মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:
পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য রিসোর্ট। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পাহাড়, টিলা ও সবুজ প্রকৃতির পাশে নতুন নতুন অবকাশকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এ সব প্রতিষ্ঠানের কতটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে, পরিবেশগত ছাড়পত্র আছে কি না এবং পর্যটকদের নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে রিসোর্টের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বৈধতা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন। স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজার জেলায় রিসোর্টের সংখ্যা দুই শতাধিক হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে শ্রীমঙ্গল উপজেলায়। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সবগুলো মানসম্মত রিসোর্ট হিসেবে বিবেচনা করতে নারাজ স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের একটি অংশ। তাদের দাবি, কয়েকটি কক্ষ ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থাকেও অনেক ক্ষেত্রে রিসোর্ট হিসেবে পরিচয় দেওয়া হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল ট্যুরিজম সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এস কে দাস সুমনের হিসাবে, উপজেলায় প্রায় ১০৩টি রিসোর্ট রয়েছে। তবে এর মধ্যে প্রকৃত অর্থে পূর্ণাঙ্গ রিসোর্টের সংখ্যা ১০ থেকে ১২টির বেশি নয়। তার মতে, রিসোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থাপনার ধরণ, সুযোগ-সুবিধা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
একই সংগঠনের সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের মালিক সেলিম আহমেদ জানান, মৌলভীবাজার জেলায় রিসোর্টের সংখ্যা প্রায় ২০০। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গলে রয়েছে শতাধিক। কিন্তু নামের সঙ্গে রিসোর্ট যুক্ত থাকলেই কোনো প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণাঙ্গ রিসোর্ট বলা যায় না। তাঁর মতে, কয়েকটি কক্ষ ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থাকে রিসোর্ট হিসেবে প্রচার করার প্রবণতা রয়েছে। রিসোর্টের সংখ্যা সম্পর্কে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া গেলেও কতটি প্রতিষ্ঠান সব ধরনের অনুমোদন নিয়ে চলছে, তার সমন্বিত তথ্য স্পষ্ট নয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কিছু প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে ছাড়পত্র পাওয়া প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা রিসোর্টগুলোর অনুমোদনের অবস্থা কী, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মঈদুল ইসলাম বলেন, তাঁদের দপ্তর থেকে প্রায় ৬০টি রিসোর্টকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। ২০টি বা তার বেশি কক্ষ রয়েছে, এমন রিসোর্টের ক্ষেত্রে ছাড়পত্র দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, সে বিষয়ে তাঁর কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
সিলেট বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, অন্তত ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগের হোটেল ও রিসোর্টের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এর চেয়ে কম বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তাঁদের দপ্তর ছাড়পত্র দেয় না। ছাড়পত্র পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয় বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, তবে পরিবেশগত ছাড়পত্রের পাশাপাশি জমির ব্যবহার, ভবন নির্মাণ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি এবং অগ্নিনিরাপত্তাসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একটি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র থাকলেই সব ধরনের অনুমোদন নিশ্চিত হয়েছে, এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান বলেন, কোথায় কারা রিসোর্ট নির্মাণ করছেন এবং সেগুলো কী ধরনের অনুমতি নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। রিসোর্ট স্থাপন ও পরিচালনার জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা বা নির্দেশিকা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকায় প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার অভিজ্ঞতা দিতে অনেক রিসোর্ট গড়ে উঠেছে পাহাড়ি ঢাল, টিলা ও বনাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায়। কিন্তু পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে পাহাড়-টিলা কাটা এবং বনভূমির ক্ষতি করার অভিযোগ উঠেছে। এসব নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে যথাযথ তদারকি না থাকলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা পরিবেশকর্মীদের।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের জাতীয় পরিষদের সদস্য এ এস এম সালেহ সোহেল বলেন, পাহাড় ও বন কেটে রিসোর্ট তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি নেই। কোথায় এবং কী শর্তে রিসোর্ট নির্মাণ করা যাবে, তা নির্ধারণে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার।
স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও মনে করেন, পাহাড়ি এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণের আগে জমির প্রকৃতি, পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদন যাচাই করা জরুরি। শুধু পর্যটন ব্যবসা সম্প্রসারণের দৃষ্টিতে এসব স্থাপনা গড়ে উঠলে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
রিসোর্টের অনুমোদন ও পরিবেশগত প্রভাবের পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি কক্সবাজারের টুকটুক রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে সাতজনের মৃত্যুর খবরের পর দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সিলেট হোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউস ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি সুমত নূরী জুয়েল বলেন, সিলেট জেলায় হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট মিলিয়ে ৫৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের তথ্য থেকে জানা যায়। তবে সব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন রয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন তিনি। তাঁর সংগঠনের সদস্য ২২ থেকে ২৫টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানান তিনি। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও নীতিমালা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
এ জাতীয় আরো খবর..
