দী ‘ফিঙ্গারপ্রিন্টিং পপুলার কালচার’ বইয়ের সূচক-নিবন্ধে ১৯৭১-এর যুদ্ধ নিয়ে তৈরি ‘বর্ডার’ ছবিটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন ‘অ্যান এলিমেন্ট অফ অল-পারপাস কার্নিভাল’-এর কথা। প্রিয়ক মিত্রর বইটির ছত্রে ছত্রে জনপ্রিয় ছবির সেই প্রকল্পের ধূসর অতীত, অপসৃয়মান বর্তমান আর অনাগত ভবিষ্যতের আনক্যানির ছবি স্পষ্ট। পপুলার ছবি নিয়ে বাংলা ভাষায় লেখা তাঁর এই বইয়ের গুরুত্বও এখানেই, সেই গণমন আর গণ-স্মৃতির যৌথ উদ্যাপন।
