Published on
:
4 min read
দশমীর বিকেল। সিঁদুরখেলা শেষ, দেবীকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এ এমন সময়, যখন বিসর্জনের উত্তেজনার সঙ্গেই মিশে থাকে মন খারাপের সুর। উমার যাওয়ার সময় হলো যে...। সেই পরিচিত ঢাকের আওয়াজ, মুখে হাসি আর চোখে জল, ‘আবার এসো মা...’, মনে তখন একটাই ভাবনা, ফের এক বছরের অপেক্ষা। বাঙালির এই আবেগের সঙ্গে মিশে রয়েছে একটা বাজনা, বলা ভালো একটা নির্দিষ্ট ঢাকের বোল — বিসর্জনের বোল। বিশেষ সেই তালের সঙ্গে মিশে যায় বাঙালির চিরপরিচিত আক্ষেপ —‘ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জন!’ কিন্তু বিসর্জনের এই বিশেষ ঢাকের বোল তৈরি হলো কী ভাবে? কী ভাবে জায়গা করে নিল বাঙালির মননে? তার নেপথ্যেও কিন্তু রয়েছে এক ভারি অদ্ভুত কাহিনি। জড়িয়ে রয়েছে শোভাবাজারের দুই ধনী তথা তৎকালীন সমাজের শিরোমণি দেব এবং দত্ত পরিবারের লড়াইয়ের ইতিহাস। কী সেই গল্প জানেন?
চূড়ামণির অদ্ভুত খেয়াল
এককালে শোভাবাজারের হাটখোলা অঞ্চলে দত্ত পরিবারের ছিল বেশ প্রতিপত্তি। বনেদি বড়লোক পরিবারের কর্তা দানবীর চূড়ামণি দত্ত। শোনা যায়, তাঁর কাছে কেউ কিছু চাইলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিয়েই ফেরত যেতেন কৃপাপ্রার্থী ব্যক্তি। তবে স্বভাবের মধ্যে বাকি বাবুদের ন্যায় ছিল প্রবল অহংকার। রাগে-অনুরাগে পরিচিত-অপরিচিত অনেককেই ‘শালা’ বলে সম্বোধন করতেন তিনি। তাঁর এই মেজাজের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সাহস খুব কম মানুষেরই ছিল। অথচ সেটা করতে পারলেই কেল্লাফতে। তবে এই চূড়ামণির আবার ব্যাপক রেষারেষি ছিল শোভাবাজার নিবাসী আরেক জমিদার রাজা নবকৃষ্ণ দেবের সঙ্গে। সুযোগ পেলেই দু’জন দু’জনকে হ্যাটা করতে ছাড়তেন না। সে অবশ্য অন্য কথা, এ বার বরং আসি বিসর্জনের ঢাকের বোলের গল্পে।
কী ভাবে এল এই ঢাকের বোল?
এক দিন নিয়ম মতো পালকিতে চেপে অফিসে গিয়েছিলেন চূড়ামণি দত্ত। সেখানে লেখার জন্য খাগের কলম কাটতে বসলেন তিনি। সেই কাজ করতে গিয়ে আচমকা আঙুল কেটে যায় তাঁর। সামান্য ক্ষত থেকে একটু রক্তপাতও হয়। ব্যস, এতেই যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল! চূড়ামণির শরীর থেকে রক্তপাত হয়েছে, সে কি আর ছোট কথা! কাজকর্ম মাথায় উঠল, তৎক্ষণাৎ পালকি ডাকার নির্দেশ এল — বাড়ি ফিরবেন তিনি।
বাড়ি ফিরেই শুরু হলো তাঁর একের পর এক অদ্ভুত ফরমান। পরিবারের মহিলাদের স্নান ও খাওয়াদাওয়া সেরে নিতে বললেন। তার পর দেওয়ানকে ডেকে আদেশ দিলেন, অবিলম্বে একশো জন ঢাকিকে হাজির করতে হবে। হাত কেটেছে তো ঢাকি কি হবে? তবে সে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার সাহস কারও নেই, ‘বাবু’ বলেছেন মানে করতেই হবে। হলোও তাই, হাজির হলো ১০০ ঢাকির দল।
এর পর খাটে বিছানা পেতে দেওয়া হলো। গরদের কাপড় পরে, গায়ে নামাবলি জড়িয়ে নিজেই খাটে উঠে শুয়ে পড়লেন চূড়ামণি। নিজের শরীর ও মাথায় দুর্গা, কালী, রাম ও হরির নাম লিখিয়ে নিলেন। যেন তাঁর পরলোক গমণের সময় এসেছে। কিন্তু এত আয়োজন কেন? চূড়ামণির মনে হয়েছিল, তিনি মৃত্যুকে জয় করতে চলেছেন! তাই সাধারণ বাজনা নয়। ঢাকিদের বললেন, চাই একদম নতুন এক বোল। তালও তৈরি করলেন নিজেই, ছড়া কেটে সেই বোল শিখিয়ে দিলেন ঢাকিদের —
