আগামী ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী (মিড টার্ম) নির্বাচনের আগে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভোটে জিততে ফের মস্কোর সাহায্য নিচ্ছেন তিনি?
০১ / ১৬
আর মাত্র কয়েক দিন। তার পরেই মধ্যবর্তী (মিড টার্ম) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটের লাইনে দাঁড়াবে আমেরিকা। এতে জিততে প্রচারে ঝড় তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল, ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিকান পার্টি। অন্য দিকে, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নিজের নিজের ‘রুটি সেঁকতে’ ব্যস্ত যুদ্ধরত ইউক্রেন ও রাশিয়া। ‘লাভের গুড়’ বুঝে নিতে ‘অসহায়’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘ব্ল্যাকমেল’ করছে তারা? উঠছে সেই প্রশ্নও।
০২ / ১৬
এ বারের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘জীবন-মরণ’ ম্যাচ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। এতে ভাল ফল না হলে মার্কিন পার্লামেন্টের ‘কংগ্রেস’-এ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি। সে ক্ষেত্রে সরকার চালাতে তাঁকে যে পদে পদে হোঁচট খেতে হবে, তা বলাই বাহুল্য। আর তাই, ভোটে জিততে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কথায় ওঠা-বসা করছেন তিনি, মত পর্যবেক্ষক মহলের।
০৩ / ১৬
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইজ়রায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নামে আমেরিকা। জোড়া ‘সুপার পাওয়ার’-এর বিরুদ্ধে লড়তে অদ্ভুত এক রণকৌশল নেয় তেহরান। সংঘর্ষের গোড়াতেই পশ্চিম এশিয়ার খনিজ তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে তারা। ফলে, বিশ্ববাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে চড়তে থাকে তরল সোনার মূল্য। যার আঁচ গিয়ে পড়ে আমেরিকাতেও।
০৪ / ১৬
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে খনিজ তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির জেরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘরোয়া বাজারে মহার্ঘ হয়েছে ডিজ়েল। স্বাভাবিক ভাবেই সেই পরিস্থিতিকে সামনে রেখে প্রচারে শাণ দিচ্ছে ট্রাম্প-বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। তা ছাড়া, প্রশ্নের মুখে পড়েছে ইরান যুদ্ধের খরচ, ক্ষয়ক্ষতি ও তাঁর ‘বেপরোয়া’ আর্থিক নীতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, এই পরিস্থিতিতে ভোট বৈতরণী পেরোতে নজিরবিহীন ভাবে পুতিনকে খুশি করতে হচ্ছে তাঁকে।
০৫ / ১৬
২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ (স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন) চালাচ্ছে রাশিয়া। এই যুদ্ধের গোড়া থেকেই মস্কোর উপর বিপুল নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছে আমেরিকা। পাশাপাশি, খোলাখুলি ভাবে কিভকে সমর্থন জানিয়ে এসেছে ওয়াশিংটন। ফলে, ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে মার্কিন হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ পেতে কোনও সমস্যা হচ্ছে না সেখানকার প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কির।
০৬ / ১৬
এই পরিস্থিতিতে গত ৯ অক্টোবর যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে রাশিয়ার সঙ্গে একটি ডিজ়েল চুক্তি সেরে ফেলেন ট্রাম্প। এর মাধ্যমে ঘরোয়া জ্বালানির বাজারে দামের ক্ষতে কিছুটা মলম লাগাতে সক্ষম হন ‘পোটাস’ (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস)। অন্য দিকে, সংশ্লিষ্ট সমঝোতার কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে ইউক্রেনকে কৃত্রিম মেধা-ভিত্তিক সামরিক সাহায্যে রাশ টানার অভিযোগ।
০৭ / ১৬
গত ১৪ অক্টোবর ব্রিটিশ গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন উপগ্রহ-ভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা ‘স্টারলিঙ্ক’ এবং ‘স্টারশিল্ড’কে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন জ়েলেনস্কি। তাঁর দাবি, হঠাৎ করেই এগুলির গতি কমিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ফলে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যথেষ্ট সমস্যার মুখে পড়ে কিভের ফৌজ। উল্লেখ্য, উপগ্রহ-ভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবাগুলি ‘স্পেসএক্স’-এর অংশ, যার মাথায় রয়েছেন আমেরিকার ধনকুবের শিল্পপতি ইলন মাস্ক।
০৮ / ১৬
