একসময় টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় করে দর্শকের মন জয় করেছিলেন অভিনেতা সমু চৌধুরী। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই পরিচিত শিল্পীর বর্তমান জীবনযাপনের কিছু দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। কেউ তাকে নিয়ে করছেন কটূক্তি, কেউ আবার তার পরিস্থিতি দেখে প্রকাশ করছেন আক্ষেপ। এমন পরিস্থিতিতে অভিনেতা সমু চৌধুরীর পাশে দাঁড়িয়ে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন অভিনেত্রী মনিরা মিঠু। তার দাবি, সমু চৌধুরী বাই পোলার পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত।
সম্প্রতি ফেসবুকে সমু চৌধুরীর একটি ছবি প্রকাশ করে দীর্ঘ একটি পোস্ট দিয়েছেন মনিরা মিঠু। সেখানে এই অভিনেতার ব্যক্তিগত জীবন, পরিবারের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, নিঃসঙ্গতা ও অসুস্থতা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে সমু চৌধুরীকে ‘পাগল’ কিংবা ‘নেশাখোর’ বলে আখ্যা দেওয়ার বিরোধিতা করেন।
পোস্টে মনিরা মিঠু লেখেন, ‘আহারে শিল্পী, কত একা আপনি। অভিনেতা সমু চৌধুরী লোকজনের কাছে আজ পাগল, নেশাখোর। এই গুণী মানুষটি আসলে বাই পোলার পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারের পেশেন্ট। এই অসুখে যে উনি আক্রান্ত, এই বিষয়ে একদম পরিষ্কার ধারণা আমার আছে।’
সমু চৌধুরীর জীবনে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে মনিরা মিঠু জানান, তার আপন ভাই-বোনসহ পরিবারের প্রায় পাঁচ-ছয়জন সদস্য সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান বলে তিনি জেনেছেন। বর্তমানে তার বৃদ্ধা মা বেঁচে আছেন। ওই দুর্ঘটনার আগপর্যন্ত সমু চৌধুরী অভিনয়ে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু মর্মান্তিক ঘটনাটির পর দীর্ঘ সময়ের জন্য তিনি আড়ালে চলে যান।
মনিরা মিঠুর ভাষ্য অনুযায়ী, বেশ কয়েক বছর পর আবার অভিনয়ে ফিরলেও সমু চৌধুরী ব্যক্তিগত জীবনে বিয়ে করেননি। মায়ের নিঃসঙ্গতার কথা ভেবেই তিনি নিজের সংসার না গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান এই অভিনেত্রী। তার কথায়, ‘সমু ভাইয়ের চিন্তা-চেতনায় ভর করে—আমি যদি বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি, আমার মা নিঃসঙ্গ হয়ে যাবেন। উনি একাকীত্বকেই বেছে নিলেন। না হলো উনার সংসার, না হলো উনার সন্তান।’
সমু চৌধুরীর সঙ্গে একাধিক নাটকে অভিনয় করেছেন মনিরা মিঠু। দীর্ঘদিনের পরিচয় থেকে এই অভিনেতার ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন বলে জানান তিনি। সমু চৌধুরীকে একজন অভিযোগহীন, নির্ভেজাল ভালো মানুষ হিসেবে উল্লেখ করে মনিরা মিঠু বলেন, তার দর্শনচর্চা ও কবিতা আবৃত্তি শুনে মুগ্ধ হতেন তিনি।
তবে প্রায় দুই বছর আগে সমু চৌধুরীর আচরণে অস্বাভাবিক কিছু পরিবর্তন তার চোখে পড়ে বলে জানান মনিরা মিঠু। তার বর্ণনা অনুযায়ী, শুটিং সেটে এসে সমু চৌধুরী অনর্গল কথা বলতেন, নাচতেন এবং বিখ্যাত মঞ্চনাটকের সংলাপ উচ্চস্বরে আবৃত্তি করতেন। এ সময় তার আচরণ নিয়ে সহকর্মীদের মধ্যে নানা আলোচনা হতো। কেউ কেউ তার এই অবস্থাকে মাদক গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করলেও মনিরা মিঠুর ধারণা ছিল, এর পেছনে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা থাকতে পারে।
নিজের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের এমন অসুস্থতার অভিজ্ঞতা রয়েছে বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন মনিরা মিঠু। তার চাচি ও মেজো ভাইয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের মানসিক সমস্যার সঙ্গে পরিচিত তিনি। তার মতে, জীবনের কোনো পর্যায়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা কিংবা অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা কারও মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
সমু চৌধুরীর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মনিরা মিঠু প্রশ্ন তুলেছেন, এই অভিনেতার পাশে দাঁড়ানোর মতো কি কেউ নেই? তার মতে, এমন একজন মানুষ প্রয়োজন, যিনি সমু চৌধুরীকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবেন, প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণে সহায়তা করবেন এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। পোস্টে তিনি লেখেন, ‘একজন সমু চৌধুরী কারোর যত্নে নাই, কারো মায়ায় নাই, এমন একটা আপন মানুষ নাই, যার কথায় উনি ডক্টরের কাছে যাবেন, কাউন্সেলিং করাবেন, প্রয়োজনে মেডিসিন খাবেন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়ে নিবিড় পরিচর্যা ও পর্যবেক্ষণে থাকবেন। কেউ কি নাই? এই সাধুকে অমানুষদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য?’
উল্লেখ্য, যশোরে ছাত্রজীবন থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সমু চৌধুরী। যশোর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর হয়ে টানা ১০ বছর পথনাটক, মঞ্চনাটক ও গণসংগীতে অংশ নেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ঢাকা উদীচী, ঢাকা থিয়েটার ও নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হন।
১৯৯০ সালে আতিকুল হক চৌধুরীর ‘সমৃদ্ধ অসীম’ নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশন নাটকে অভিষেক হয় তার। এরপর ‘জন্মভূমি’, ‘সাতপৌরে কাব্য’, ‘এই সময়ের গল্প’, ‘জিনের বাদশা’, ‘সোনালী রোদ্দুর’, ‘এবং আমি’, ‘সবুজের হলুদ ব্যাধি’ ও ‘দূরের আকাশ’-এর মতো নাটকে অভিনয় করে পরিচিতি পান তিনি।
টেলিভিশনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন সমু চৌধুরী। তার অভিনীত সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘আদরের সন্তান’, ‘নদীর নাম মধুমতী’, ‘দোলন চাঁপা’, ‘শত জনমের প্রেম’, ‘মায়ের অধিকার’, ‘দেশ দরদি’, ‘মরণ নিয়ে খেলা’, ‘প্রেমের নাম বেদনা’, ‘যাবি কই’, ‘সুন্দরী বধূ’, ‘জুম্মন কসাই’, ‘হৃদয় থেকে পাওয়া’ ও ‘গলুই’।
