ইউরোপের বাজারে পোশাকের চাহিদা হ্রাস, ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এবং বিদেশি ক্রেতাদের বাড়তি দরকষাকষির কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রপ্তানির সামগ্রিক চিত্রে কিছু ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও বিভিন্ন দেশের বাজারে ভিন্ন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি ইউরোপে বাংলাদেশি পোশাকের গড় বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়ায় রপ্তানি আয় ও মুনাফার ওপর চাপ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম এবং শ্রমিকদের বাড়তি আয়ের সুযোগেও।
বাজারভেদে রপ্তানিতে ভিন্ন চিত্র
প্রাসঙ্গিক সংবাদ
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। তবে একই সময়ে ফ্রান্সে রপ্তানি আয় কমেছে ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ। দেশটিতে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারে।
অন্যদিকে স্পেনের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। দেশটিতে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ ইউরোপের সব বাজারে একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না।
তবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানির আরেকটি চিত্র উঠে এসেছে ইউরোপীয় পরিসংখ্যান সংস্থার উপাত্তে। ওই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রপ্তানি আয় ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ কমে প্রায় ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরোয় নেমেছে। রপ্তানির পরিমাণও কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ সময়ে বাংলাদেশি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য প্রতি কেজিতে ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরো হয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ২১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কম পরিমাণ পণ্য রপ্তানির পাশাপাশি প্রতি একক পণ্য থেকে আগের তুলনায় কম আয় করার ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে রপ্তানি আয় কমার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন খরচ মিটিয়ে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ক্রয়াদেশ কমায় বাড়ছে দরকষাকষি
ইউরোপে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপের কারণে পোশাকের মতো পণ্যে ব্যয় কমানোর প্রবণতা তৈরি হতে পারে। খুচরা বিক্রি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলে ব্র্যান্ড ও আমদানিকারকেরা নতুন ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেন, পণ্য সরবরাহ পিছিয়ে দেন কিংবা সরবরাহকারীদের কাছ থেকে মূল্যছাড় চান।
এতে পোশাক কারখানাগুলো দ্বিমুখী চাপে পড়ে। একদিকে কাঁচামাল সংগ্রহ, শ্রমিক নিয়োগ ও উৎপাদনব্যবস্থা সচল রাখতে আগেই অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। অন্যদিকে ক্রয়াদেশ কমে গেলে কিংবা পণ্য গ্রহণ পিছিয়ে গেলে সেই বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত আয় আসে না। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিপরীতে বিক্রয়মূল্য কমলে মুনাফার পরিমাণ আরও সংকুচিত হয়।
পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তবে শুধু একটি দেশের অস্থিরতাই বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সামগ্রিক দুর্বলতার একমাত্র কারণ নয়। ইউরোপের সামগ্রিক চাহিদা, ব্র্যান্ডগুলোর বিক্রির অবস্থা এবং নতুন ক্রয়াদেশের প্রবণতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
বাড়তি আয়ের সুযোগ হারাচ্ছেন শ্রমিকেরা
রপ্তানির বাজারে অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে পোশাকশ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনেও। বিশেষ করে যাঁরা বাড়তি কর্মঘণ্টার আয়ের ওপর নির্ভর করেন, তাঁদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে উঠছে।
গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার সেলাই অপারেটর রহিমা খাতুন জানান, আগে রাত আটটা থেকে দশটা পর্যন্ত কাজ করে বাড়তি টাকা আয়ের সুযোগ ছিল। কিন্তু এখন অনেক দিন বিকেল পাঁচটার মধ্যেই কারখানার কাজ শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত কাজের সুযোগ কমে গেছে।
তিনি বলেন, আগে বাড়তি আয়ের টাকা দিয়ে সংসারের খরচ মেটাতে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেত। এখন বাজারসদাই ও পরিবারের অন্যান্য ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি চাকরি হারানোর আশঙ্কাও বাড়ছে।
অর্ডার কমে গেলে কারখানার উৎপাদন ও কর্মঘণ্টা কমানোর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে নতুন শ্রমিক নিয়োগ কমানো কিংবা উৎপাদনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার ঝুঁকিও তৈরি হয়। যদিও সব কারখানার পরিস্থিতি এক নয়, তবু দীর্ঘস্থায়ী চাহিদা সংকোচন কর্মসংস্থানের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
বাজার সম্প্রসারণ ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর তাগিদ
পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তাদের মতে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি মন্থর থাকা অবস্থায় ফ্রান্সের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় কারখানাগুলোকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা শুধু ফ্রান্সের পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়। ইউরোপের সামগ্রিক ভোগব্যয়, পোশাকের খুচরা বিক্রি, ব্র্যান্ডগুলোর মজুত এবং নতুন ক্রয়াদেশের সিদ্ধান্তও রপ্তানির গতিপথ নির্ধারণ করে। ফ্রান্সের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে পণ্য সরবরাহ ও ক্রয়াদেশের সময়সূচিতে প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ অব্যাহত থাকলে ক্রেতারা কম দামে পোশাক সংগ্রহের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, ক্রয়াদেশ ও পণ্য সরবরাহের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ এবং উৎপাদন পরিকল্পনায় নমনীয়তা বাড়ানো জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে নতুন বাজার তৈরি, উন্নতমানের ও তুলনামূলক বেশি মূল্যের পোশাক উৎপাদন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ফ্রান্সের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সাময়িক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমতে পারে। তবে ইউরোপের বাজারে চাহিদা ও পোশাকের দাম নিয়ে চাপ অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সামনে চ্যালেঞ্জ থেকেই যাবে। তাই রপ্তানি আয় ধরে রাখার পাশাপাশি কারখানার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ।
-20261024022041.jpg&w=1440&q=75)