Published on
:
3 min read
অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়, নয়াদিল্লি
‘ইন্ডিয়া’ শিবিরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনি যে সাক্ষাৎ করবেন না, রবিবার রাতেই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের অফিস থেকে সেটা জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল রাহুল গান্ধীদের। কেন তিনি বিরোধী নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা না–করার সিদ্ধান্ত নিলেন, সোমবার তা ব্যাখ্যা করলেন সিজেআই নিজেই। এ দিন দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিজেআই কান্ত জানান, সুপ্রিম কোর্টের দরজা সমস্ত নাগরিকের জন্যই খোলা এবং প্রত্যেকের মৌলিক অধিকার রক্ষায় আদালত দায়বদ্ধ। বিরোধী নেতাদের জানানো হয়েছে, তাঁদের উত্থাপিত বিষয়গুলি ইতিমধ্যেই আদালতের বিচারাধীন। তাই প্রশাসনিক পথে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পরিবর্তে বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবেদন জানানোই উপযুক্ত পথ।
প্রধান বিচারপতির কথায়, ‘না–বলার কারণ আরও গভীর। এই ইস্যুতে একাধিক মামলা এই আদালতে চলছে। এতে (বিরোধী প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাতে) স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, যার ফলে আমরা প্রশাসনিক দিকটি নিয়ে আলোচনা করতে বাধ্য হই। আমি ও আমার বিভাগীয় সহকর্মীরা এই সম্মিলিত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, আমাদের যে কোনও ধরনের স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলা উচিত।’ আইনজ্ঞদের একাংশের ব্যাখ্যা, ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (সার), সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ–সহ অনেকগুলি মামলা সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। তার মধ্যে কয়েকটির শুনানি সিজেআই কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চেই চলছে। আবার ‘মাস্টার অফ দ্য রস্টার’ হিসেবে অন্যান্য মামলা কোন বিচারপতির এজলাসে যাবে, তা ঠিক করাও সিজেআইয়ের দায়িত্ব। তাই সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের কথা বোঝাতে চেয়েছেন সিজেআই কান্ত।
প্রধান বিচারপতি এ দিন স্পষ্ট করেছেন, আদালত প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় সরকারের কাজকর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তবে কোনও নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে তিনি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে পারেন। অর্থাৎ, বিরোধীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ বন্ধ করা হয়নি, বরং তার জন্য নির্ধারিত আইনি পথ অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। প্রধান বিচারপতির কার্যালয় থেকে পাঠানো চিঠিতেও উল্লেখ করা হয় যে, বিরোধীরা যদি তাঁদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে চান বা কোনও বিষয়ে আইনি প্রতিকার চান, তবে তাঁদের জন্য সঠিক বিচার প্রক্রিয়ার পথ অনুসরণ করতে হবে। প্রশাসনিক স্মারকলিপির পরিবর্তে যথাযথ পিটিশন বা আইনি আবেদন করেই এই ধরনের অভিযোগের সুরাহা সম্ভব। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) তরফে পরিচালিত আন্দোলন ঘিরে রাজধানী দিল্লির আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জনজীবন বিঘ্নিত হওয়া প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি৷ ‘এটা আইন–শৃঙ্খলার বিষয়’ বলে জানান তিনি৷
এ দিন সিজেআইয়ের মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে কেরলম প্রদেশ কংগ্রেস৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের পোস্ট— ‘প্রিয় বিচারপতি সূর্য কান্ত, আইন-শৃঙ্খলা যদি আপনার আওতাভুক্ত বিষয় না–হয়, তবে এখনই পদত্যাগ করুন। আমরা এমন কাউকে খুঁজে নেব, যিনি এটি সামলাতে পারবেন।’ যদিও এ দিন সকালে সাংবাদিক বৈঠকে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী জানান, দেশের শীর্ষ আদালত এবং প্রধান বিচারপতিকে তিনি সম্মান করেন৷ কংগ্রেস নেতৃত্বকে বিঁধে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান বলেন, ‘ভারতের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করার জন্যও একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। আপনি চাইলেই কেবল একটি চিঠি লিখে যখন তখন সেখানে হাজির হতে পারেন না। পুরোটাই লোক দেখানো নাটক।’
এ দিকে, প্রধান বিচারপতির পরামর্শ মেনেই সোমবার বিকেলে ‘সার’ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে সুপ্রিম কোর্টে আলাদা মামলা দায়ের করেন রাহুল। মামলাকারী হিসেবে পিটিশনে নাম রয়েছে কালীঘাট–তৃণমূল বর্ষীয়ান সাংসদ সৌগত রায়, এনসিপি(শরদ) সাংসদ সুপ্রিয়া সুলে, সিপিএম সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি, আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব–সহ ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আরও ১১ জন নেতা–নেত্রীর৷ আজ, মঙ্গলবারই সিজেআইয়ের এজলাসে এই মামলা মেনশন করে দ্রুত শুনানির দাবি করা হতে পারে৷
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, বিরোধীরা সিইসি জ্ঞানেশকে সাসপেন্ড করা বা রক্ষাকবচ প্রত্যাহারের দাবিতে শীর্ষ আদালতে গেলেও সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সিইসি–র অপসারণ সম্ভব নয়৷ সংসদে ‘মোশন ফর রিমুভাল’ প্রস্তাব পাশ করিয়ে তবেই একমাত্র জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ সম্ভব৷ এই মর্মেই সংবিধানের ৩২৪(৫) ধারার উল্লেখ করছেন আইনজ্ঞরা৷ লোকসভার ক্ষেত্রে অন্তত ১০০ জন এবং রাজ্যসভার ক্ষেত্রে অন্তত ৫০ জন সাংসদের সমর্থন নিয়ে এর জন্য নোটিস জমা দিতে হয়। প্রস্তাবটি সংসদের উভয় কক্ষেই দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাশ করাতে হবে৷