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জ়েলেনস্কির এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুনিয়া জুড়ে পড়ে যায় শোরগোল। সাবেক সেনাকর্তাদের অনুমান, ইউক্রেনকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে পুতিনের মন জেতেন ট্রাম্প। বিনিময়ে মিলেছে মস্কোর ডিজ়েল। আর তাই, মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে একে ‘পোটাস’-এর খেলা ঘোরানো পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছে পর্যবেক্ষক মহল। এ ছাড়া আরও একটি ব্যাপারে কিভের হাত টেনে ধরতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
০৯ / ১৬
উল্লেখ্য, যুদ্ধের মধ্যে রুশ অর্থনীতিকে ক্ষতবিক্ষত করতে মস্কোর খনিজ তেলের শোধনাগারগুলিকে নিশানা করতে থাকে ইউক্রেন। এ বছর অন্তত ১১৪ বার সেই সব লক্ষ্যে হামলা চালায় কিভের ফৌজ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ডিজ়েল চুক্তি হওয়া ইস্তক এ ব্যাপারে জ়েলেনস্কির উপর চাপ তৈরি করে যাচ্ছেন ট্রাম্প। সেটি যে ক্রেমলিনের জন্য অনেকটাই স্বস্তির, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
১০ / ১৬
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এহেন ‘পুতিন প্রেমে’ বিরক্ত জ়েলেনস্কি তাঁর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতে ছাড়েননি। ট্রাম্পকে ‘দুর্বল প্রেসিডেন্ট’ বলে কটাক্ষ করেন তিনি। তবে, ওই মন্তব্যের কয়েক দিনের মাথাতেই নরওয়ের রাজধানী অসলোয় একটি বিশেষ বৈঠকে সামিল হন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট। ‘পোটাস’-এর দূত হিসেবে সেখানে সশরীরে ও ভার্চুয়ালি হাজির ছিলেন স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার।
১১ / ১৬
এই বৈঠক শুরুর আগে জ়েলেনস্কির সঙ্গে কথা বলেন নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোর ও ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব। তাঁরা দু’জনেই ট্রাম্পের দূতের সামনে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টকে শান্ত থাকার পরামর্শ দেন। গণমাধ্যমের মাইক্রোফোনে সেই কথোপকথন ধরা পড়ায় দানা বাঁধে বিতর্ক। তাঁকে ধমকানোর দায়িত্ব উইটকফ ও কুশনারকে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলে বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।
১২ / ১৬
অসলোর বৈঠক শেষে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত দেন জ়েলেনস্কি। পরে এ ব্যাপারে দু’তিনটে শর্তের কথা বলতে শোনা যায় তাঁকে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে ইউক্রেনকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রিতে বরাবর ‘না’ বলে এসেছে আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রের পথেই হেঁটেছে অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্র। এ বার সেই বিধিনিষেধ তুলে দেওয়ার সময় এসেছে দাবি করেন কিভের প্রেসিডেন্ট।
১৩ / ১৬
বিশ্লেষকদের বড় অংশই মনে করেন, ট্রাম্পের পক্ষে এই দাবি মেনে নেওয়া অসম্ভব। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ২০১৩ সালে ‘মিস ইউনিভার্স’ প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে মস্কো যান তিনি। নিন্দকদের কথায়, সেই সময় পুতিনের নির্দেশে লাস্যময়ীদের সঙ্গে তাঁর কিছু আপত্তিকর ছবি তুলে নেয় ক্রেমলিনের গুপ্তচরবাহিনী। এ ছাড়া, ট্রাম্পের আরও কিছু গোপন তথ্যও নাকি রয়েছে তাঁর হাতে।
১৪ / ১৬
২০১৬ সালে প্রথম বার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ট্রাম্প। ওই সময় পপুলার ভোটে এগিয়ে ছিলেন তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী তথা ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিন্টন। কিন্তু, তার পরেও সব হিসেব বদলে যাওয়ায় নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। ফলে, এই নিয়ে তদন্তে নামেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন’ বা এফবিআই-এর সাবেক ডিরেক্টর রবার্ট মুলার।
১৫ / ১৬
২০১৯ সালে আমেরিকার বিচার বিভাগে তদন্ত রিপোর্ট জমা করেন মুলার। সেখানে ওই নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের একাধিক প্রমাণ তুলে ধরেন তিনি। রিপোর্ট অনুযায়ী, ভোটের মুখে মস্কোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে ‘ট্রাম্প টাওয়ার’ নামের বহুতলে বৈঠক করেন ট্রাম্পের আইনজীবী। এতেই মসৃণ হয় তাঁর জয়ের রাস্তা। যদিও কুর্সি পাওয়ার পর যাবতীয় অভিযোগ উড়িয়ে দেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষীয়ান প্রেসিডেন্ট।
বিশ্লেষকদের দাবি, সেই একই পদ্ধতিতে এ বারও নির্বাচনী বৈতরণী পেরোতে চাইছেন ট্রাম্প। সেই কারণে পুতিনকে খুশি রাখা একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে তাঁর। অন্য দিকে, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে হাতিয়ার আমদানির বিষয়টি নিশ্চিত করতে চাইছেন জ়েলেনস্কি। এতে মস্কোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে তাঁর ফৌজ। ফলে শেষ পর্যন্ত কোন দিকে পোটাস ঝোঁকেন, সেটাই এখন দেখার।
সব ছবি: সংগৃহীত।
