মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানায় নতুন ওসি যোগদানের ১২ দিনেই অস্ত্রাগার থেকে একটি ৯ এমএম পিস্তল ও একটি ম্যাগাজিন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত ৩ অক্টোবর থানার অস্ত্র ও গোলাবারুদের হিসাব যাচাই করতে গিয়ে বিষয়টি ধরা পড়ে। এর আগে অস্ত্রটি একাধিক পুলিশ সদস্যের হাতবদল হলেও ইস্যু-জমা রেজিস্টারে সেটি অস্ত্রাগারে জমা দেখানো হয়েছে। ফলে অস্ত্রাগারে সংরক্ষিত থাকা সরকারি আগ্নেয়াস্ত্রটি কীভাবে নিখোঁজ হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
থানার নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জে এম তৌফিক আজম দায়িত্ব নেওয়ার পর অস্ত্র ও গোলাবারুদের হিসাব যাচাইয়ে এ অসংগতি ধরা পড়ে। দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় থানায় সংরক্ষিত ১০টি পিস্তল, ১০টি ম্যাগাজিন ও ১০০ রাউন্ড গুলি বুঝে নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে পরবর্তী যাচাইয়ে একটি পিস্তল ও একটি ম্যাগাজিনের হদিস পাওয়া যায়নি। একাধিকবার তল্লাশি চালিয়েও সেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে ভিআইপি ডিউটির জন্য এএসআই আবুল বাশার পিস্তলটি নিয়ে টাঙ্গাইল জেলায় যান। সেখানে অবস্থানকালে তার শ্বশুরের মৃত্যু হলে তিনি অস্ত্রটি সরাসরি অস্ত্রাগারে জমা না দিয়ে এসআই জয়নাল আবেদীনের কাছে বুঝিয়ে দেন।
পরদিন টাঙ্গাইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের জন্য ওই পিস্তল ব্যবহার করেন এসআই জয়নাল আবেদীন। ডিউটি শেষে তিনি সরাসরি নিজের বাড়িতে চলে যান এবং যাওয়ার সময় অস্ত্রটি সঙ্গে থাকা কনস্টেবল হারুন অর রশিদের কাছে বুঝিয়ে দেন।
পরে কনস্টেবল হারুন অর রশিদ টাঙ্গাইল থেকে হরিরামপুর থানায় ফিরে অস্ত্রটি অস্ত্রাগারে জমা দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
অস্ত্র ইস্যু ও জমাসংক্রান্ত রেজিস্টারেও সেটি জমা দেখানো হয়েছে। কিন্তু রেজিস্টার অনুযায়ী, জমা হওয়ার পর ওই পিস্তল আর কোনো ডিউটির জন্য ইস্যু করা হয়নি। তাহলে অস্ত্রাগারে থাকার কথা পিস্তল ও ম্যাগাজিন কোথায় গেল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
থানার অস্ত্রাগার থেকে সরকারি আগ্নেয়াস্ত্র নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় অস্ত্র সংরক্ষণ, দায়িত্ব হস্তান্তর এবং ইস্যু-জমা প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে একাধিক পুলিশ সদস্যের মাধ্যমে অস্ত্রটি হাতবদলের সময় যথাযথ তদারকি ও নথিপত্র অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে একই থানায় পুলিশের হেফাজতে থাকা একটি মোটরসাইকেল চুরি এবং হাতকড়াসহ আসামি পালানোর ঘটনাও ঘটেছিল। পরপর এ ধরনের ঘটনায় থানার ভেতরে সরকারি মালামাল ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের নিরাপত্তা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এসআই জয়নাল আবেদীন ক্যামেরায় বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, টাঙ্গাইলে ডিউটি শেষে কনস্টেবল হারুন অর রশিদের কাছে অস্ত্রটি দিয়ে তাকে থানায় জমা দিতে বলা হয়েছিল এবং সে পিস্তলটি থানায় জমা দিয়েছে। একজন কনস্টেবলের কাছে পিস্তল দেওয়া যায় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই দেয়া যায়। দেওয়া না গেলে সিনিয়র স্যারদের বডিগার্ডরা কিভাবে পিস্তল ব্যবহার করে?
এসআই এমদাদুল হকও ক্যামেরায় কোন বক্তব্য দিতে রাজি হননি। পরে গোপন ক্যামেরায় তার বক্তব্য ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, অস্ত্রাগারের দায়িত্বে আমি থাকলেও অস্ত্র ইস্যু ও জমা নেওয়ার কাজটি মূলত কনস্টেবল আবুল কালাম করেন।
পিস্তলটি থানা থেকেই হারিয়েছে দাবি করে ওসি জে এম তোফিক আজম বলেন, আমি থানার চার্জ গ্রহণের সময় খাতা কলমে সবকিছু বুঝে নিলেও প্র্যাটিকালি নেওয়া হয়নি। কয়েকদিন পর বাস্তবে অস্ত্রের হিসাব করতে গিয়ে একটি পিস্তল ও একটি ম্যাগাজিন পাওয়া যায়নি। অনেক খোঁজাখুজি করেও সেটি পাওয়া যায়নি। পরে সাধারণ ডায়েরি করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহরম আলী বলেন, পিস্তল ও ম্যাগজিন হারানোর পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত বলা যাবে।
