দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চার জেলার ২৯টি বাঁওড়ের মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন, মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। পাঁচ বছর মেয়াদি নির্বাচিত বাঁওড় এলাকায় সমাজভিত্তিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন অন্তত ১০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার বাঁওড়গুলোতে খনন, মাছের অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, পোনা উৎপাদনের অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনা জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ব্যয় ও কার্যক্রম মূল্যায়নের অপেক্ষায় রয়েছে এটি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যশোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ওই অঞ্চলের বাঁওড়গুলোতে মাছের উৎপাদন বাড়াতে প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেন। গত বছরের ডিসেম্বরে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তৎকালীন সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। পরে জনবল কাঠামোর অনুমোদনের জন্য অর্থ বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়। বর্তমান সরকারের সময়ে জনবল কাঠামো অনুমোদনের পর ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়।
প্রকল্পের আওতায় পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া বাঁওড়ের নির্বাচিত অংশ খননে ১১ কোটি ২১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে জলাশয়ের গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়বে এবং শুষ্ক মৌসুমেও মাছের বসবাস ও বেড়ে ওঠার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করতে ২৯টি বাঁওড়ে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠায় ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া ৩৫টি পোনা উৎপাদন পুকুর সংস্কারে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকা, খামার যান্ত্রিকীকরণে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং পানি সরবরাহের জন্য ছয়টি গভীর নলকূপ স্থাপনে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বাঁওড় ব্যবস্থাপনা ও সম্প্রসারণসেবার অবকাঠামো উন্নয়নে জরাজীর্ণ ছয়টি ব্যবস্থাপকের অফিস ভবন পুনর্নির্মাণে ৭ কোটি ৩১ লাখ ৮ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ বছরে ২৯০টি বিল নার্সারি স্থাপনে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং রুইজাতীয় ও দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্তকরণে ৭ কোটি ৬১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা ব্যয়ের সংস্থান রাখা হয়েছে। প্রকল্পের সরঞ্জাম কেনার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে আট লাখ টাকা। এর মধ্যে চারটি ডেস্কটপ কম্পিউটার, দুটি ল্যাপটপ, চারটি প্রিন্টার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম রয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বাঁওড়গুলোতে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই প্রকল্পের লক্ষ্য। নির্বাচিত জলাশয়ে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, মাছের নিরাপত্তায় নজরদারি এবং স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, অভয়াশ্রমের নির্ধারিত এলাকায় মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রিত থাকবে, যাতে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। বর্ষা মৌসুমে মাছ আশপাশের নদী ও বিলে ছড়িয়ে পড়লে সেখান থেকে স্থানীয় জেলেরা মাছ আহরণ করতে পারবেন। এতে মাছের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রস্তাবিত ব্যয় ও কার্যক্রম পর্যালোচনার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. খালেদ কনক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বাঁওড়ের জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে এ ধরনের সমাজভিত্তিক প্রকল্পের ঘাটতি রয়েছে। অনেক বাঁওড় অগভীর হয়ে যাওয়ায় মাছের বসবাস ও উৎপাদনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে জলাশয়ের উন্নয়ন ও সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাঁওড়ের প্রকৃত মৎস্যজীবীদের তালিকা হালনাগাদ করাও প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। নব্বইয়ের দশকে গঠিত মৎস্যজীবী সমিতিগুলোর সদস্যতালিকা দীর্ঘদিন ধরে হালনাগাদ হয়নি। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অন্তর্ভুক্তি, তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মাছ আহরণের সুফল সুষমভাবে বণ্টনের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে প্রকল্পের ব্যয় এখনো প্রস্তাবিত পর্যায়ে রয়েছে। অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা, সরঞ্জামের বিবরণ ও দাম এবং জনবল কাঠামোর যথার্থতা মূল্যায়ন ও যৌক্তিকীকরণের বিষয় রয়েছে।