‘দুনিয়া জিনিয়া চূড়া
যম জিনিতে যায়,
তোরা দেখবি যদি আয়।
যম জিনিতে যায় রে চূড়া
যম জিনিতে যায়।’
অর্থাৎ, দুনিয়া জিতে চূড়ামণি এখন যমকেও জয় করতে যাচ্ছেন। দেখতে চাইলে চলে এসো। এই বলে শুরু হলো গঙ্গার ঘাটের উদ্দেশে যাত্রা।
চূড়ামণি দত্তের অন্তর্জলি যাত্রায় যাওয়ার প্রতীকী ছবি ছবি: AI
চূড়ামণির খাট কাঁধে উঠতেই একসঙ্গে বেজে উঠল একশো ঢাক। ঢাকের তালে তালে হাততালি দিয়ে নিজের জয়গান গাইতে লাগলেন নিজেই। শোভাযাত্রা এগিয়ে চলল শোভাবাজারের রাস্তা ধরে। পথে রাজা নবকৃষ্ণ দেবকেও নিজের উপস্থিতি জানান দিতে ভুললেন না চূড়ামণি। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো, সে কালে বাড়িতে হঠাৎ মৃত্যুকে শুভ বলে মনে করা হতো না। মৃত্যুর আগে গঙ্গাতীরে তিন রাত কোমরজলে শুয়ে থেকে মৃত্যু হলে, মনে করা হত মৃত ব্যক্তি পুণ্যাত্মা! সেই কারণেই এত আয়োজন।
শেষ পর্যন্ত শোভাযাত্রা পৌঁছল গঙ্গার ঘাটে। তখন সন্ধ্যা নেমেছে, ঘাটে ভিড় জমেছে মানুষের। চূড়ামণির নির্দেশে খাট-সহ তাঁকে নামানো হলো গঙ্গার জলে। চারদিকে উঠল ‘গঙ্গা নারায়ণ ব্রহ্ম’ ধ্বনি। মাথায় গঙ্গাজল ছিটিয়ে তিনি নাকি ঘোষণা করেছিলেন, ‘এসো যম, তোমার আজ পরাজয়!’ ৩ দিন চলে এই কীর্তি।
এর পরে শেষ হয় চূড়ামণির জীবনের এই বিচিত্র অধ্যায়। কথিত, তাঁর এই অদ্ভুত যাত্রার সঙ্গে জড়িয়েই বিসর্জনের ঢাকের নতুন বোল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
যদিও এখানে এই গল্প সম্পর্কে এক নতুন তথ্য দেন বিশিষ্ট লেখক ও কলকাতা গবেষক হরিপদ ভৌমিক। তিনি বলেন, ‘সে সময় হঠাৎ মৃত্যুকে অপমৃত্যুর সমান মনে করা হতো। রাজা নবকৃষ্ণ দেব নিজের বাড়িতেই মারা যান। যা নিয়ে বিস্তর আলোচনাও হয়। তবে কবিরাজ এসে চূড়ামণি দত্তকে নিধান দিলে তবেই তিনি অন্তর্জলী যাত্রা করেন, তখনই এই বোলের সৃষ্টি বলে লোক মুখে প্রচারিত।’
এর আগে কি বিসর্জনের কোনও বোল ছিল না?
হরিপদ ভৌমিক বলেন, ‘সেই যে প্রচলিত বিষয়, এই বোলটাই পরবর্তীকালে বিসর্জনের বোল হয়, তার আগে ঢাকের বোল ছিল না তেমন নয়। কিন্তু প্রচলিত একটা গল্প, সেটাকে এর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা ভালো সময়ের সঙ্গে লোক মুখে মিশে গিয়েছে। ঢাকের বিসর্জনের বোল আগেও ছিল। তার ইতিহাস অনেক পুরোনো। তবে বর্তমানের প্রচলিত বোলের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে চূড়ামণি দত্তের গল্প।’
একই মত বিশিষ্ট লেখক গৌতম বসুমল্লিকেরও। এই সময় অনলাইনকে তিনি বলেন, ‘ঢাকের বোলের ইতিহাস বহু পুরোনো। নানা পুজো, কাজের জন্য রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বোল তবে বর্তমানের বিসর্জনের যে ইতিহাস কলকাতার বাবুয়ানার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, তা মূলত লোক মুখে প্রচারিত কিংবদন্তী।’
সে যা হোক, আজও দশমীর বিষাদমাখা বিকেলে ঢাকের তালে যখন ভেসে আসে ‘ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জন’, তখন যেন সেই সুরে মিশে থাকে বিদায়ের বেদনা আর কলকাতার ‘বাবুয়ানি’র এক আশ্চর্য কাহিনি।
